ইতিহাস কেন উদারনীতির স্মারক বলেছে গিয়াসউদ্দিন আজম শাহকে?

যুদ্ধের মধ্যে দিয়ে নয় বরং মিত্রতা এবং কূটনীতির বন্ধনে বিভিন্ন রাজ্যের সঙ্গে প্রশাসনিক সহায়তা ও সাহায্য বজায় রাখার পক্ষপাতী ছিলেন ইলিয়াস শাহি রাজবংশের তৃতীয় সুলতান গিয়াসউদ্দিন আজম শাহ বস্তুত তাঁর এই প্রকার বিচক্ষণ মানসিকতাই তাঁর সাম্রাজ্যের প্রভূত উন্নতিতে সাহায্য করেছিল সেই সময়ে বাংলায় যে সকল সুলতানেরা শাসন করেছিলেন তাঁদের মধ্যে গিয়াসউদ্দিন আজম শাহ ছিলেন অন্যতম প্রকৃত নাম আজম শাহ সিংহাসন আরোহণের পরে তিনি গিয়াসউদ্দিন আজম শাহ নামটি গ্রহণ করেছিলেন 

শাসক ও সংস্কৃতির পৃষ্ঠপোষক

তাঁর শাসনদক্ষতার কথা ফিরে ফিরে এসেছে বিভিন্ন ঐতিহাসিক বিবরণীতে একজন আদর্শ শাসকের পাশাপাশি তিনি ছিলেন একজন শিক্ষাচিন্তক, সাহিত্যসংস্কৃতির পৃষ্ঠপোষক তাঁর শাসনামলে বাংলার সাংস্কৃতিক চর্চায় প্রভূত উন্নতি ঘটে কাব্যচর্চাতেও তাঁর যথেষ্ট আগ্রহ ছিল আরবি এবং ফারসি ভাষাতে তাঁর কাব্যচর্চার নমুনা পাওয়া যায় তার মধ্যে সবথেকে উল্লেখযোগ্য নিদর্শন হল পারস্য কবি হাফিজের সঙ্গে তাঁর পত্রালাপ 

ঐতিহাসিক বিভিন্ন তথ্যের নিরিখে জানা যায় তিনি ছিলেন একজন উদারনৈতিক শাসক ধর্ম কিংবা ভাষাকেন্দ্রিক নিয়ন্ত্রণ তাঁর শাসনকালে বাংলায় ছিল না এই সময়ে আরবি-ফারসি সাহিত্যের উন্নতির পাশাপাশি বাংলা সাহিত্যেরও উন্নতি ঘটে তাঁরই উৎসাহে শাহ মুহম্মদ শাগীর তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ইউসুফ জোলেখা রচনা করেন তিনি কৃত্তিবাসকেও রামায়ণের অনুবাদ করার ক্ষেত্রে অনুপ্রাণিত করেছিলেন বলেও ধারণা করা হয় 

গিয়াসউদ্দিন আজম শাহ তাঁর পূর্বসূরীদের ধারাবাহিক ঐতিহ্য এবং বিশ্বাসকে যথাযথভাবে রক্ষা করতে সমর্থ হয়েছিলেন আলেম এবং সুফি সাধকদের প্রতি ছিল তাঁর আন্তরিক শ্রদ্ধার্ঘ্য তাঁর সমসাময়িকদের মধ্যে শেখ আলাউল হক ও নুর কুতুব আলাম খুবই বিখ্যাত ছিলেন। তিনি বিহারের শেখ মুজাফফর শামস বলখীকে অত্যন্ত শ্রদ্ধা করতেন। মুজাফফর শামস বলখীর সঙ্গে তাঁর পত্রালাপ ছিল। তিনি পবিত্র মক্কা ও মদীনার তীর্থযাত্রীদের সব ধরনের সাহায্য দিতেন।

গিয়াসিয়া মাদ্রাসা

তিনি একাধিকবার মক্কা ও মদীনা শহরের অধিবাসীদের জন্য প্রচুর উপঢৌকন পাঠিয়েছিলেন। কথিত আছে যে, তিনি ইসলামি শিক্ষা বিস্তারের জন্য মক্কার উম্মে হানির ফটকে একটি এবং মদীনার ’বাব আল-সালামে’র (শান্তির দ্বার) নিকটে অপর একটি মাদ্রাসা নির্মাণ করান। এ প্রতিষ্ঠান দুটির জন্য তিনি প্রয়োজনীয় অর্থও প্রদান করেন। এ দুটি মাদ্রাসা ’গিয়াসিয়া মাদ্রাসা’ নামে পরিচিত। তিনি আরাফা নদীর সংস্কারের জন্য ত্রিশ হাজার স্বর্ণ মুদ্রা (মিছকাল) প্রেরণ করেন।

সাম্রাজ্য বিস্তারের ক্ষেত্রে তিনি যে অন্যধারার শাসক ছিলেন একথা আগেই উল্লেখ করা হয়েছে তাঁর শাসনকালেই চিনের মিং সাম্রাজ্যের সঙ্গে কূটনৈতিক সখ্যতা স্থাপিত হয় সমকালীন চৈনিক সম্রাট ইয়ং লিং-র সঙ্গে তাঁর বন্ধুত্বপূর্ণ যোগাযোগ গড়ে ওঠে সুসম্পর্কের কারণেই তিনি ইয়ং লি-র কাছে উপহার এবং দূত পাঠাতেন রাজনৈতিক এবং প্রশাসনিক কুশল বিনিময়ের উদ্দেশ্যে এছাড়া পারস্যের সঙ্গে সাংস্কৃতিক চর্চার আদান-প্রদানের মাধ্যম তৈরি হয় তাঁর শাসনকালেই শাসনকার্যের প্রথম পর্যায়ে তিনি কামরূপে একটি সামরিক অভিযান পরিচালনা করেন এবং পরিচালনার শেষে তিনি আসাম জয় করেন সাম্রাজ্যের পরিধি বৃদ্ধি পায়

তাঁর শাসনকালে হিন্দুরাও তাঁর রাজদরবারে বিশেষ পদাধিকার পেয়ে থাকত তাঁর আমলেই ভাতুরিয়ার জমিদার রাজা গণেশের উত্থান হয় সুতরাং তাঁর রাজত্বে বাংলায় ধর্ম, সম্প্রদায়ের মধ্যে সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় থাকার পাশাপাশি বাংলায় শিল্প-সংস্কৃতি চর্চাতেও এসেছিল পরিবর্তন 

তথ্যসূত্র-বাংলাপিডিয়া এবং উইকিপিডিয়া