ইচ্ছাশক্তি ও ইসলামের সংযোগ কোথায়?

kristopher-roller-rgrZVTjuuPw-unsplash
Fotoğraf: Kristopher Roller-Unsplash

সাইকোলজি যাকে বাংলায় বলে মনস্তত্ব- এর প্রসার ভাবনাচিন্তায় ও গবেষণায় গত কয়েক শতাব্দির থেকে অনেক বেশি হচ্ছে বর্তমানে। সেই শিল্পবিপ্লবের সময় থেকে শুরু করে, ঔপনিবেশিক শক্তিদের উত্থান ও পতনের মধ্যে দিয়ে পুঁজিবাদি সমাজের পত্তন হয়েছে। এই দীর্ঘ সময়কালে মানুষের ভাবনাচিন্তায় এসেছে অসামান্য পরিবর্তন, শ্রম ও জ্ঞান এই দুই হয়েছে অনেক সহজলভ্য। ফলে আর্থসামাজিক বিকাশ যেমন হয়েছে, মস্তিষ্ক বিশেষত সৃষ্টিশীল মস্তিষ্কের বিকাশও হয়েছে উল্লেখযোগ্য। সৃষ্টিশীল মস্তিষ্ক সাধারণ যা করে তাকে দর্শন বলা হয়। দর্শন মানেই যে খটোমটো মোটা মোটা দর্শনের বই বা দার্শনিক ভাবধারার প্রসার তা ঠিক নয়। একজন গান গাইল বা কবিতা লিখল- তার মধ্যে একটা অন্তর্নিহিত বার্তা আছে, সেই বার্তাটাই ওই শিল্পীর দর্শন। একই ভাবে একটা ছবি, একটা বক্তৃতা সবই সামাজিক দর্শনকে তুলে ধরে।

এই দর্শনের একটা প্রধান বিষয় মনস্তত্ব, বিশেষ করে মানব মনস্তত্ব। মনস্তাত্বিক বিষয় নিয়ে যে গবেষণা এখন চলছে, বর্তমান বিশেষজ্ঞরা যা বলছেন তার বেশিরভাগটাই কোরআন শরীফে দেড় হাজার বছর আগেই উল্লেখ করা হয়েছে।

এই মনস্তত্বের মধ্যে আমরা আলোচনা করব ইচ্ছাশক্তি ও ইসলামের সংযোগ নিয়ে। আজকের দিনে আমরা মানুষদের দেখি যারা নিজেকে নিয়েই খুশী। নিজের ভালো, নিজের লাভ, নিজের সুখ নিয়ে মগ্ন থাকা মানুষ কখনই খুশী থাকতে পারেনা। এই স্বল্পদৃষ্টি সম্পন্ন মানুষদের উদ্দেশ্যে আল্লাহতায়ালা বলেছেন- “যারা নিজের ইচ্ছের কাছে পরাজিত তাদের চেয়ে বেশি বিৎপথগামী আর কেউ নয় (২৮:৫০)”।

ইচ্ছাশক্তি আমাদের দেয় আত্মনিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা। আত্মনিয়ন্ত্রণ ইসলামের অন্যতম মূল স্তম্ভ। আমরা দিনে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করি নিয়মানুবর্তিতা শেখার জন্য, একমাজ রোজা রাখি আত্মসংযম করে ক্ষুধার প্রতি হার না মানতে। আমাদের এই ক্ষমতা গুলোই পশুর সাথে পার্থক্য করে, মানুষ বলে আমরা গর্ববোধ করি।

আমাদের পার্থিব চাহিদাগুলিকে নিয়ন্ত্রণে এনে আল্লাহের পথে নির্বিঘ্নে চলাই ইসলামের একমাত্র বার্তা। শুধুমাত্র পার্থিব চাহিদাই নয়, আবেগও ইসলামের পথে বাধার স্বরূপ। যদি আবেগের কাছে আত্মসমর্পণ করে মানুষ, তাহলে তাকে আবেগতাড়িত বলা হয়, সে নিজের উপর নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে, আবাগের বশে চালিত হয়। এজন্যই ইসলামে আবেগকে নিয়ন্ত্রণ করতে বলেছেন আল্লাহতাআলা। যুদ্ধ করলে গৌরবের সাথে করো, কাউকে ভালোবাসলে তা ব্যক্তিগত পরিসরেই সীমাবদ্ধ রাখো, প্রিয়জনকে হারালে কাঁদতে পারো তবে চিৎকার বা বিলাপ করে নয়। তবেই তুমি হতে পারবে আত্মনিয়ন্ত্রিত ও আত্মনির্ভর একটি শক্তির উৎস।

আজকের সমাজের প্রচলিত ধারণা স্বাধীন হওয়ার, যা ইচ্ছে করার। কিন্তু ইসলাম বলে সংযমী হও, নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করো, ধৈর্য্য ধরো। এই কথা গুলো যা মূল্যহীন নয় তার প্রমাণ বর্তমান বৈজ্ঞানিকরাই দিয়েছেন।

স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক একটি গবেষণা করেন। চারপাঁচ বছরের বাচ্চাদের নিয়ে একটি পরিক্ষায় তিনি বাচ্চাদের বলেন যে তারা মার্শম্যলো খেতো চায় কিনা। তারপর বলেন যে যদি এখনই খেতে চায় তাহলে একটা পাবে কিন্তু যদি একটু পরে খেতে চায় তাহলে দুটো পাবে। বেশীরভাগ বাচ্চাই প্রথম প্রস্তাবটা গ্রহণ করে, কিছু বাচ্চা অপেক্ষা করতে সম্মত হয়েছিল।

ওয়াল্টার যে পরীক্ষাটা করেছিলেন তা আত্মসংযমের। আরও ভালো কিছু পাওয়ার উদ্দেশ্যে তৎক্ষণাৎ কিছু করা থেকে বিরত থাকাই আত্মসংযমের উদাহরণ। কিছু বছর পরে তিনি রিপোর্ট পেশ করে দেখান যে যারা অপেক্ষা করতে সম্মত হয়েছিল তারা জীবনে অপেক্ষাকৃত ভাবে বেশি সফল। তাদের শিক্ষা বেশি, জীবনধারণের মান উন্নত, অনেক ধরণের প্রতিভাসম্পন্ন, দাম্পত্য জীবনও তাদের সুখের।

এত কিছু নির্ভর করে শুধুমাত্র আত্মনিয়ন্ত্রণ ক্ষমতার উপর। এরকম আরও হাজার হাজার গবেষণা আছে যারা মহান রব্বুল আলামীনের নির্দেশকে অক্ষরে অক্ষরে সত্য বলে প্রমাণ করেছেন। এই শাশ্বত সত্যের ধর্ম পালনকারী আমরা বারবার এই কথাগুলো ভুলে গেছি, নিজেদের উপর নামিয়ে এনেছি অসংখ্য অভিযোগ, বিশ্বের দরবারে অনেক অপমানিত হতে হয়েছে। আমাদের ভুললে চলবে না যে প্রত্যেক মুসলমানের জন্য এই নির্দেশ ফরজ, পালন না করলে দোজখের আগুনে পচতে হবে অনির্দিষ্টকাল।