ইতিবাচক চিন্তা: যেকোনো পরিস্থিতি থেকে উদ্ধারের উপায়

মনস্তত্ত্ব ০৯ মার্চ ২০২১ Contributor
মতামত
ইতিবাচক চিন্তা

জীবনকে সুখ-শান্তিময় করতে অর্থাৎ, সফল ও সার্থক জীবনের জন্য সকল পরিস্থিতিতে ইতিবাচক চিন্তা করার কোনো বিকল্প নেই। কিন্তু ইতিবাচক চিন্তা বলতে কি বুঝায়? যেকোনো পরিস্থিতিতে বা যেকোনো অবস্থায় সঠিক চিন্তা করতে পারাকেই ইতিবাচকতা বলে।

এখন প্রশ্ন হলো সঠিক চিন্তা বলতে কি বুঝায়? সঠিক চিন্তা বলতে বুঝায়, যা কিছু ঘটেছে সেই ঘটনাকে ঐভাবেই দেখা এবং ঐভাবেই ভাবা। অর্থাৎ যা ঘটেছে তা সোজাভাবে দেখা, বাঁকাভাবে নয়। সুতরাং কোনো বিষয় বা ঘটনা যদি সোজাভাবে আপনার নিকট উপস্থাপিত না হয় বা সোজাভাবে যদি আপনি না ভাবেন তবে সিদ্ধান্ত কখনই সঠিক হবে না। সুতরাং যা কিছু ঘটেছে তা সেইভাবে দেখতে পারাই হল ইতিবাচক থাকার পূর্বশর্ত।

ইতিবাচক চিন্তা আপনাকে এনে দিতে পারে সাফল্যের স্বাদ। কেননা চিন্তা ভালো হলে কাজ করার ক্ষেত্রে আত্মবিশ্বাস বেড়ে যায়। আর আত্মবিশ্বাস অটুট থাকলে আপনি যতই কঠিন পরিস্থিতির সম্মুখীন হোন না কেন, তাকে সামাল দেওয়া খুব কষ্টকর হয় না। আর তখন সাফল্যের শীর্ষচূড়ায় আরোহনেও আপনাকে কেউ আটকাতে পারবে না। তাই জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপেই আমাদেরকে ইতিবাচক চিন্তা করতে হবে।

নিম্নে এমনই কয়েকটি কৌশল নিয়ে আলোচনা করা হল যা আপনাকে কঠিন পরস্থিতির মাঝেও ইতিবাচক হতে সাহায্য করবেঃ

ইতিবাচক মানসিকতা সম্পন্ন মানুষের সাথে মিশুন

প্রবাদে আছে, “সৎ সঙ্গে স্বর্গবাস, আর অসৎ সঙ্গে সর্বনাশ।” জীবনে সাফল্য পেতে হলে ইতিবাচক চিন্তার অধিকারী হতে হবে। আর নেতিবাচক মানসিকতা সম্পন্ন মানুষের সাথে মিশলে ইতিবাচক চিন্তা করা কখনই সম্ভব নয়। কেননা যেকোনো বিষয়ের খারাপ দিকটাই মানুষকে বেশি প্রভাবিত করে। সৃষ্টিগতভাবেই নিষিদ্ধ দিকে মানুষের বরাবরই আকর্ষণ বেশি থাকে। তাই নেতিবাচক মানসিকতা সম্পন্ন মানুষের সাথে মেলামেশা করলে আপনার চিন্তাশক্তির উপর অবশ্যই কোনো বিরূপ প্রভাব পড়বে। এবং ধীরে ধীরে আপনার চিন্তা চেতনাও নেতিবাচকতার দিকে মোড় নেবে। কিন্তু আপনি যদি সবসময় ইতিবাচক মানসিকতা সম্পন্ন মানুষের সাথে মিশতে থাকেন তাহলে তাদের সংস্পর্শে আপনার চিন্তাশক্তিও ইতিবাচকতার দিকে মোড় নেবে।

নিজেকে নিয়ে সন্তুষ্ট থাকুন

দুনিয়াতে কোনো মানুষকেই আল্লাহ তা’আলা নিখুঁত করে সৃষ্টি করেননি। সকলেরই কোনো না কোনো দিকে ঘাটতি আছে। কিন্তু আমরা বারবারই অন্যদের সাথে নিজেকে তুলনা করি। নিজের কাছে যা নেই, তা নিয়েই আমরা বেশি মাথা ঘামাই। আর এসব ভাবনাই আমাদের চিন্তাশক্তিকে নেতিবাচক বানিয়ে দেয়। হতাশা নিয়ে আসে জীবনে। এরপর নিজেদের প্রাপ্তিগুলি নিয়েও নেতিবাচক চিন্তা করা শুরু করি। এই সময়টাতেই আমাদের আত্মবিশ্বাসে ভাঙ্গন ধরে। বিরূপ প্রভাব পড়ে মন ও শরীরের উপর।

আমরা যদি নিজেদের অবস্থান নিয়ে সন্তুষ্ট না থাকি তাহলে জীবনে সুখী হওয়াটা অনেক কঠিন হয়ে যাবে এবং ইতিবাচক চিন্তা করাও কঠিন হয়ে পড়বে। তাই আমাদেরকে আল্লাহ তা’আলা যেসকল নিয়ামত দিয়েছেন সেগুলি নিয়েই বেশি ভাবা উচিত। নিজেকে নিয়ে সন্তুষ্ট থাকা উচিত। তবেই জীবনে ইতিবাচকতা আসবে।

ইতিবাচক উক্তি পড়ুন

ইতিবাচক চিন্তাশক্তি বৃদ্ধি করতে চাইলে ইতিবাচক উক্তি পড়ার মত ফলপ্রসূ আর মনে হয় কিছু নেই। মোটিভেশন বা প্রেরণামূলক বাণী ছাড়া জীবনে বেঁচে থাকা কঠিন। প্রেরণামূলক বাণী আমাদের চিন্তাশক্তিকে খুব বেশি প্রভাবিত করে। যা আমাদেরকে উদ্বুদ্ধ করে ইতিবাচক চিন্তা করতে। এই ইতিবাচক চিন্তাই আমাদেরকে সঠিক রাস্তা দেখায়; যেই রাস্তা ধরেই সাফল্যের বারান্দায় পৌঁছানো সম্ভব। অপরদিকে নেতিবাচক কিছু পড়লে সেটাও আমাদের মনকে প্রভাবিত করে; কিন্তু সেটা করে খারাপ দিকে। যেটা জীবনে বয়ে নিয়ে আসতে পারে ব্যর্থতার গ্লানি। তাই ইতিবাচক উক্তি খুব বেশি পড়া প্রয়োজন। আর শুধু পড়লেই হবে না, সেই অনুযায়ী আমল করলেই আপনার চিন্তাশক্তিও ইতিবাচক হবে।

নিজেকে ক্ষমা করতে শিখুন

ভুল করা অন্যায় নয়। কিন্তু বারবার ভুল করাটাই হল মহা অন্যায়। মানুষের দ্বারা ভুল হবে এটাই স্বাভাবিক। কারণ, আল্লাহ আমাদেরকে সৃষ্টিই করেছেন এভাবে। কিন্তু কোনো ভুলকে না শুধরে সেই ভুলকে বারবার করার দ্বারাই ব্যর্থতা আসে। জীবনে চলার পথে ভুলভ্রান্তি হয়েই যায়। কিন্তু সেই ভুলের জন্য নিজেকে দোষারোপের মাধ্যমে তা আঁকড়ে ধরে রাখলে চলবে না। ভুলের জন্য নিজেকে দোষারোপ করার কারণে আত্মবিশ্বাসে ব্যাপক ঘাটতি দেখা যায়।

কিন্তু এই ভুলকে পাশ কাটিয়ে নিজেকে যদি ক্ষমা করে আপন উদ্যমে কাজে নেমে পড়া যায় তখনই ফলাফলটা ভিন্নরকম হবে। সাফল্য তখন নিজ থেকেই আপনার জালে ধরা দিবে। তাই অতীতে করা বিভিন্ন ভুলের জন্য নিজেকে দোষারোপ না করে আল্লাহর নিকট ক্ষমাপ্রার্থনা করুন। আল্লাহর পরম ক্ষমাশীল গূণের উপর আস্থা রেখে মনে করুন যে, আল্লাহ আপনাকে ক্ষমা করে দিয়েছেন। তাই আপনিও নিজেকে ক্ষমা করে দিন। এতে ইতিবাচক মনোভাব অনেক বিকশিত হবে।

ভুলের উৎস খুঁজে বের করুন

তবে ইতিবাচক চিন্তার মানে এই নয় যে, আপনি আপনার ভুলগুলোকে এড়িয়ে যাবেন বা ভুলকে প্রশ্রয় দেবেন। বরং এর মানে হলো ভুলগুলো বা নেতিবাচক দিকগুলোকে খুঁজে বের করে ইতিবাচক চিন্তার মাধ্যমে সেগুলির সমাধান করে সামনের পথে এগিয়ে চলা। কিন্তু আমরা যদি ইতিবাচক চিন্তার নামে নিজের ভুলগুলোকে এড়িয়ে যাই, তবে কোনো ক্ষেত্রেই উন্নতি করা সম্ভব নয়। তাই কোনো ভুল হয়ে গেলে ভুলের উৎস খুজে বের করে বুদ্ধিমত্তার সাথে সেগুলির সমাধান বের করুন।

পরিশেষে বলা যায়, ইতিবাচক চিন্তাই আমাদেরকে সাফল্যের শীখরে পৌঁছে দিতে পারে। তাই কঠিন পরস্থিতিতেও নিজেকে নেতিবাচক চিন্তা থেকে দূরে রাখতে হবে। মনে রাখতে হবে, নেতিবাচক অনুভূতিগুলো যেন আমাদেরকে নিয়ন্ত্রণ করতে না পারে। বরং আমরাই আমাদের নেতিবাচক অনুভূতিগুলোকে ইতিবাচক চিন্তাশক্তি দ্বারা নিয়ন্ত্রণ করব। তাহলেই জীবন সুন্দর হবে। আর সকল পাঠকের জীবন সুন্দর হোক এটাই আমাদের একান্ত কামনা।