ইউরোপে কেমন করে এল টিউলিপ ফুল?

sergey-shmidt-koy6FlCCy5s-unsplash
Fotoğraf: Sergey Shmidt-Unsplash

সম্প্রতি বাংলাদেশে দেখা যাচ্ছে টিউলিপের চাষ। গাজীপুরের শ্রীপুরে এক খণ্ড ফসলি জমিতে স্থানীয় এক দম্পতির প্রচেষ্টায় বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো টিউলিপ ফুলের বাগান গড়ে উঠেছে।

এখন কেউ যদি আপনাকে জিজ্ঞাসা করে যে টিউলিপ ফুলটি কোথা থেকে এসেছে? তার উত্তরে আপনি বেশ স্বচ্ছন্দেই ‘হল্যান্ড’ দেশটির কথা উল্লেখ করবেন এবং আপনার উত্তরটি যে আসলে সঠিক, তা নিয়েও সন্দেহের অবকাশ থাকবে না।

টিউলিপ বর্ষজীবি ও বসন্তকালীন ফুল হিসেবে সুপরিচিত। এই টিউলিপই সর্বাধিক পরিচিত হয়েছে ‘ডাচফুল’ এই নামে। জমকালো ও আড়ম্বরপূর্ণ ফুলগুলো সাধারণতঃ কাপ কিংবা তারা সদৃশ হয়ে থাকে।  আজ, আপনি হল্যান্ডের বেশ কয়েকটি অঞ্চলে টিউলিপের বিস্তৃত ক্ষেত্রের পাশাপাশি অন্যান্য বাল্ব সদৃশ ফুলের সৌন্দর্যও উপভোগ করতে পারবেন। প্রতি বছরই কেউকেনহোফে প্রায় সাত মিলিয়নেরও বেশি এই জাতীয় ফুলের সৌন্দর্য দেখা যায়। হল্যান্ড সারা বিশ্বের বৃহত্তম ফুল রপ্তানিকারক দেশ রূপে চিহ্নিত। আপনার যদি হাতে সময় থাকে এবং আপনি সাইক্লিং করতে বিশেষ পছন্দ করেন তবে এই সৌন্দর্য মিস করবেন না! আপনার সাইকেলটি আপনার সাথে নিয়ে যান এবং ওয়েস্টল্যান্ড অঞ্চল এবং আলস্মিরের দীর্ঘ ফুলেরক্ষেত্র এবং বাগিচাগুলি ঘুরে আসতে পারেন। টিউলিপ ফুলের প্রাকৃতিক মনোরম সৌন্দর্য আপনার মনকে প্রশান্তি দেওয়ার পাশাপাশি আনন্দও দিতে সক্ষম হবে।

কিন্তু ইতিহাস ঘাঁটলে দেখবো, আদতে অটোমান সাম্রাজ্য থেকেই  ইউরোপে টিউলিপ ফুলের প্রসার ঘটে।  আর  পরবর্তীতে বাগিচাশিল্পের ধারাবাহিক স্রোত তৈরি হয়।

টিউলিপগুলি ষোড়শ শতাব্দীতে হল্যান্ডে আমদানি করেছিলেন ওগিয়র ঘিসালিন ডি বুসবেক। তিনি ছিলেন সুলতান সুলেমনের কাছে প্রেরিত সম্রাট ফার্দিনান্দ প্রথমের রাষ্ট্রদূত। ইস্তাম্বুলের রাজদরবারে উচ্চতর পরিশীলিত হাইব্রিড ফুলের বৃদ্ধি দেখে ডি বাসবেক রীতিমতো অবাক হয়েছিলেন। তিনি প্রাগের ক্যারোলাস ক্লুসিয়াসকেও কিছু ফুল পাঠিয়েছিলেন, যিনি শেষ পর্যন্ত ইউরোপে টিউলিপের ব্যাপক বন্টন নিশ্চিত করেন এবং লাইডেনের বোটানিকাল গার্ডেনগুলিতে এই ফুলের চাষের পদ্ধতি গ্রহণ করেছিলেন।

টিউলিপ মূলত মধ্য এশিয়ার কাজাখস্তানের হিন্দু পর্বতমালার অঞ্চলে ফুটে থাকা বুনো ফুল ছিল, তবে তুর্কিরা প্রথমে ১০০০ খ্রিস্টাব্দের প্রথম দিকে এর চাষ করেছিল। সেলজুকদের শিল্পকর্মে আমরা প্রথমবারের মতো টিউলিপগুলি দেখি। দ্বাদশ শতাব্দীতে, টিউলিপগুলি মোটিফগুলিতেও অন্তর্ভুক্ত হতে শুরু করে, বিশেষত কোন্যা শহরে, যা আনাতোলিয়ান সেলজুকদের রাজধানী ছিল। এটি নিশ্চিত মনে হয় যে বিভিন্ন ধরনের টিউলিপ এবং টিউলিপ সংস্কৃতি তুরস্কের হাত ধরে আনাতোলিয়ায় এসেছিল।

কার্যত অটোমান বিজয়ের পরে কনস্টান্টিনোপলকে যখন ইস্তাম্বুল হিসাবে নতুনভাবে ডিজাইন করা হয়েছিল, সুলতান দ্বিতীয় মেহমেটের উদ্যোগে নতুন পার্ক এবং বাগানে টিউলিপের চারা লাগানোর নির্দেশ দিয়েছিলেন। সুলতান নিজেই ছিলেন শৌখিন… বাগানপ্রেমী। অবসর সময়ে তিনি তোপকাপি প্রাসাদের বাগানের কাজও পরিচালনা করেছিলেন।

সুলতান সুলেমান টিউলিপের ভালবাসাকে অন্য স্তরে নিয়ে গিয়েছিলেন। তিনি ইস্তাম্বুলে টিউলিপ রোপণ এবং ব্যবহারকে পেশাদারিত্বে পরিণত করতে সচেষ্ট  করেছিলেন এবং এটি গোলাপের চেয়ে বেশি জনপ্রিয়তা অর্জন করে। বিশিষ্ট কবি সুলেমানের কবিতাতেও টিউলিপের কথা, তার সৌন্দর্যের কথা উল্লেখ করেছিলেন. এই প্রসঙ্গে তাঁর রচিত ‘মুহিব্বি’ কবিতাটির কথা উল্লেখ করতে পারি।

ইসলামী শিল্পে টিউলিপ, রুমির বর্ণনা অনুসারে ‘একটি কাব্যিক ফুল’ নামে মান্যতা পেয়েছে। সুফি সংস্কৃতিতে এর একটি বিশেষ স্থান রয়েছে।

ইসলামী শিল্পে টিউলিপের জনপ্রিয়তার অন্যতম কারণ হল এই ফুলের আকারের ইসলামী সংস্কৃতির একধরনের সাদৃশ্যের উপস্থিতি। এটি ইসলামী শিল্প ও সংস্কৃতিতে একটি উচ্চমানের মর্যাদায় একটি বিশেষ ফুল রূপেও চিহ্নিত। এছাড়া অটোমান সাম্রাজ্যের সময় থেকে উদ্যানগুলিতে টিউলিপ ফুলের রোপণ এই সাম্রাজ্যের একপ্রকার অংশ হয়ে ওঠে। পরিবেশ সৃজনের প্রতি অটোমানদের অবদান উল্লেখযোগ্য এবং টিউলিপকে অটোমানদের জাতীয় প্রতীক বলা যেতেই পারে।