ইতিহাস ঘুরে দেখুন পারস্যের গালিচায় চড়ে

persian carpet
The carpet section of Vakil Bazaar with beautiful kilims, decorated with colorful Persian patterns in Shiraz,Iran. ID 153911169 © Evgeniy Fesenko | Dreamstime.com

কারুকার্যময় পারস্যের গালিচার কথা আমরা প্রত্যেকেই শুনেছি যদিও এ জিনিস চোখে দেখার সৌভাগ্য আমাদের খুব কমজনেরই হয়েছে। এই সুপ্রাচীন গালিচা বা কার্পেটের ইতিহাস জানতে হলে আমাদের পিছিয়ে যেতে হবে প্রায় ২৫০০ বছর।

তখনকার পারস্যে, যা আজকের ইরান, মানুষ নিত্য ব্যবহার্য সামগ্রী হিসাবে গালিচা তৈরি ও ব্যবহার করত। সাধারণত ঠান্ডার থেকে বাঁচার জন্য ও বাড়ির মেঝে বা দেওয়ালকে সাজানোর জন্য এই গালিচা বানানো হতো সেই সময়। তখন থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এই শিল্প বয়ে চলেছে ইরানের মানুষদের মধ্যে। যুদ্ধ, বিপর্যয় বা সংকট কোনো সময়েই গালিচার ঐতিহ্য মুছে যায়নি।

মনে করা হয় যে পারস্যেরও আগে কারুকার্যখচিত গালিচার পীঠস্থান ছিল তৎকালীন ব্যাবিলনে। সম্রাট সাইরাস ব্যাবিলন আক্রমণ করলে তিনি সেখানকার গালিচাশিল্প দেখে মুগ্ধ হন এবং ঐতিহাসিকদের মতে তিনিই পারস্যে গালিচা শিল্পের পত্তন ঘটান। এরপরে বহু রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মধ্যে দিয়ে গালিচা শিল্প হস্তান্তর হতে থাকে। ৬২৮ খ্রীষ্টাব্দে বাইজেন্টাইন সম্রাট হেরাক্লিউস আক্রমণ করেন সাশানদের রাজধানী তিসফুন (Ctesiphon), সেখান থেকে তিনি বহু কার্পেট নিয়ে যান।

এরপর ৬৩৭ খ্রীষ্টাব্দে আরবি সাম্রাজ্য সাশানদের উপর আক্রমণ করে এবং তারাও একাধিক বৃহদাকার গালিচা নিয়ে যায় ফেরার পথে। এর মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত ছিল খসরুর বসন্ত গালিচা, এর আয়তন ছিল লম্বায় ও চওড়ায় ২৭ মিটার। এতই বড় গালিচা ছিল যে সম্রাট খশরু তাঁর বাগান জুড়ে শীতকালে এটি বিছিয়ে রাখতেন বসন্তকে আহ্বান করার জন্য। পরে আরবদের হাতে পরলে এটিকে টুকরো টুকরো করে কেটে তারা নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেয়।

পারস্যে আরবী রাজত্ব শেষ হয় সেলজুক জাতির আক্রমণের মধ্যে দিয়ে। পারস্যের গালিচার মান উন্নয়ন ও বিশ্বব্যাপি প্রচারে এই সেলজুকদের ভূমিকা ছিল প্রধান। সেলজুক জাতির মেয়েরা গালিচার বুননে অসামান্য পারদর্শী ছিল। আজারবাইজানের মতো দেশে আজও এই শিল্পকুশলতা চোখে পরে।

১০৩৮ থেকে ১১৯৪ খ্রীষ্টাব্দ পর্যন্ত সেলজুকরা পারস্যে রাজত্ব করে। তারপর মঙ্গলরা পারস্য দখল নেয়। নৃশংস মঙ্গলদের হাতে এই শিল্প অনেকটাই ধ্বংস হয়ে যায় যদিও তারাও প্রাসাদ সাজাতে এই গালিচাই ব্যবহার করত। গালিচা শিল্পের হাল কিছুটা ফেরে মঙ্গলদের শেষ গুরুত্বপূর্ণ শাসক শারুখের হাত ধরে। যদিও তিনি গালিচা শিল্পের বিশেষ মানোন্নয়ন করেননি তবে একথা বলা যেতেই পারে যে পূর্বপুরুষদের ধ্বংসলীলার প্রায়শ্চিত্ত করেছেন।

ষোড়শ শতাব্দিতে পারস্যের গালিচা খ্যাতি ও উন্নতির চরম শিখরে পৌঁছায়। এই সময়ের সাফাভি রাজবংশ গালিচার নক্সার উন্নতির জন্য বহু পরীক্ষানিরীক্ষা চালায় এবং এর জন্য নির্দিষ্ট কর্মচারী রাখে। এদের মধ্যে প্রধান ছিলেন সম্রাট শাহ আব্বাস, যিনি ইউরোপের সাথে বাণিজ্যসম্পর্ক স্থাপন করেন এবং গালিচাকে পশ্চিমের একটি জনপ্রিয় বিলাসদ্রব্যে পরিণত করেন।

ঐতিহাসিক পরিবেশ ও পরিস্থিতি,জলবায়ু, নতুন নতুন উদ্ভাবনী, সৃজনশীলতা ইত্যাদি কার্পেটের মতো আরও বিচিত্র শিল্প সৃষ্টিতে ইরানি শিল্পীদের প্রেরণা জুগিয়েছে। কার্পেটের ডিজাইনে উঠে এসেছে প্রাচীন ইতিহাস, বোধ বিশ্বাস, আচার প্রথা,সংস্কৃতি ও সমাজের চিত্র। ইরানের কার্পেটগুলোকে মূল্যায়ন করতে গেলে চারটি বিষয় বেশ গুরুত্বের সঙ্গে লক্ষণীয়। ঐতিহ্যবাহী এবং স্থানীয়, প্রাকৃতিক এবং ভেষজ রঙের ব্যবহার, কারিগরি দিক এবং এগুলোর গুণগত মান এবং ইরানি কার্পেটের বুনন কৌশল। রঙের দিক থেকেও ইরানি কার্পেট অসাধারণ। কার্পেটের সূতাগুলো স্বয়ং রঙীন হতে পারে আবার রং করাও হতে পারে। স্বয়ং রঙীন সূতাগুলোতে রঙ লাগানো হয় না। কিন্তু রং করা কার্পেটে রঙীন যেসব সূতা ব্যবহার করা হয় সেইসব রঙের উৎস ভেষজ,খনিজ কিংবা রাসায়নিকও হতে পারে।

রঙের কাজের বিশেষজ্ঞগণ এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের দেখা অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে সেই প্রাচীনকাল থেকে আজ পর্যন্ত কমপক্ষে তিন হাজারের মতো রঙ তৈরি করা হয়েছে ইরানে। ইরানের ইয়াজদ, কাশান এবং ইস্ফাহান শহরের মতো আরও অনেক শহরে এখন অসংখ্য ডাইং হাউজ রয়েছে। এই ডাইং হাউজগুলোতে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার করে এবং ঐতিহ্যবাহী পদ্ধতিতে অর্থাৎ প্রযুক্তির ব্যবহার ছাড়া হাতের সাহায্যেও রং তৈরি করা হয়ে থাকে। মজার বিষয় হলো, বর্তমানে রাসায়নিক উপায়ে তৈরি রঙের মজুদ সত্ত্বেও কার্পেট শিল্পীরা ঐতিহ্যবাহী মানে প্রযুক্তির ব্যবহারহীন প্রাকৃতিক উপায়ে তৈরি রঙের ব্যবহার করছেন।

আজকের দিনে পৃথিবীজুড়ে অসংখ্য বহুমূল্য গালিচা ছড়িয়ে আছে কোনো জাদুঘর বা কারও ব্যক্তিগত সংগ্রহে। এত উচ্চমানের শৈল্পিক সৃষ্টি সত্যিই মুগ্ধ করে দেয় আমাদের এবং বিস্মিত হয়ে ভাবতে হয় কতই না রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম জুড়ে আছে এর অতীতে।