ইবাদতের অর্থ ও তাৎপর্য কী?

dreamstime_s_176558978
o 176558978 © Muhammad Annurmal | Dreamstime.com

ইবাদত শব্দের অর্থ গোলামী বা দাসত্ব করা, আনুগত্য স্বীকার করা ইত্যাদি। শরীয়তের পরিভাষায়, প্রকাশ্য কিংবা গোপনীয় যেসব কর্ম আল্লাহ পছন্দ করেন, সেগুলির সামগ্রিক সমষ্টিই হলো ইবাদত।
সুতরাং, রাসূল সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লামের অনুসৃত ও প্রদর্শিত পন্থা অনুযায়ী একমাত্র আল্লাহ তা’আলার সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে গভীর আগ্রহ ও সুদৃঢ় আশা নিয়ে আল্লাহ্‌র পছন্দনীয় কোনো কর্ম সম্পাদন করাকে ইবাদত বলা হয়।

ইবাদতের গুরুত্বকে আমাদের সম্মুখে তুলে ধরতে করে আল্লাহ তা’আলা কুরআনে উল্লেখ করেছেন, “এবং প্রত্যেক জাতির কাছে আমি রাসূল পাঠিয়েছি এ নির্দেশ দিয়ে যে, একমাত্র আল্লাহর ইবাদত করো এবং তাগুতকে বর্জন করো।” (আল কুরআন-১৬:৩৬)

ইবাদতের মূলনীতি

সকল প্রকার ইবাদত হলো সম্পূর্ণরূপে কুরআন-সুন্নাহ নির্ভর বিষয়। আল্লাহ  কিভাবে কোন পদ্ধতিতে তাঁর দাসত্ব তথা ইবাদত পছন্দ করেন, তা কেবল কুরআন ও রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লামের সুন্নাহ ব্যতীত অন্য কোনো মাধ্যমে জানা কারও পক্ষে সম্ভব নয়। তাই ইবাদাতের ক্ষেত্রে নব-উদ্ভাবন বা মনগড়া পদ্ধতির কোনো অবকাশ নেই। কেননা কিভাবে ইবাদত করলে আল্লাহ খুশি ও সন্তুষ্ট হবেন তা কুরআন ও সুন্নাহর মাধ্যমেই আল্লাহ তাঁর বান্দাদেরকে পরিপূর্ণরূপে জানিয়ে দিয়েছেন। তাই কুরআন ও সুন্নাহর পরিপূর্ণ অনুসরণই হলো ইবাদতের মূলনীতি।

ইবাদত কবুল হওয়ার শর্তাবলী-

যে কোনো আমল বা ইবাদত আল্লাহর নিকট গ্রহণযোগ্য হওয়ার জন্য তিনটি মৌলিক শর্ত রয়েছে। যদি তন্মধ্যে একটি শর্তও না পাওয়া যায় তবে তা আল্লাহর নিকট গ্রহণযোগ্য হবে না। শর্তগুলো নিম্নে উল্লেখ করা হলঃ

১) ঈমান

অর্থাৎ ইবাদতকারীকে আল্লাহ্‌র একত্ববাদে দৃঢ়বিশ্বাসী হতে হবে। আল্লাহ তা’আলা বলেন,  “যে ব্যক্তি ঈমানকে অস্বীকার করবে, নিঃসন্দেহে তার সমস্ত আমল বিনষ্ট হয়ে যাবে এবং আখিরাতে সে ক্ষতিগ্রস্থদের অন্তর্ভুক্ত হবে।” (আল কুরআন-৫:৫)

২) ইখলাস

তথা বিশুদ্ধ নিয়ত বা সংকল্প। অর্থাৎ ইবাদত করতে হবে একনিষ্ঠভাবে, কেবলমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে। এছাড়া অন্য কোনো উদ্দেশ্যে করলে তা ইবাদত বলে গণ্য হবে না। 
মোটকথা, ইবাদতকে সম্পূর্ণরূপে সকল প্রকার শির্‌ক তথা অংশীদারীমুক্ত রাখতে হবে এবং একনিষ্ঠভাবে এক আল্লাহ্‌র ইবাদত করতে হবে। আল্লাহ তা’আলা বলেন, “তাদেরকে এ নির্দেশ করা হয়েছে যে, তারা খাঁটি মনে একনিষ্ঠভাবে আল্লাহ্‌র ইবাদত করবে, সালাত কায়েম করবে এবং যাকাত আদায় করবে…” (আল কুরআন-৯৪:৫)

৩) সুন্নতের অনুসরণ 

রাসূল সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লামের সুন্নাতের অনুসরণ। অর্থাৎ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদেরকে যেভাবে ইবাদত করতে শিখিয়েছেন ঠিক সেভাবেই আল্লাহর ইবাদত করতে হবে। আল্লাহ বলেন, “(হে নবী) আপনি বলে দিন! যদি তোমরা আল্লাহকে ভালোবাসো তবে আমার অনুসরণ করো।” (আল কুরআন-৩:৩১)

“তোমাদের মধ্যে যারা আল্লাহ ও শেষ দিবসের প্রতি বিশ্বাস রাখে এবং আল্লাহকে বেশি বেশি স্মরণ করে, তাদের জন্য রাসূলের মধ্যে উত্তম আদর্শ রয়েছে।” (আল কুরআন-৩৩:২১)

অর্থাৎ, কোনো অবস্থাতেই রাসূল সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লামের অনুসৃত ও প্রদর্শিত পন্থা ব্যতীত অন্য কোনো পন্থায় আল্লাহর ইবাদত করা যাবে না।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লামও এরশাদ করেছেন, “যে ব্যক্তি আমাদের এ দ্বীনের মধ্যে এমন কোনো নবউদ্ভাবন ঘটাবে যা এর অন্তর্ভুক্ত নয়, তাহলে তা প্রত্যাখ্যাত হবে।”

সুতরাং, যে কোনো আমল তথা ইবাদত আল্লাহর নিকট গ্রহণযোগ্য হওয়ার জন্য উপরোক্ত তিনটি শর্ত অবশ্যই থাকতে হবে। এগুলি ছাড়া কোনো ইবাদতই আল্লাহর নিকট কবুল হবে না।

ইবাদতের প্রকারভেদ

ইবাদতকে সাধারণভাবে দুই প্রকারে বিন্যস্ত করা যায়। কিছু ইবাদত বা আমল আছে যেগুলি আল্লাহর সাথে সম্পর্কিত। এগুলিকে হাক্কুল্লাহ বা আল্লাহর হক বলে। আর কিছু আমল আছে যেগুলি বান্দার সাথে সম্পর্কিত। এগুলিকে হাক্কুল ইবাদ বা বান্দার হক বলে।

সালাত, সিয়াম, হজ্জ্ব, যাকাত, আল্লাহর নিকট দু‘আ করা, আল্লাহর যিকির করা, কুরআন তেলাওয়াত করা, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে সর্বাধিক ভালোবাসা, আল্লাহকে ভয় করা ও তাঁর নিকট তাওবা করা, কথা-বার্তায় সত্যবাদিতা অবলম্বন করা, কাফের ও মুনাফেকদের বিরুদ্ধে জিহাদ করা ইত্যাদি ইবাদত আল্লাহর সাথে সম্পর্কিত।

অনুরূপভাবে, আমানত আদায় করা, পিতামাতার সেবা করা, আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখা, ওয়াদা বা অঙ্গীকার পূর্ণ করা, সৎকাজের আদেশ দেয়া ও অন্যায় কাজে বাধা দেয়া, ইয়াতীম, মিসকীন, অসহায়, মুসাফির ও দাস-দাসির প্রতি অনুগ্রহ করা, জীব-জন্তুর প্রতি ইহসান বা দয়া করা ইত্যাদি সবগুলোই আলাহর বান্দা বা সৃষ্টির সাথে সম্পর্কিত।

এগুলির কোনোটির মধ্যে কমবেশি করলে তা ইবাদতে ত্রুটি বলে গণ্য হবে।