ইতিহাসের পাতা উল্টে মিলল ‘কোয়ারান্টাইন’ শব্দের উৎপত্তি

quarantine
ID 175147427 © Sergio Delle Vedove | Dreamstime.com

কোয়ারান্টাইন- শব্দটির সাথে পরিচিত নয় এরকম ব্যক্তি অন্তত আজকের দিনে খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। করোনাভাইরাসের দাপটে আমরা প্রত্যেকেই কমবেশি জানি যে, কোয়ারান্টাইনের অর্থ কোনো সম্ভাব্য সংক্রমিত ব্যক্তিকে একটি বিশেষ সময়ের জন্য ঘরবন্দি রেখে তার রোগের সত্যতা যাচাই করা। এই সময় কোয়ারান্টাইন সমগ্র পৃথিবী জুড়েই বিভিন্ন ভাবে দেখা যাচ্ছে, যেমন চিন সংক্রমণ রুখতে পুরো উহান নগর এবং হুবয়েই প্রদেশকেই বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছিল সেরকমই লোমবার্দী প্রদেশের উপর নেমে আসা মৃত্যুর ছায়ায় অনির্দিষ্টকাল কোয়ারান্টাইনে ইটালি। কী এই কোয়ারান্টাইনের আক্ষরিক অর্থ? কবে থেকেই বা এর প্রচলন?

কোয়ারান্টাইন শব্দের উৎপত্তি ইটালিয়ান “কোয়ারান্তিনা” থেকে। কোয়ারান্তিনা অর্থ চল্লিশ দিন। এই শব্দকেই পরবর্তিকালে পৃথক্করণ অর্থে ব্যবহার করা শুরু হয়, যদিও একেবারে শুরুর দিকে এই শব্দটির ব্যবহার হতো না।

কোয়ারান্টাইনের প্রচলন জানতে হলে আমাদের পিছিয়ে যেতে হবে বেশ কয়েকটি শতাব্দি। চতুর্দশ শতকের মাঝামাঝি সময়, পুরো ইউরোপ জুড়ে নেমে এসেছে মৃত্যুমিছিল। এই সময়টাই ছিল সেই কুখ্যাত প্লেগের সময় যা নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছিল ইউরোপের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ জনসংখ্যা। মানবসভ্যতার ইতিহাসে এর থেকে বড় মহামারী আর চোখে পড়েনি, তবে করোনাভাইরাস এর সমকক্ষ কি না তা সময় বলবে।  ১৩৪৭-৫০ খ্রীষ্টাব্দের মধ্যে এই প্লেগ, যাকে ‘কালো মৃত্যু’ বা ‘ব্ল্যাক ডেথ’  বলা হয়, তা ভয়াবহ মহামারীর রূপ নিয়েছিল। সেই সময় তৎকালীন রাগুসা শহর যার আজকের নাম দুব্রোভনিক (ক্রোয়েশিয়ার শহর), সেখানে ‘ত্রেন্তিনো’ বলে একটি আইন কার্যকর হয়। এই আইনে বলা হয় যে সমস্ত জাহাজ প্লেগ আক্রান্ত শহর থেকে আসছে, সেই জাহাজ ও নাবিকদের ৩০ দিন জাহাজবন্দি থাকতে হবে। এই সময় ওই জাহাজে কারও যাতায়াতের অনুমতিও ছিলনা, আইনভঙ্গকারীদেরও একই শাস্তি ছিল- ৩০ দিন পৃথক্করণ। ত্রেন্তিনো শব্দের অর্থ ৩০ দিন।

এই আইন সেই সময় খুবই কার্যকরী হয়ে ওঠে, এবং প্লেগের প্রাদুর্ভাব কিছুটা হলেও কাটানো গিয়েছিল এর দ্বারা। ফলত প্লেগের আগামী ৮০ বছরে বিভিন্ন দেশে এরকম পদক্ষেপ নেওয়া হয়। যদিও অনুজীবঘটিত রোগের বিষয়ে তখনের চিকিৎসাবিজ্ঞান খুব অনুন্নত ছিল, সাধারণ মানুষও এবিষয়ে অসচেতন ছিল, তবে এই সময় মানুষ ছোঁয়াচে সংক্রমণের ধারণা বুঝতে শুরু করে। ফলস্বরূপ এই ধরণের বিচ্ছিন্নতামূলক পদক্ষেপ নেওয়া শুরু হয়।

৩০ দিনের ত্রেন্তিনো কোনো অজ্ঞাতকারণবশত ৪০ দিনের কোয়ারান্তিনো হয়ে যায়। সময়সীমা তিরিশ থেকে চল্লিশ দিন করে দেওয়ার পিছনে কোনো যুক্তিযুক্ত ব্যাখ্যা খুঁজে পাওয়া যায়নি। অনেকের মতে “৪০ দিন” বিষয়টির মধ্যে ধর্মীয় কারণ আছে, যীশু মরুভূমিতে ৪০ দিন উপোস করেছিলেন অথবা সিনাই পর্বতে মোজেস ৪০ দিন কাটিয়েছিলেন, এই কারণেই চল্লিশ দিন পালন করা হয় বলে অনেকের দাবি। ইতিহাস বলে , ১৩৭৩ সালে যখন ইউরোপে ফের প্লেগের প্রাদুর্ভাব দেখা দিল, ইতালির বন্দরনগরী ভেনিসের প্রশাসনিক কর্তাব্যক্তিরা ঠিক করলেন, অনেক হয়েছে, আর নয়। সিদ্ধান্ত হলো, বাইরে থেকে আসা কোনও জাহাজে প্লেগে আক্রান্ত কোনও রোগী রয়েছেন, এমন সন্দেহ হওয়া মাত্রই সেই জাহাজের ভেনিসে ঢোকার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হবে। সংশ্লিষ্ট জাহাজকে ভেনিসে ঢোকার আগে একটি দ্বীপে চল্লিশ দিন অপেক্ষা করতে হবে।

তবে বৈজ্ঞানিক যুক্তিতে বলা যেতে পারে ৩০ দিন রোগের লক্ষণ বোঝার জন্য পর্যাপ্ত নয়, তাই সেটা বাড়িয়ে ৪০ করা হয়। করোনাভাইরাসের ক্ষেত্রে এই কোয়ারান্টাইনের সময়সীমা ১৪ দিন, এর মধ্যেই আক্রান্ত ব্যক্তি লক্ষণ দেখাতে শুরু করে, ইংরেজিতে এই সময়সীমাকে বলে- ইনকিউবেশন পিরিয়ড।

কোয়ারান্টাইনকে অনেকক্ষেত্রে নিষ্ঠুর ভাবে প্রয়োগ করতেও দেখা গেছে ইতিহাসে। উদাহরণ হিসাবে উল্লেখ করা যেতে পারে, প্লেগ সমকালীন ইটালির কথা- যেখানে আক্রান্ত ব্যক্তিদের শহরের বাইরে ফেলে দিয়ে আসা হতো অথবা মেরে ফেলা হতো। এই কোয়ারান্টাইনের ইতিহাস কিন্তু প্লেগ পূর্ববর্তি সময়েও পাওয়া যায়, যেখানে দেখা যায় কুষ্ঠ আক্রান্ত ব্যক্তিদের বহুদিন আগে থেকে আলাদা করে রাখা হতো।

নিকট-ইতিহাসে কোয়ারান্টাইন দেখা গিয়েছিলো ১৭৯৩ সালে ফিলাডেলফিয়ায় হলুদ-জ্বরে আক্রান্ত সৈনিকদের ক্ষেত্রে, যাদের শহরের বাইরে একটি হসপিটালে রাখা হয়েছিল। একই ভাবে ৭০ জন টাইফাস আক্রান্তকে নিউইয়র্কের কাছে একটি দ্বীপে কোয়ারান্টাইন করা হয়েছিল ১৮৯২ হালে। একবিংশ শতকে কোয়ারান্টাইনের ঘটনা দেখা গিয়েছিল ২০০৩ এ সার্স ভাইরাসের সময় এবং ২০১৪ সালে ইবোলা সংক্রমণেও কোয়ারান্টাইন করা হয়েছিল। বর্তমান করোনাভাইরাসের ফলে পৃথিবী সবচেয়ে বিস্তৃত এবং দীর্ঘসময়ের কোয়ারান্টাইনকে প্রত্যক্ষ করছে।