ইতালিয়ান রান্নায় টমেটো: বিষাক্ত ফল থেকে আধুনিক রান্নার এক অবিচ্ছেদ্য উপকরণ

খাবার ৩১ মার্চ ২০২১ Contributor
জানা-অজানা
ইতালিয়ান রান্নায় টমেটো
© Sergii Koval | Dreamstime.com

ইতালিয়ান রান্নায় টমেটো এক অত্যাবশ্যকীয় উপাদান। শুধু ইতালিই বা কেন, টমেটোর সঙ্গে সমগ্র পৃথিবীরই যোগাযোগ অবিচ্ছেদ্য। ভারতীয় উপমহাদেশের রান্নায় টমেটোর ব্যবহার বহুল প্রচলিত। কিন্তু ইতালিয়ানরা তাঁদের খাবারে টমেটো ছাড়া ভাবতেই পারেন না! গ্লোবালাইজেশনের দৌলতে এখন যে-কোনও দেশে বসেই খাস ইতালিয়ান পাস্তা থেকে শুরু করে পিৎজা সহজেই চেখে দেখা যায়। কিন্তু ভাবুন দেখি, টমেটো ও নানারকম হার্বস দিয়ে তৈরি রেড সস পাস্তা বা স্প্যাগেটিতে যদি টমেটোই না পড়ত, সেটা কেমন খেতে হত? কিংবা পিৎজায় ডো-এর উপর যে টমেটো সসের ঘন আস্তরণটি না থাকত, তাহলেই বা কেমন লাগত? কিন্তু কবে থেকে ইতালিয়ান রান্নায় টমেটোর এত রমরমা শুরু হল, আর কবে থেকেই বা পাস্তা-পিৎজার সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে জুড়ে গেল টুকটুকে লাল এই টমেটো? সে কথা জানতে গেলে আমাদের পিছিয়ে যেতে হবে শ’দুয়েক বছর আগে।

টমেটো মানেই ‘বিষাক্ত’ ফল!

এককথায় বলতে গেলে, টমেটো এবং ইতালিয়ান খাবারের সম্পর্ক অতি নিবিড়। আমরা তো বটেই, স্বয়ং ইতালিয়ানরাও টমেটো ছাড়া খাবার কল্পনা করতে পারেন না, তাঁদের কথায়, “টমেটো নাকি তাঁদের ডিএনএ-তেই রয়েছে!” কিন্তু শুনতে অবাক লাগবে, ১৯ শতকের আগেও ইতালিয়ান রান্নায় টমেটোর অস্তিত্বই ছিল না! লাল, টুকটুকে টমেটোর তখন পরিচিতি ছিল ‘বিষাক্ত’ ফল হিসেবেই! এবং তার চেয়েও আশ্চর্যের ব্যাপার, টমেটোকে তখন ইতালিয়, এমনকী ইউরোপিয়রা চিনতেনই না সেভাবে।

ইউনিভার্সিটি অফ পেনসিলভানিয়ার রোম্যান্স ল্যাঙ্গোয়েজের অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর এবং ইতালিয় খাবার বিশেষজ্ঞ ডক্টর ইভা দেল সোলদাতোর কথায়, ইতালিয়ান রান্নায় টমেটো ব্যবহারের কাহিনি লুকিয়ে রয়েছে তার জটিল ইতিহাসের মধ্যেই। আধুনিক ইতালি হিসেবে ইউরোপের ম্যাপে যে-দেশকে আমরা আজ দেখি, তার জন্ম ১৮৬১ সাল নাগাদ। সেই সময়েই উদ্ভব হয় বর্তমান ঘরানার ইতালিয় খানার। পরবর্তীকালে তার সঙ্গে স্থানীয় আঞ্চলিকতার মেলবন্ধনে গড়ে ওঠে আধুনিক ইতালিয়ান ডিশসমূহ। বর্তমানে সব মিশে গেলেও বেশ কিছু স্থানের খাবারে এই আঞ্চলিক ভাব এখনও প্রবল। সোলদাতোর মতে, খাবার বা তার উপকরণকে আমরা সাধারণত ঐতিহাসিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বিচার না করলেও সেটি গুরুত্বপূর্ণ। এবং স্থানিক প্রভাবের সঙ্গে-সঙ্গে কখনও-কখনও রাজনৈতিক বা ঐতিহাসিক প্রভাবও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

‘অ্যাজতেক গাছ’-এর ইউরোপ বিজয়

টমেটোকে এখন মূলত সবজি হিসেবে রান্নায় ব্যবহার করা হলেও এটি আদতে একধরনের বেরিজাতীয় ফল। দক্ষিণ আমেরিকার পশ্চিমাংশ এর আদি নিবাস। জলে-জঙ্গলে জন্মানো বুনো টমেটোর আকার ছিল অনেকটা কড়াইশুঁটির মতো। তারপর খ্রিস্টপূর্বাব্দ ৫০০ নাগাদ অ্যাজতেকরা মেক্সিকোর দক্ষিণাংশে ও অন্যান্য স্থানে প্রথম টমেটোর চাষ করতে শুরু করে এবং তাকে রান্নায় ব্যবহার করতে শুরু করে। এরপর স্প্যানিশরা আমেরিকায় উপনিবেশ স্থাপন করার পর পরিচিত হয় টমেটোর সঙ্গে। তাদের হাত ধরেই ১৫০০ শতকের মাঝামাঝি ইউরোপে প্রবেশ ঘটে ‘টম্যাটিলো’ বা ‘অ্যাজতেক গাছ’-এর।

তবে কে যে প্রথম ইতালিতে টমেটোর ব্যবহার শুরু করেন, সে কথা অজানা। অনেকে মনে করেন, ইহুদিরা ১৪৯২ সালে স্পেন থেকে বিতাড়িত হওয়ার পর সঙ্গে করে ইতালিতে টমেটো নিয়ে আসেন। আবার কারওর মতে, ১৫৩৯ সালে টলেডোর ইলিয়েনর টাস্কানির গ্র্যান্ড ডিউক কোসিমো ওয়ান দে মেদিচি-কে বিয়ে করার পর, তাঁর হাত ধরেই ফ্লোরেন্সে টমেটোর আবির্ভাব হয়। মোট কথা, ১৫৪৮ সাল নাগাদ কোসিমোর পিসার বাগানে টমেটো গাছের অস্তিত্বের কথা জানা যায়। তবে তখনও পর্যন্ত ইতালিয়ান রান্নায় টমেটো ব্যবহারের কথা ইতালির বাসিন্দারা ভাবতেই পারতেন না।

‘নোংরা’ টমেটো

সোলদাতোর কথায়, নতুন কোনও কিছুকে মেনে নেওয়া তখন আজকের মতো এত সহজ ছিল না। ফলে নতুন বিষয়কে মানুষ সন্দেহের চোখেই দেখতেন এবং এড়িয়ে চলতেই পছন্দ করতেন। আর টমেটোকে যেহেতু ঠান্ডা ফল, তাই প্রাচীন গ্রিক চিকিৎসক গ্যালেনের ‘গ্যালেনিক’ চিকিৎসাবিদ্যা অনুযায়ী, একে খাবারে ব্যবহারের অনুপযুক্ত বলে মনে করা হত। এমনকী, বেশ কিছুকাল পর্যন্ত টমেটোকে বেগুনের সঙ্গেও তুলনা করা হত! মনে করা হত, বেগুনের মতো টমেটোও যেহেতু নোংরা এলাকায় জন্মায়, তাই এটিও পাতে দেওয়ার অযোগ্য।

একই মত পোষণ করেন অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যযুগ ও আধুনিক ভাষার খ্যাতনামা এমেরিটাস অধ্যাপক এবং ইতালিয়ান খাদ্য বিশারদ দিয়েগো জানকানি। তাঁর কথায়, “টমেটো সম্পর্কে তখন মানুষের মনে অপার কৌতূহল থাকলেও একে বিষাক্ত ও বিপজ্জনক বলে মনে করা হত। ফলে মানুষ একে খাওয়ার কথা ভাবতেই পারতেন না! তারপর যখন চিকিৎসকরা আবিষ্কার করেন, কাঁচা টমেটো ত্বকের কোনও সমস্যায় লাগালে দ্রুত সমাধান পাওয়া যায়, তখনই টমেটোর মধ্যে থাকা ভিটামিন সি-র অস্তিত্ব জানা যায়।” এরপরেই আস্তে-আস্তে টমেটো সম্পর্কে মানুষের ভয় কাটতে শুরু করে। বিশ্বাসযোগ্য এক উপাদান হিসেবে টমেটো ইতালিয়ান খাবারে তার জায়গা খুঁজে নিতে শুরু করে। মেক্সিকো থেকে আটলান্টিক পেরিয়ে ইউরোপের মাটিতে অবশেষে শুরু হয় টমেটোর জয়যাত্রা।

ইতালিয়ান রান্নায় টমেটো: প্রথম রেসিপির আত্মপ্রকাশ

১৬৯৪ সালে প্রকাশিত নাপোলির শেফ আন্তোনিয়ো লাতিনির বই ‘মডার্ন স্টুয়ার্ড’-এ টমেটোর যে রেসিপিটি সর্বপ্রথম জায়গা করে নেয়, সেটি হল টমেটো সস। জানকানি জানালেন, এই সস হল “পেঁয়াজ, টমেটো আর কিছু হার্বস মিশিয়ে সুন্দর একটি ঘন সস, যাকে সবরকমের মাংস, বিশেষ করে সেদ্ধ মাংসের সঙ্গে মিশিয়ে খাওয়া হত। অর্থাৎ যা কিছুই স্বাদহীন, তাকে টমেটোর আম্লিকভাবে জারিয়ে সুস্বাদু করে তোলার প্রক্রিয়া শুরু হয়।”

একটা সময় ধনী ব্যক্তিদের কাছে টমেটো ছিল কৌতূহলের বিষয়। “সেযুগে বাড়িতে টমেটো গাছ থাকলে তা ছিল রীতিমতো গর্বের বিষয়। কারণ টমেটো তখন ছিল বিদেশ থেকে আনা বিরল প্রজাতির এক গাছ। তবে ধনী ব্যক্তিরা তাঁদের বাড়ির বাগানে লাগানো টমেটো গাছ নিয়ে গর্ব করলেও তাকে কখনওই খাওয়ার কথা ভাবেননি। কারণ তাঁদের পাতে বেশিরভাগ সময়েই থাকত মাংস ও প্রোটিনযুক্ত খাবার। অন্যদিকে গরিবরা খেতেন ফল, সবজি। ইতালির গরিবরা

অনেকেই সেসময় দায়ে পড়ে টমেটো খেতে শুরু করেন, কারণ বেশিরভাগ সময়েই তাঁদের আর কিছু খাওয়ার থাকত না। আর টমেটোকে সংরক্ষণ করে বেশিদিন রেখে খাওয়া যেত, ফলে ধীরে-ধীরে এটাই তাঁদের কাছে খাবারের এক বিকল্প হয়ে ওঠে,” জানালেন সোলদাতো।

গরিব মানুষের পাত থেকে সফিস্টিকেটেড পিৎজারিয়া!

কিন্তু ইতালি থেকে টমেটো কীভাবে সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ল? বিশেষজ্ঞদের মতে, নেপলস থেকে টমেটো ইতালির স্পেনীয় অধ্যুষিত অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। তারপর আস্তে-আস্তে সমগ্র ইতালিতে টমেটো ছড়িয়ে পড়ে। তবে, এখনও ইতালির উত্তরাংশের খাবারে টমেটোর অপেক্ষাকৃত কম আধিপত্য চোখে পড়বে।

১৯ শতক নাগাদ ইতালিতে ময়দা দিয়ে তৈরি পাস্তার জনপ্রিয়তা বাড়তে শুরু করে। ১৯ শতকের মধ্যভাবে টমেটো সস দিয়ে ম্যাকারনি পাস্তা শুরু হয়, সেইসঙ্গে এর মধ্যে বিনস ও অন্যান্য উপকরণও অবশ্য দেওয়া হত। তবে মধ্য ইতালির টাস্কানি অঞ্চলে অল্প সময়ের মধ্যে টমেটোর রমরমা সবকিছুকে ছাপিয়ে যায়। এখানকার মানুষ দ্রুত টমেটোকে ‘গরিব মানুষের খাবার’ হিসেবে আপন করে নেন। “টাস্কানিতে আসলে কোনও কিছুকেই নষ্ট করা হয় না। তাই বাড়িতে বাড়তি মাংস থাকলে একে পরেরদিন টমেটো সস দিয়ে রান্না করে নেওয়াই দস্তুর। আর শুধু টাস্কানিই নয়। খাবার না নষ্ট করে যতটা সম্ভব ব্যবহার করা বোধহয় ইতালির সংস্কৃতি,” জানালেন সোলদাতো। আর এই ধারণার উপর ভিত্তি করেই তৈরি হয়েছে ব্র্যাজোল রিফ্যাতে, টমেটো সসে তৈরি করা পাউরুটি আর মাংসের স্টু।

হরেক রান্নায় ব্যবহারের জন্য হরেক কিসিমের টমেটো!

এরপর কৃষির উন্নতির সঙ্গে-সঙ্গে ইতালিয়ানরা নানারকম প্রজাতির টমেটো চাষ করতে শুরু করেন। বর্তমানে যেখানে অন্যান্য দেশে ‘টমেটো’ বলতে শুধু ‘টমেটো’-কেই বোঝায়, সেখানে ইতালিতে টমেটো মানেই হরেক কিসিম। কোনওটা কেবল স্যালাডে খাবার উপযুক্ত, কোনওটা রান্নায় ব্যবহার করা হয়। ইতালির জনপ্রিয়তম টমেটো হল ‘সান মারজানো’—লম্বাটে গড়নের এই টমেটো নেপলস ও কাম্পানিয়ার সালেরনো এলাকায় চাষ করা হয়, আর এখানেই রয়েছে ইতালির বিখ্যাত রুফটপ পিৎজারিয়াগুলি।

বর্তমানে আধুনিক কৃষিপ্রযুক্তির সাহায্যে সমগ্র বিশ্বেই টমেটোর চাষ করা হচ্ছে। এমনকী, টমেটোকে সহজে সংরক্ষণ করে টিনজাত করা যায় বলে ‘ক্যানড ফুড’ হিসেবে এর জনপ্রিয়তা প্রবল। জানকানি জানালেন, ১৮০০ শতক নাগাদ আমেরিকান উদ্যোগপতিরা টমেটোকে প্রক্রিয়াকরণের মাধ্যমে টিনজাত করে ইউরোপে রফতানি করতে শুরু করেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর রফতানির হার বাড়তে শুরু করে। তবে পিছিয়ে থাকেনি ইতালিও। উত্তর ইতালির পো উপত্যকার জলাজমিতেও দ্রুত টমেটো চাষের জন্য আদর্শ হিসেবে নির্ধারণ করা হয়, পরে এর সঙ্গে পারমা, মডেনা, পিচেনজা অঞ্চলেও টমেটোর উৎপাদন শুরু হয়।

ইতালিয় রান্নার আত্মা টমেটো

অন্যান্য দেশেও, যেমন মেডিটারেনিয়ান খাবারে টমেটোর ব্যাপক প্রচলন থাকলেও ইতালিকে পিছনে ফেলতে পারেনি কেউই! আপনি যদি কোনও ইতালিয়ানকে জিজ্ঞেস করেন, তাহলে তিনি সঙ্গে-সঙ্গে তার প্রিয় টমেটোর নাম বলে দেবেন। ‘পোমোডোরো ফিয়োরেন্তিনো’ থেকে শুরু করে ‘ক্যুয়োর ডি ব্যৌ’, ‘সান মারজানো’ ইত্যাদি হরেক রকমের টমেটো সেখানে উৎপন্ন হয়, এবং প্রত্যেকটিই তার আলাদা-আলাদা স্বাদ ও ব্যবহারের জন্য বিখ্যাত।

আর যে বিশ্ববিখ্যাত স্প্যাগেটি আল পোমোডোরো রেস্তরাঁতে গেলেই অর্ডার করে থাকেন, আর শেফেদের বাহবা দিয়ে থাকেন, মনে রাখবেন, টমেটো আর স্প্যাগেটির যথাযথ তালমিল না হলে কিছুতেই কিন্তু ভাল স্প্যাগেটি আল পোমোডোরো রান্না করা যাবে না। তাই ইতালিয়ান রান্না বলতেই এখন প্রথমে আসে টমেটোর নাম। আর টমেটো ছাড়া ইতালিয়ান খাবার? ইতালিয় শেফেদের ভাষায়, ইতালিয়ান রান্নায় টমেটো না থাকলে, ইতালি তার আত্মার এক তৃতীয়াংশকেই হারিয়ে ফেলবে!