ইবাদতের বাহ্যিক রূপরেখা কেমন হওয়া উচিত

dreamstime_s_124445632

ইতিহাস থেকে আমরা এটি দেখতে পাই যে, অনেক ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব ইবাদতের অভ্যন্তরীণ দিককে ইবাদতের বাহ্যিক দিকের উপর প্রাধান্য দিয়ে থাকেন। কিন্তু ইবাদতের ক্ষেত্রে মূলত অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক এরকম শ্রেণিবিন্যাস করা যথার্থ না। ইবাদতের ক্ষেত্রে অভ্যন্তরীণ দিকগুলি যেরকম গুরুত্বপূর্ণ, বাহ্যিক দিকগুলির গুরুত্বও তাঁর থেকে কোনো অংশে কম নয়। তবে কোনো ক্ষেত্রে বাহ্যিক ক্ষেত্রের গুরুত্ব বেশি হয়ে যায়। উদাহরণস্বরূপ, ইবাদত পরিপূর্ণ হওয়ার জন্য বাহ্যিক ক্ষেত্রে পবিত্রতা যেমন জরুরী, অভ্যন্তরীণ ক্ষেত্রেও তেমনি পবিত্রতা জরুরী। তবে অভ্যন্তরীণ ক্ষেত্রে আত্মিক পবিত্রতা কেউ যদি পুরোপুরি অর্জন করতে নাও পারে তবুও ইবাদত কবুল হয়ে যাবে। কিন্তু বাহ্যিক পবিত্রতা অর্জন না করলে কোনো ইবাদত কবুলই হবে না। এ কথার দ্বারা অভ্যন্তরীণ ক্ষেত্রকে অস্বীকার করা বা গুরুত্ব কম দেওয়া উদ্দেশ্য নয়; বরং বাহ্যিক ক্ষেত্রের গুরুত্ব তুলে ধরা উদ্দেশ্য।

অধিকাংশ ধর্মে দ্বীনদারি ও আল্লাহর প্রতি আনুগত্য প্রদর্শনের সর্বাত্মক পরিচিতি হিসেবে কোনো নির্জন গুহায় বা গর্তে বসে দুনিয়ার সংযোগ হতে বিছিন্ন হয়ে একাকী অবস্থান করাকে প্রাধান্য দেওয়া হয়। তবে এ জাতীয় কর্মকান্ডকে ইসলাম ইবাদত হিসেবে গণ্য করে না। এমনকি তা ইবাদতের যথার্থ নিয়মও হতে পারে না। বস্তুত ইবাদত হচ্ছে আল্লাহর হুকুম এবং বান্দার হক আদায় করা। সুতরাং এই অর্থে, যে ব্যক্তি নিজের পরিবেশ ও প্রয়োজনকে ত্যাগ করে একান্ত নিভৃতে অজানার অন্তরালে লুকানোর চেষ্টা করে সে কখনই তার আত্মীয়সম্পর্কীয়দের দায়-দায়িত্ব ও অধিকার আদায় করতে পারে না।

প্রকৃতপক্ষে ইসলামের মূল লক্ষ্য ও দৃষ্টিভঙ্গি হচ্ছে এই যে, মানুষ চতুর্মুখী ব্যস্ততা থাকা সত্ত্বেও আল্লাহর হুকুমসমূহ আদায় করে যাবে। জাগতিক সম্পর্কের উপাদানগুলোর প্রতি দৃষ্টিপাত না করে নিজেকে সকলকিছুর থেকে আড়াল করে ফেলা ইসলামে কখনই কাম্য নয়। ইসলামের দৃষ্টিতে দায়িত্ব ও কর্তব্য বর্জনের নাম ইবাদত নয়, সৃষ্টির কল্যাণার্থে সকল কাজই ইবাদত; বরং কর্তব্য ও দায়িত্ব প্রতিপালনের পরিপূর্ণ রূপই সত্যিকারের ইবাদত হিসেবে গণ্য। যে সকল সাহাবী পরিবার-পরিজনকে ছেড়ে, আত্মীয়দের হক বিস্মৃত হয়ে দিনভর সিয়াম পালন ও রাতভর জেগে ইবাদত-বন্দেগীর সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন তাদেরকে লক্ষ্য করে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম নির্দেশ দিয়েছিলেন, “তোমরা এমন আর করো না। জেনে রেখো, তোমার উপর তোমার স্ত্রীর, ছেলে-সন্তানের হক আছে, তোমার মেহমানদের হক আছে, তোমার প্রাণের হক আছে, তোমার চোখেরও হক আছে।”

সুতরাং, ইসলামের দৃষ্টিতে ইবাদত হচ্ছে যাবতীয় হকসমূহ আদায় করা।

একবার কোনো এক যুদ্ধের সময় জনৈক সাহাবী এমন একটি স্থানের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন, যেখানে একটি নির্জন গুহা ছিল এবং এর পাশেই ছিল স্বচ্ছ পানির ঝর্ণা এবং একপ্রান্তে ছিল ছোটখাট মরুদ্যান ও ফল-ফলাদীর সমাহার। একাতীত্ব জীবনযাপনের জন্য স্থানটি তাঁর কাছে খুবই উপযোগী বলে মনে হল। তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লামের খেদমতে হাজির হয়ে বললেন, “ইয়া রাসূলুল্লাহ! আমি একটি গুহার সন্ধান পেয়েছি। এখানে জীবনধারণের জন্য প্রয়োজনীয় সবকিছুই আছে। আমার মন চাই, এই নির্জন গুহায় আল্লাহর ইবাদত করি এবং জাগতিক সকল সম্পর্ক ছিন্ন করে এখানে চলে আসি।” এ কথা শুনে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম রাগান্বিত হয়ে বললেন, “ইহুদী-নাসারাতের বিকৃত জীবনব্যবস্থা নিয়ে আমি আগমন করিনি। বরং আমি নিয়ে এসেছি হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর ঐ জীবনব্যবস্থা যা সহজ, সরল ও আলোকোজ্জ্বল।”

ইবাদতের উদ্দেশ্য ও উপকারিতা

ইবাদতের প্রধান উদ্দেশ্য আল্লাহর জিকির বা স্মরণ দ্বারা হৃদয়কে সজীব ও সতেজ রাখা। আল্লাহ  বলেন, “তোমরা আমার স্মরণে সালাত আদায় করো।” (আল কুরআন-২০:১৪)

অন্য আয়াতে আল্লাহ জিকিরের উপকারিতা বর্ণনা করে বলেন, “যারা মুমিন, আল্লাহর যিকিরে(স্মরণে) তাদের হৃদয় প্রশান্ত হয়। নিশ্চয় আল্লাহর যিকিরের দ্বারা অন্তরসমূহ প্রশান্তি লাভ করে।” (আল কুরআন-১৩:২৮)

অর্থাৎ ইবাদত মানুষকে মানসিক প্রশান্তি দান করে। ফলে জাগতিক জীবনে স্বস্তি ও স্থিতি লাভ হয়। আল্লামা মুকাতিল (রহ.) উপরোল্লিখিত আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন, “ইবাদত মানুষের এক্বীন বা ঈমানকে সুদৃঢ় করে। আর এই ঈমানই তার অন্তরকে প্রশান্ত করে। আল্লাহর প্রতি অবিশ্বাস ও আস্থাহীনতা মানুষের হৃদয়কে বিক্ষিপ্ত করে ও অশান্ত করে তোলে।”

আল্লামা ইবনে তাইমিয়া (রহ.) আল্লাহর যিকির তথা স্মরণকে মুমিনের জন্য দুনিয়ার জান্নাত বলে আখ্যা দিয়েছেন। তিনি বলেন, “নিশ্চয়ই দুনিয়ায় একটি জান্নাত রয়েছে। যে ব্যক্তি তাতে প্রবেশ করে না, সে আখিরাতের জান্নাতেও প্রবেশ করতে পারবে না।”