ইবাদত কিভাবে পূর্ণতা লাভ করে?

Dates, Quran, prière
© Ruslan Galiullin | Dreamstime.com

মানুষ সৃষ্টির প্রধান উদ্দেশ্য হল আল্লাহর ইবাদত করা। তাই ইবাদতই মানবজীবনে সাফল্য ও ব্যর্থতার পরিমাপক। কিন্তু মহামূল্যবান এই ইবাদত বান্দার সামান্য ভুলের কারণে অনেক সময় অর্থহীন হয়ে যায়। আখিরাতে নেক আমলের যথাযথ মূল্যায়নের প্রধান শর্ত হলো ইবাদত একমাত্র আল্লাহর জন্য হওয়া, তাতে জাগতিক কোনো উদ্দেশ্য ও স্বার্থ জড়িত না থাকা, বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ ত্রুটিমুক্ত হওয়া। আল্লাহ বলেন, “তাদেরকে কেবল একনিষ্ঠভাবে আল্লাহর ইবাদতের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।” (আল কুরআন-৯৮:৫)

ইবাদতের বাহ্যিক ত্রুটি হলো, তা রাসূল সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লামের তরীকায় না হওয়া। আর ইবাদতের অভ্যন্তরীণ ত্রুটি হলো নিয়তে গড়মিল থাকা। অর্থাৎ, আল্লাহর সন্তুষ্টি ব্যতীত অন্য কোনো উদ্দেশ্যে ইবাদত করা। যেমন—মানুষের প্রশংসা, সামাজিক প্রভাব-প্রতিপত্তি ইত্যাদির তাড়নায় ইবাদত করা। ইসলামী পরিভাষায় একে রিয়া বা লোক দেখানো ইবাদত বলা হয়।

রিয়া হল নিয়তের অসততা, যা ইবাদতকে মূল্যহীন করে দেয়। নিয়ত ঠিক না হলে আল্লাহর কাছে বান্দার কোনো আমলই গ্রহণযোগ্য হয় না। আবার নিয়ত শুদ্ধ থাকলে আল্লাহ জাগতিক কাজকেও ইবাদতের মর্যাদা দিয়ে থাকেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “নিশ্চয় প্রত্যেক কাজের ফলাফল নিয়তের ওপর নির্ভরশীল।”

মানুষের ভিতর রিয়া বা লোক দেখানো বিভিন্নভাবে প্রকাশ পায়। কেউ ইবাদতের সময় প্রত্যাশা করে মানুষ তার ইবাদত দেখে প্রশংসা করুক। আবার কারও উদ্দেশ্য থাকে ইবাদতের মাধ্যমে প্রভাব-প্রতিপত্তি বৃদ্ধি পাক। কেউ প্রত্যাশা করে, মানুষ তার ইবাদত দেখে তাকে সম্মান করুক। রিয়ার উদ্দেশ্য যাই হোক না কেন, তার পরিণতি ভয়াবহ। এমন ইবাদত আল্লাহর কাছে মোটেও গ্রহণযোগ্য নয়। আখিরাতে এসব ইবাদত ঐ ব্যক্তির জন্য বোঝা ও আক্ষেপের কারণ হবে।

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম রিয়াকে শিরকে আসগার বা ছোট শিরক বলেছেন। তিনি বলেন, “আমি তোমাদের ব্যাপারে ছোট শিরক নিয়ে যতটা ভয় পাচ্ছি, অন্য কোনো ব্যাপারে অতটা ভীত নই।” সাহাবীরা একথা শুনে বললেন, “ইয়া রাসূলুল্লাহ, ছোট শিরক কী?” তিনি বলেন, “রিয়া বা লোকদেখানো। আল্লাহ কিয়ামতের দিন বান্দার আমলের প্রতিদান প্রদানের সময় বলবেন, “তোমরা পৃথিবীতে যাদেরকে দেখাতে তাদের নিকট যাও। দেখো তাদের কাছে কোনো প্রতিদান পাও কিনা?”

পবিত্র কুরআনেও আল্লাহ লোক-দেখানো ইবাদত থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দিয়েছেন। আল্লাহ বলেন “যে ব্যক্তি তার রবের সাথে সাক্ষাতের আশা রাখে, সে যেন নেককাজ করে এবং ইবাদতে কাউকে শরীক না করে।” (আল কুরআন-১৮:১১০)

অন্য আয়াতে যারা লোক-দেখানো ইবাদত করে তাদেরকে নিন্দা করে আল্লাহ বলেন, “ধ্বংস হোক সেসকল নামাজি, যারা তাদের নামাজের ব্যাপারে উদাসীন, যারা লোকদেখানোর জন্য নামাজ আদায় করে এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস দেওয়া থেকে বিরত থাকে।” (আল কুরআন-১০৭:৪-৭)

উল্লেখিত আয়াত ও হাদিসের আলোকে ইসলামী স্কলাররা রিয়াকে কবিরা গুনাহ ও হারাম বলেছেন।

বান্দার আমলে যদি রিয়া ইচ্ছাকৃতভাবে হয়, তবে তা যত ক্ষুদ্রই হোক না কেন তা আল্লাহর দরবারে গ্রহণযোগ্য হয় না। হাদিসে কুদসীতে এসেছে, আল্লাহ বলেন, “আমি সকল অংশদারীদের থেকে অমুখাপেক্ষী। যে ব্যক্তি কোনো আমল করে এবং তাতে আমার সাথে কাউকে শরিক করে, তবে আমি তাকে ঐ শরীককারীর নিকট ন্যস্ত করে দিই।”

তবে রিয়া যদি ইচ্ছার বিরুদ্ধে হয়, বান্দা তা থেকে বিরত হওয়ার চেষ্টা করে এবং এজন্য অনুতপ্তও হয়, তবে এক্ষেত্রে গ্রহণযোগ্য মত হলো, এমন ইবাদত আল্লাহর দরবারে প্রত্যাখ্যাত হয় না। বরং এর দ্বারা ঐ ব্যক্তি ইবাদতের দায় থেকে মুক্তি পাবে। তবে এর প্রতিদান কি হবে, তা আল্লাহই ভাল জানেন।

রিয়া বা লোক দেখানো থেকে আত্মরক্ষার জন্য ইসলামী স্কলাররা কয়েকটি প্রচেষ্টার কথা বলেছেন। এখানে কয়েকটি উল্লেখিত হলো-

-ইবাদতের সময় আল্লাহকে স্মরণ করা। এ কথা চিন্তা করা যে, আল্লাহ আমার মনের খবর জানেন; আমি কি করছি, কেন করছি তা সবই তিনি দেখেন ও জানেন। হাদিসে যেমন বর্ণিত হয়েছে, “তুমি এমনভাবে আল্লাহর ইবাদত করো যেন তুমি তাঁকে দেখছ। যদি তা সম্ভব না হয়, তবে এতটুকু চিন্তা করো যে, তিনি তোমাকে দেখছেন।”

-রিয়ার ভয়াবহতার কথা স্মরণ করা। রিয়া আল্লাহর ক্রোধের কারণ, তা সর্বদা স্মরণ রাখা।

-রিয়ামুক্ত আমলে কি পুরস্কার তা স্মরণে রাখা এবং তা অর্জনে ব্যকুল হওয়া।

-আল্লাহর কাছে অনুতপ্ত হয়ে ক্ষমা চাওয়া, যেন তিনি অনুগ্রহ করে আমলটি কবুল করে নেন।

-রিয়ামুক্ত আমলের তৌফিক চেয়ে আল্লাহর কাছে দু’আ করা।