ইরানী ভেষজ চিকিৎসা- স্বাস্থ্যসুরক্ষায় আধুনিক ও জনপ্রিয়

স্বাস্থ্য Contributor
ইরানী

ইরানী চিকিৎসা ব্যবস্থায় বিভিন্ন রোগের চিকিৎসায় পঁচিশশতের অধিক ভেষজ উদ্ভিদের ব্যবহার করা হয়। এছাড়া রাসায়নিকতা মুক্ত বিভিন্ন চিকিৎসা পদ্ধতি যথা রক্ত শোষণ, ম্যাসাজ, তাপ চিকিৎসা, পানি চিকিৎসা প্রভৃতি পদ্ধতি বিভিন্ন রোগের চিকিৎসায় ব্যবহার করা হত।

কোন প্রকার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ছাড়াই এই চিকিৎসা পদ্ধতিতে রোগের নিরাময় বর্তমানে নতুনভাবে একে তুমুলভাবে জনপ্রিয় করে তুলেছে। ইরানের অভ্যন্তরে এবং বর্হিবিশ্বে এই চিকিৎসা পদ্ধতির উপর ভিত্তি করে বিভিন্ন ঔষধ তৈরিকারী প্রতিষ্ঠান নতুন করে অগ্রসর হচ্ছে।

৬৫০০ খ্রিস্ট পূর্বাব্দ থেকেই ইরানী ঐতিহ্যবাহী ভেষজ চিকিৎসার প্রচলনের ধারাবাহিকতা চলে আসছে।

ইসলামের আবির্ভাবের পর এই চিকিৎসা পদ্ধতি এক নতুন উচ্চতায় স্থান গ্রহণ করে। দশম শতাব্দীর মুহাম্মদ ইবনে যাকারিয়া আল-রাজী এবং একাদশ শতকের ইবনে সিনা ইরানের এই ঐতিহ্যবাহী চিকিৎসাব্যবস্থার উন্নতি সাধনের দুই অগ্রপুরুষ।

গ্রিক-আরব ইউনানী চিকিৎসার মতই, ইরানী ঐতিহ্যবাহী চিকিৎসাব্যবস্থায় ধারণা ছিল, মানব শরীর চারটি মূল উপাদান দ্বারা পরিপূর্ণ। কফ, রক্ত, হলুদ পিত্তরস এবং কালো পিত্তরস; এই চারটি পদার্থের সমন্বয়ে মানুষের শারীরিক ও মানসিক চরিত্র তৈরি হয়, যাকে বলা হয়েছে মেজাজ বা তাপমাত্রা। এই চারটি উপাদান যার শরীরে ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থায় থাকবে, সে শারীরিক ও মানসিকভাবে সুস্থ থাকবে। এই উপাদানসমূহের ভারসাম্য কোনভাবে নষ্ট হলেই ব্যক্তি অসুস্থ হয়ে পড়বে।

আল-রাজী এই চারটি মূল উপাদান সংক্রান্ত গবেষণার উন্নতি সাধন করেন এবং ইবনে সিনা তার বিখ্যাত চিকিৎসাশাস্ত্র সংক্রান্ত বিশ্বকোষ ‘আল কানুন ফিত তিব্ব’ গ্রন্থে এ সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করেন।

ইরানী চিকিৎসাব্যবস্থা অনুসারে, এই চারটি মূল উপাদানের আধিক্য বা অভাবের কারণে মানব শরীরের মৌলিক অবস্থার পরিবর্তন হতে পারে।

এর ফলে মানবদেহে উষ্ণতা, শীতলতা, শুষ্কতা ও আর্দ্রতার ভারসাম্য নষ্ট হয় এবং মানবদেহ সহজেই রোগাক্রান্ত হয়ে পড়ে।

শিশুর ভ্রুণের বিকাশের সাথে সাথে তার মৌলিক উপাদান নির্ধারিত হতে থাকে। পিতা-মাতার জিন থেকেই  এই মৌলিক উপাদানসমূহ প্রভাবিত হয়।

মেজাজ বা তাপমাত্রাকে আবার নয়টি প্রকারভেদে ভাগ করা হয়। উষ্ণ, শীতল, শুষ্ক, আর্দ্র, উষ্ণ ও শুষ্ক, উষ্ণ ও আর্দ্র, শীতল ও শুষ্ক, শীতল ও আর্দ্র এবং সহনীয়।

ইরানী ঐতিহ্যবাহী চিকিৎসাব্যবস্থার একটি বিশেষ দিক হল, তা কোন ব্যক্তির রোগে আক্রান্ত হওয়ার পর চিকিৎসার পরিবর্তে আক্রান্ত হওয়ার পূর্বেই ব্যক্তির দৈনন্দিন জীবনে স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করার দিকে জোর প্রদান করা হতো। ব্যক্তির শরীরের তাপমাত্রার পরিমাপের মাধ্যমে তার অসুস্থতার সম্পর্কে আগাম তথ্য সংগ্রহ করা হতো।

ইরানী চিকিৎসা ব্যবস্থায় মানুষের দৈনন্দিন জীবনের ছয়টি বিষয়ের প্রতি লক্ষ্য রাখা হত।

মানুষের খাদ্য গ্রহণ, পারিপার্শ্বিক আবহাওয়ার অবস্থা, ঘুম ও হাঁটা, শারীরিক পরিশ্রম, মানসিক অবস্থা এবং শরীরের মধ্যকার অবাঞ্চিত বস্তুসমূহ (ঘাম, মল-মূত্র) থেকে মুক্তি; এই ছয়টি বিষয়কে মূল লক্ষ্যে রেখে চিকিৎসা সম্পন্ন করা হত।

এই চিকিৎসা পদ্ধতির মৌলিক কথাই ছিল, মানুষ যে উপায়ে তার দৈনন্দিন জীবন পরিচালনা করবে, তার মেজাজ বা তাপমাত্রাও ঠিক সেই প্রকার জীবনযাত্রার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে।

উদাহরণস্বরূপ, টক স্বাদযুক্ত বিভিন্ন খাবার যথা আচার, টক ফল প্রভৃতি শীতলতা ও শুষ্কতার সৃষ্টি করে। দুগ্ধজাত খাবারসমূহ যেমন দই এবং সাইট্রাসজাতীয় ফল যেমন কমলা, লেবু, মাল্টা প্রভৃতিকে চিন্তা করা হয়েছে শীতলতা ও আর্দ্রতার ধারক হিসেবে। নোনতা, তিতা, ঝাল ও মসলাদার খাবারসমূহ উষ্ণতা ও শুষ্কতা এবং মিষ্টি স্বাদযুক্ত খাবারকে উষ্ণতা ও আর্দ্রতা ধারণকারী খাবার হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে।

এই বিবেচনায় শীতল ও শুষ্ক মেজাজের লোকদের পরামর্শ দেওয়া হত, টক স্বাদের খাদ্য ও পানীয় অধিকহারে গ্রহণ পরিহার করার জন্য যাতে তাদের শরীরে মৌলিক উপাদানসমূহের ভারসাম্য বজায় থাকে এবং তারা রোগ থেকে মুক্ত থাকে। একইভাবে উষ্ণ ও আর্দ্র মেজাজের লোকদের মিষ্টি, উষ্ণ ও শুষ্ক মেজাজের লোকদের খাদ্যে অধিক ঝাল, মসলা ও লবণ পরিহার এবং শীতল ও আর্দ্র মেজাজের লোকদের তুলনামূলকভাবে কম  দুগ্ধজাত খাদ্য, পানীয় ও সাইট্রাসজাতীয় ফল গ্রহণের জন্য পরামর্শ দেওয়া হত।

Enjoy Ali Huda! Exclusive for your kids.
Enjoy Ali Huda! Exclusive for your kids.
Enjoy Ali Huda! Exclusive for your kids.