ইলখানাত-এর মূল দুই লক্ষ্য ছিল মুসলিম রাষ্ট্রগুলির ক্ষমতা দখল আর বিজয়

এশিয়া ২২ এপ্রিল ২০২১ Rupsa Gupta
মতামত
ইলখানাত
Photo : Dreamstime

ইলখানাত ছিল মোঙ্গল সাম্রাজ্য ভেঙে যাওয়ার পরে উঠে আসা চারটি খানাত নেতৃত্বের মধ্যে অন্যতম। এই খানাতের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন চেঙ্গিস খানের অন্যতম পৌত্র, হালাকু খান। ত্রয়োদশ শতাব্দীর মাঝামাঝি থেকে চতুর্দশ শতাব্দীর প্রথমার্ধ পর্যন্ত এই খানাত ক্ষমতাসীন ছিল। পারস্যে অবস্থিত এই খানাতের এলাকা পশ্চিমে তুরস্ক থেকে পূর্বে উত্তর-পশ্চিম ভারত পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। বাকিগুলোর মতো এই খানাত রাজত্বেরও মূল লক্ষ্য ছিল নতুন এলাকা জয় করা এবং তার ক্ষমতা দখল করা।

ইলখানাত-এর প্রাথমিক ইতিহাস

ইলখানাতের সূচনা হয় ১২১৯ থেকে ১২২৪ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে, যখন চেঙ্গিস খান খাওয়ারাজমিয়ান অধিকার করেন। মোঙ্গলরা এই সময়েই মধ্য এশিয়ার মুসলিম রাজ্যগুলি দখল করতে শুরু করে। ত্রয়োদশ শতাব্দীর মাঝামাঝি পারস্যের এক বিশাল অংশ মোঙ্গলদের অধীনস্ত হয়ে যায়। ১২৫৫ শতাব্দী নাগাদ মোঙ্গলরা মধ্য প্রাচ্যে আবার নতুন করে অভিযান শুরু করে। সেনা অধিনায়কের বদলে এই বার মোঙ্গল রাজ পরিবারের সদস্যই এই দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তোলুইদ বংশ এই সময়ে মোঙ্গল রাজত্ব শাসন করছিল। চেঙ্গিস খান এবং তাঁর প্রথমা স্ত্রীর চতুর্থ পুত্র ছিলেন তোলুই। তাঁর বড় ছেলে ছিলেন মঙ্গকে খান। হালাকু খান ছিলেন তাঁর ভাই। হালাকু খানের উপর দায়িত্ব ছিল মিশরের সীমান্ত পর্যন্ত বিস্তৃত প্রতিটি ইসলামিক রাষ্ট্রকে পরাজিত করার। এই সময়কেই ইলখানাতের সূচনা বলা যেতে পারে।

ইলখানাতের মধ্যপ্রাচ্য অভিযান

হালাকুর অভিযানের অনেকগুলি উদ্দেশ্য ছিল। যেমন– দক্ষিণ ইরানের লুরদের পরাধীন করা, হাশশাশিনদের নির্মূল করা, বাগদাদের আব্বাসীয় খিলাফতকে পরাজিত বা ধ্বংস করা, সাথে সিরিয়ার আয়ুবিদ রাষ্ট্র এবং মিশরের বাহরি মামলুক সুলতানি শাসনের অবসান ঘটানো। হিসেব করলে দেখা যায়, হুলেগুকে প্রায় গোটা সাম্রাজ্যের দশ ভাগের মধ্যে দুই ভাগ লড়াকু সেনা দেওয়া হয়েছিল এই অভিযানের জন্য। মোঙ্গলদের সেনা অভিযানের মধ্যে সম্ভবত এটাই সব থেকে বড় সেনা সমাবেশ ছিল। লুররা হালাকুর বাহিনীর কাছে সহজেই পরাজিত হয়। অন্য দিকে হাশশাশিনরা মোঙ্গলদের কুখ্যাতির ভয়ে বিনা লড়াইয়ে আত্মসমর্পণ করে।

আব্বাসীয় খলিফা বনাম ইলখানাত

এরপরে হালাকু ১২৫৭ সালের নভেম্বর মাসে আব্বাসীয় খলিফাকে পরাজিত করার লক্ষ্যে যাত্রা শুরু করেন। মোঙ্গলরা খলিফার আত্মসমর্পণ দাবি করে। খলিফা আত্মসমর্পণ করতে অস্বীকার করলে হুলেগু আব্বাসীয়দের রাজধানী বাগদাদ অবরোধ করেন। ১২৫৮ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে এই শহরের পতন হয় এবং মোঙ্গলরা গোটা শহর ধ্বংস করে তার বাসিন্দাদের হত্যা করে। ইসলামের ইতিহাসে সব থেকে বড় বিপর্যয়ের অধ্যায় হিসেবে আব্বাসীয় খলিফার এই পরাজয়কে বর্ণনা করা হয়। মোঙ্গল এবং তাদের খ্রিস্টান সাথীরা এরপর সিরিয়ায় আয়ুবিদদের পরাজিত করে।

হালাকুর প্রত্যাবর্তন

আব্বাসীয় খালিফা এবং আয়ুবিদ রাজবংশের পতনের পর, মধ্য প্রাচ্যে ইসলামিক ক্ষমতার কেন্দ্র বলতে টিকে ছিল মিশরের বাহরি মামলুকের সুলতানি শাসন। তাঁদের বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করার আগেই হুলেগুকে মোঙ্গলদের রাজধানী কারাকোরামে ফেরত যেতে হয়। ১২৫৯ সালে

মঙ্গকে খান মারা যান, এবং হালাকুকে ডেকে পাঠানো হয় পরবর্তী মহান খান নির্বাচনে অংশ নেওয়ার জন্য। অধিকাংশ মোঙ্গল সেনাই তাঁর সাথে ফিরে যায়। মাত্র ১০,০০০ সেনাকে সিরিয়ায় সেনা প্রধান কিতবুকার অধীনে রেখে দেওয়া হয়। হুলেগু মধ্য প্রাচ্য থেকে ফিরে যাওয়ার পর, মামলুকরা এই সুযোগের ব্যবহার করে এবং অবশিষ্ট মোঙ্গল সেনাকে আক্রমণ করে। ১২৬০ সালে আয়ন জলুতের যুদ্ধে মামলুকরা মোঙ্গলদের পরাজিত করে। ইতিহাসে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণ, কারণ এর পরেই মোঙ্গলদের মধ্য প্রাচ্যে বিস্তার বন্ধ হয়।

ইলখানাত বনাম গোল্ডেন হোর্ড

নতুন মহান খান নির্বাচনের পরে, হুলেগু মামলুকদের পাল্টা আক্রমণ করার পরিকল্পনা করতে থাকেন। ইতিমধ্যে গোল্ডেন হোর্ড ককেশাসে ইলখানাত শাসনের বিরুদ্ধে আক্রমণ করে বসে। গোল্ডেন হোর্ডের নেতা বার্ক ছিলেন একজন মুসলিম। তিনি আব্বাসীয় খলিফার অপমানের প্রতিশোধ নিতেই হালাকুর বিরুদ্ধে এই লড়াই শুরু করেন।

এর ফলে ইলখানাতরা মামলুকদের বিরুদ্ধে তাদের অভিযান বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়। পরিবর্তে গোল্ডেন হোর্ডের সাথে যুদ্ধে মনোনিবেশ করে। মঙ্গোলদের রাজত্বে ভাঙনের ফলে এমন আরও অনেক লড়াই শুরু হয়, যার ফলস্বরূপ ইলখানাত আর পশ্চিমে আধিপত্য বিস্তার করতে পারেনি।

ইলখানাত-এর ধর্ম পরিবর্তন

হালাকু ১২৬৫ সালে মারা যাওয়ার পর তাঁর পুত্র আবাকা খান শাসন ভার গ্রহণ করেন। ত্রয়োদশ শতাব্দীর শেষের দিকে ইলখানাতের শাসকরা ইসলাম গ্রহণ করেন। ইলখানাতের শেষ শাসক আবু সৈয়দ বাহাদুর খান কোনও বংশধর না রেখেই ১৩৩৫ খ্রিস্টাব্দে মারা যান। উত্তরাধিকারীর অভাবে এই খানাতের অবসান ঘটে। তাদের পদানত বিশাল এলাকা কয়েক খণ্ডে ভেঙে যায় এবং অন্যান্য শাসকরা সেখানে রাজত্ব শুরু করেন।