ইফতারে বানিয়ে ফেলুন বিখ্যাত হায়দ্রাবাদি বিরিয়ানি

খাবার ১৪ এপ্রিল ২০২১ Contributor
সুস্বাদু
হায়দ্রাবাদি বিরিয়ানি
Photo : Dreamstime

আজকের নিবন্ধে আলোচনা করব বিখ্যাত হায়দ্রাবাদি বিরিয়ানি বানানোর তরিকা নিয়ে। শুরু হয়ে গিয়েছে পবিত্র রমযান মাস। এই রমযান মাসে রোজা রাখা প্রতিটি মুসলিমের ফরজ। সারাদিন রোজা রাখার পর সময় সূর্যাস্তের সময় মঘরিবের নামাজের পর একসঙ্গে বসে ইফতার করা পাক কাজ। খেজুর দিয়ে প্রথমে ইফতার শুরু করার পর তারপর নানা মুখরোচক খাবার না থাকলে যেন চলেই না! বর্তমানে ভয়াবহ করোনা পরিস্থিতিতে বাইরে কোথাও ইফতার করা বিপজ্জনক। তার উপর ডাক্তাররাও ক্রমাগত বাড়ির তৈরি খাবার খেয়ে সুস্থ থাকার উপরেই জোর দিচ্ছেন। অনেকেই জানেন না, উপকরণ আর যথাযথ রেসিপির যোগান থাকলে বাড়িতে বসেই বানিয়ে নেওয়া যায় বিরিয়ানি থেকে শুরু করে কাবাব, হালিম ইত্যাদি ইফতারের জন্য মুখরোচক নানা পদ।

হায়দ্রাবাদি বিরিয়ানি: স্বাদ ও গন্ধে অতুলনীয়

ভারতের তেলঙ্গনা রাজ্যের শহর হায়দ্রাবাদ। হায়দ্রাবাদকে বলা হয় নিজামদের শহর। আর এই নিজামি ঘরানারই অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হায়দ্রাবাদি বিরিয়ানি। ১৭২৪ সালে আসফ জাহ বর্তমানের তেলঙ্গনা, কর্ণাটক ও মহারাষ্ট্রের কিছু অংশ নিয়ে হায়দ্রাবাদ রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। তারপর সেখানেই ১৭২৪ থেকে ১৯৪৮ সাল পর্যন্ত চলে আসফ জাহি বংশের শাসন। হায়দ্রাবাদের নিজামরা তাঁদের খানাপিনায় বেশ সৌখিন ছিলেন। এইসময়ে উদ্ভব হয় বিখ্যাত হায়দ্রাবাদি বিরিয়ানির। ভারতীয় উপমহাদেশে স্থান-কাল ভেদে বিরিয়ানি নানারকমের হয়। কিন্তু এর মধ্যে আলাদা করে উল্লেখের দাবি রাখে লক্ষ্ণৌয়ের আওয়াধি বিরিয়ানি, হায়দ্রাবাদের হায়দ্রাবাদি বিরিয়ানি আর কলকাতার কলকাত্তাইয়া বা মেটিয়াবুর্জ বিরিয়ানি। এই তিনধরনের বিরিয়ানিই স্বাদ, গন্ধ তাদের জনপ্রিয়তা ও রান্নার প্রক্রিয়ায় স্বকীয় জায়গা করে নিয়েছে বিরিয়ানিপ্রেমীদের মনে।

লক্ষ্ণৌয়ের বাবুর্চিরাই পাড়ি জমাতেন হায়দ্রাবাদে!

নান থেকে শুরু করে কাবাব, বিরিয়ানি… খানাপিনা করতে যারা ভালবাসেন, তাঁদের কাছে হায়দ্রাবাদি ঘরানার রান্নার অন্যরকম জনপ্রিয়তা রয়েছে। লক্ষ্ণৌয়ের নবাবি গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়ের শেষ দিনগুলি নিয়ে রচিত বইয়ে বিখ্যাত লেখক আবদুল হালিম শরারের লেখায় জানা যায়, ১৯ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে কীভাবে লক্ষ্ণৌ ছেড়ে দলে-দলে নবাবের খাস বাবুর্চিরা নিজামের বাবুর্চিখানায় পাড়ি জমাতেন। লক্ষ্ণৌ ছেড়ে আসা এইরকমই একজন বাবুর্চি আস্তে-আস্তে নিজামের বিশেষ প্রিয়পাত্র হয়ে ওঠেন। জানা যায়, ইনি নাকি ‘পাই’ রান্নায় ওস্তাদ ছিলেন, আর নিজাম সেই পাই ব্রিটিশ অতিথিদের সামনে পরিবেশনা করতেন। অতিথিরা যখনই সেই পাই খাওয়ার জন্য ছুরি দিয়ে কাটতেন, সঙ্গে-সঙ্গে নাকি অতিথিদের অবাক করে দিয়ে তার মধ্য থেকে জীবন্ত পাখি উড়ে পালাত!

কিন্তু কোন বিশেষ রান্নার স্টাইলে হায়দ্রাবাদি খাবার এত জনপ্রিয় হয়ে উঠল? সে গল্প লুকিয়ে রয়েছে হায়দ্রাবাদের ঐতিহ্যের মধ্যেই। পাশ্চাত্য থেকে ব্রিটিশ, পর্তুগিজ ঘরানার সঙ্গে ভারতীয় ঐতিহ্যের মেলবন্ধনেই তৈরি হয়েছে সেখানকার বিশেষ রান্নার পদগুলি। এরই মধ্যে সুস্বাদু হায়দ্রাবাদি বিরিয়ানি অন্যতম। একসঙ্গে বসে ইফতার করার সময়

এই রান্নাটিকে রাখতেই পারেন। আসুন, আর দেরি না করে দেখে নেওয়া যায় খাঁটি হায়দ্রাবাদি বিরিয়ানি বানাতে কী কী লাগবে।

হায়দ্রাবাদি মাহবুবি বিরিয়ানি

উপকরণ

মাটন ২ কেজি,

বিরিয়ানির চাল ১ কেজি,

ঘি ৩৫০ গ্রাম

দারচিনি ১ গ্রাম

এলাচ ৬ গ্রাম

জাফরান ৩ গ্রাম

দুধ ৪০০ গ্রাম

ক্রিম ১৫০ গ্রাম

আদা ৮০ গ্রাম

রসুন ৬০ গ্রাম

পেঁয়াজ ১৭৫ গ্রাম

টকদই ৪০০ গ্রাম

সবুজ ছোলা ২৫০ গ্রাম

শাহি জিরা ২ গ্রাম

লবণ ৮০ গ্রাম

চিরঞ্জি দানা ১২ গ্রাম

পোস্তদানা ১২ গ্রাম

ধনে ১২ গ্রাম

জিরা ১০ গ্রাম

বেসন ৫০ গ্রাম

পাতিলেবু ৪টি

ধনেপাতা ১২ গ্রাম

পুদিনাপাতা কয়েকটি

লাল লঙ্কাগুঁড়ো ২৫ গ্রাম

কাঁচালঙ্কা বাটা ২৫ গ্রাম

কীভাবে রান্না করবেন?

প্রথমে দেড় কেজি মাটন বড়-বড় বিরিয়ানির মতো করে পিস করে কেটে নিন। তারপর একটি পাত্রে মাংসের সঙ্গে ২৫ গ্রাম লবণ, আদাবাটা, টকদই দিয়ে ভাল মিশিয়ে ম্যারিনেট করুন।

বাকি হাফ কেজি মাংস কিমা করে ওর মধ্যে আগে থেকে গুঁড়িয়ে রাখা চিরঞ্জি দানা, পোস্তদানা, ধনে, জিরা, লাল লঙ্কাগুঁড়ো, কাঁচালঙ্কা বাটা মিশিয়ে ভাল করে মাখুন। এবার ওর মধ্যে স্বাদ অনুযায়ী লবণ দিয়ে কিমাটাকে কোফতার আকারে গড়ে ভেজে ফেলুন।

কড়াইতে ২০০ গ্রাম ঘি গরম করে কেটে রাখা পেঁয়াজ লাল করে ভেজে নিন। তারপর ম্যারিনেট করা মাংসের টুকরোগুলি ওতে দিয়ে দিন। দইয়ের থেকে বেরনো জল মরে গেলে মাংসের টুকরোগুলিকে ভাল করে রান্না করুন। যদি তখনও সুসিদ্ধ না হয়, তাহলে অল্প একটু জল দিয়ে চাপা দিয়ে ঢিমে আঁচে সিদ্ধ না হওয়া পর্যন্ত রান্না করুন। মাংস সিদ্ধ হয়ে গেলে দুধ, ক্রিম, পাতিলেবুর রস, শাহি জিরা, এলাচ, ধনেপাতা, পুদিনাপাতা, ভেজে রাখা কোফতাগুলি দিয়ে হালকা আঁচে নেড়ে নিন।

এবার একটি হাঁড়ি নিয়ে ওর উপর রান্না করা মাংস দিন। তারপর আগে থেকে সিদ্ধ করে জল ঝরিয়ে রাখা বিরিয়ানির ভাত অর্ধেক দিয়ে ওতে জাফরান দিন। অন্য অর্ধেকে কাঁচা ছোলা ছড়িয়ে দিন। বাকি অংশে ঘি ও দুধ ছড়িয়ে দিন। এরপর হাঁড়ির মুখ বন্ধ করে আটা বা ময়দা মাখা দিয়ে সিল করে দিন। তারপর কাঠকয়লার চুলায় বসিয়ে দিন। যখনই ঘিয়ের আওয়াজ বের হতে শুরু করবে, তখনই চুলার আঁচ কমিয়ে দেবেন। গন্ধ বেরতে শুরু করলে বুঝবেন আপনার হায়দ্রাবাদি মাহবুবি বিরিয়ানি একেবারে তৈরি হয়ে গিয়েছে।

দেখবেন, ঘরের তৈরি বিরিয়ানি রান্নার যা মজা, তা আর কিছুতেই পাবেন না। এবার একসঙ্গে বসে সকলে ইফতারের সময় হায়দ্রাবাদি বিরিয়ানির মজা উপভোগ করুন।

(বিশেষ দ্রষ্টব্য: উপকরণের তালিকায় জিরা নেই। তাই আপনি এটিকে বাদ দিলেও কোনও সমস্যা হবে না।)