ইসমাইল জালায়ের, ইসলামী শিল্পের অন্যতম পথিকৃৎ

শিল্প ২৫ নভে. ২০২০ Contributor
ইসলামী শিল্প

ইসলামী শিল্প স্থাপত্য ও সংস্কৃতিতে ইরানের ভূমিকা অন্যতম ভাবেই অনস্বীকার্য। বিশেষ করে কাজার রাজবংশের (১৭৮৯ – ১৯২৫ সন) শাসনকালে ইরানের যে উন্নতিসাধন শুরু হয়েছিল তার ফলেই ইসলামী শিল্প ও সংস্কৃতির আমূল বিবর্তন শুরু হয়। এই বিবর্তনের ফলে ইসলামের শৈল্পিক বোধ আরও সূক্ষ্ম হয়ে ওঠে। কাজার বংশের শাসকরা শিল্প সংস্কৃতির পৃষ্ঠপোষক ও গুণগ্রাহী ছিলেন, তবে এঁদের মধ্যে এই বিষয়ে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ছিলেন সুলতান নাসের আল দীন শাহ। ১৮৪৮ সনে তিনি শাসনভার গ্রহণ করেন। তাঁর শাসনকাল পুরো উনবিংশ শতক জুড়ে ব্যপ্ত ছিল। তৎকালীন রাজত্বে ইসলামী শিল্প সংস্কৃতি অন্য মাত্রায় পৌঁছেছিল।

নাসের আল দীন শাহর সভায় নানা গুণবান মানুষের সমাহার ছিল। সুলতান তাঁদের রত্ন বলে অভিবাদিত করতেন। এরকমই এক রত্ন হলেন চিত্রকর ইসমাইল খান জালায়ের। নাসের আল দীনের চিত্রাঙ্কণ ও ক্যালিগ্রাফির প্রতি আগ্রহ ইসমাইল জালায়েরের কাছ থেকেই অর্জিত। তৎকালীন কাজার চিত্রাঙ্কণের দুটি স্বতন্ত্র ধারার সূচনা করেছিলেন ইসমাইল জালায়ের, প্রথমটিকে বলা হয় ইরান-ই-সাজ-ই, দ্বিতীয়টি তাবাই-আত-সাজ-ই নামে পরিচিত। তাঁকে বলা হয় উনবিংশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধের অন্যতম স্বপ্নদর্শী শিল্পী ও সংস্কৃতিমনস্ক মানুষ।

ইসমাইল জালায়েরের জীবনঃ

খোরাসানের হাজি মহম্মদ খান জালায়ের কালাতির পুত্র ইসমাইল জালায়ের শিশুবয়স থেকে শিল্প ও স্থাপত্যের প্রতি অত্যন্ত আগ্রহ বোধ করতেন। যে বয়সে শিশুরা দুরন্ত হয়ে ছোটাছুটি করে, সেই বয়সে ইসমাইল মাটি ও পাথর গুঁড়ো করে রং বানিয়ে তাই দিয়ে ছবি আঁকার চেষ্টা করতেন। এছাড়া নিজ পিতার মুখে কুরআন পাঠ শোনা ছিল তাঁর অত্যন্ত প্রিয় অবসরকালীন কাজ। পিতার মতো তিনিও সারাজীবন অত্যন্ত ধর্মপ্রাণ ভাবে ইসলাম ধর্ম পালন করেছেন। তাঁর ছবির মধ্যেও ধর্মপ্রাণ ভাবের গভীর ব্যঞ্জনা দেখা যায়।

ইসমাইল জালায়ের ব্যক্তিগত জীবনে অত্যন্ত রুচিশীল ও অভিজাত মানুষ ছিলেন। তাঁর ব্যবহার ছিল সুমধুর যে কারণে তিনি সুলতানের প্রিয়পাত্র ছিলেন। মজার কাহিনী, গল্প ও বুদ্ধিদীপ্ত বাক্যালাপে তাঁর জুড়ি মেলা ভার ছিল।

একই সঙ্গে অত্যন্ত ধর্মপ্রাণ হওয়ার কারণে তাঁর ব্যবহারে মার্জিত রুচিরও অভাব ছিল না। তিনিই বিশেষ ভাবে আকৃষ্ট ছিলেন সুফি ধর্মমতের প্রতি।

ইসমাইল জালায়ের প্রসিদ্ধ চিত্রাঙ্কণসমূহঃ

চিত্রকলার নানা দিকেই এই প্রসিদ্ধ চিত্রকরের অবাধ যাতায়াত ছিল। জলরং, কালি ও কলম দ্বারা অঙ্কণ, পোর্ট্রেট ও ল্যান্ডস্কেপ অঙ্কণে তিনি ছিলেন সিদ্ধহস্ত। এছাড়া কাঠের বাক্স ও পেঁটরার উপর নিপুণ হাতে নানা কারুকাজ করে দিতেন তিনি। আগেই বলা হয়েছে কাজার চিত্রকলা রীতির দুটি বিশেষ ধারার সূচনা হয় তাঁর হাত ধরেই।

ইরান-ই-সাজ-ই ঘরানায় মূলত ইয়রোপিয় প্রভাবের বাইরে বেরিয়ে মানুষের ছবি আঁকার প্রচলন শুরু হয়। আর তাবাই-আত-সাজ-ই ঘরানায় ইসলামী অঙ্কন পদ্ধতির সঙ্গে ইউরোপীয় পদ্ধতি মিলিয়ে প্রাকৃতিক ছবি আঁকার প্রচলন শুরু হয়।

তাঁর অঙ্কণের উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য ছিল, যদি কোণও কারণে ক্যানভাসের কাপড়ের গঠন তাঁর অপছন্দ হত, বা ছবির কোণও একটি জায়গার রঙ যদি তাঁর অপছন্দ হত তাহলে তিনি সঙ্গে- সঙ্গে ছবিটি নষ্ট করে ফেলতেন। এই জন্যই বর্তমানে তাঁর মাত্র কয়েকটি ছবি আমরা দেখতে পাই।

বিখ্যাত কীর্তি

তাঁর বিখ্যাত চিত্রেরর মধ্যে অন্যতম ছিল অভিজাত ও সুলতানের পোরট্রেট অঙ্কণ। সুলতান নাসের আল দীন শাহ, মিরজা হোসাইন খান সিপাহিসালার, আলি আসগর খাঁ প্রভৃতি বিখ্যাত ব্যক্তিত্বের ছবি তিনি যত্নের সঙ্গে এঁকেছেন।

এই প্রতিকৃতিতে তিনি মানুষটির বাহ্যিক রূপের সঙ্গে আভ্যন্তরীণ রূপও ফুটিয়ে তুলতেন।

সুলতান নাসেরের রাজকীয় প্রতিকৃতি ছাড়াও তিনি কালি দিয়ে অঙ্কিত একটি ঘোড়ায় আসীন ছবিও এঁকেছিলেন। যদিও বেশিরভাগ ছবিতে তিনি নিজের নাম সই করতেন না, কিন্তু প্রতিকৃতিগুলিতে তাঁর নাম সই করা দেখা যায়।

প্রতিকৃতি ছাড়াও ধর্মীয় বিষয় নিয়ে ছবি আঁকতে পছন্দ করতেন এই প্রসিদ্ধ চিত্রকর। সুফি সন্তদের ঘটনা, কুর আনে বর্ণিত ঘটনা তাঁর অত্যন্ত পছন্দের বিষয় ছিল।

তাঁর আঁকা ২২০*১২০ সেমি আয়তনের একটি চিত্র রয়েছে তেহরান মিউজিয়ামে, এই চিত্রের বিষয় বস্তু হল আব্রাম কর্তৃক তাঁর পুত্রসন্তানের বিসর্জন।

জালায়ের অন্যতম বিখ্যাত চিত্রশিল্পের নাম ‘সামোভারের চারপাশের রমণীগণ’ যা ১৮৬০ সালে অঙ্কিত। এছাড়াও ক্যালিগ্রাফিতে ইসমাইল জালায়ের অত্যন্ত নিপুণ ছিলেন।  ক্যালিগ্রাফির মাধ্যমে বিভিন্ন সরকারি দালান ও মসজিদে তিনি আল্লাহর বাণী লিখে রাখতেন। কথিত আছে, তাঁর কাব্যচর্চার শখ ছিল। তাঁর অঙ্কিত বেশিরভাগ ক্যালিগ্রাফিই আল্লাহর প্রতি তাঁর হৃদয়ের ভাবের প্রকাশ।

কাজার শিল্পরীতির উন্নতিসাধনের জন্য ইসলামী শিল্প সংস্কৃতি তাঁর কাছে অত্যন্ত কৃতজ্ঞ।