ইসরা ও মিরাজের যাত্রা: এক রাতের সুদীর্ঘ সফর

আকীদাহ ২৫ ফেব্রু. ২০২১ Contributor
ফোকাস
ইসরা ও মিরাজের
© Ilkin Guliyev | Dreamstime.com

“পরম পবিত্র ও মহিমাময় ঐ সত্তা, যিনি তাঁর বান্দাকে রাতে ভ্রমণ করিয়েছেন মসজিদে হারাম থেকে মসজিদে আকসা পর্যন্ত। যার চারদিকে আমি পর্যাপ্ত বরকত দান করেছি। যাতে আমি তাকে কুদরতের কিছু নিদর্শন দেখিয়ে দিই। নিশ্চয়ই তিনি পরম শ্রবণকারী ও দর্শনশীল।” (আল কুরআন-১৭:১)

‘ইসরা’ অর্থ রাতে ভ্রমণ করানো। আর ‘মিরাজ’ অর্থ উর্দ্ধারোহন। আয়াতে মসজিদে হারাম থেকে মসজিদে আকসা পর্যন্ত সফরকে ইসরা বলা হয়েছে। আর সেখান থেকে আসমান পর্যন্ত যে সফর, তাকেই মিরাজ বলা হয়। এ আয়াতে ‘ইসরা’-এর বিষয়টি উল্লেখিত হয়েছে। আর ‘মিরাজ’-এর বিষয়টি সুরা নজম এবং সহিহ হাদিস দ্বারা প্রমাণিত।

মিরাজ আত্মিক নয়, স্বশরীরেই হয়েছিল

ইসরা ও মিরাজের সফর আত্মিক ছিল না; বরং সাধারণ মানুষের সফরের মত স্বশরীরেই হয়েছিল। এ কথাটি কুরআন-সুন্নাহ দ্বারা প্রমাণিত। আলোচ্য আয়াতের প্রথমে ‘সুবহানা’ শব্দটি এদিকেই ইঙ্গিত করে। কেননা এ শব্দটি আশ্চর্যজনক ও বিরাট বিষয়ের জন্য ব্যবহৃত হয়। মিরাজ যদি শুধু আত্মিক, অর্থাৎ স্বপ্নজগতে সংঘটিত হত, তবে তাতে আশ্চর্যের কী আছে? স্বপ্নে তো প্রত্যেক মানুষই অবিশ্বাস্য অনেক কিছু দেখতে পারে।

‘আবদ’ শব্দটির দ্বারাও এদিকেই ইঙ্গিত করা হয়েছে। কারণ শুধু আত্মাকে ‘আবদ’ বলে না; বরং আত্মা ও দেহ উভয়ের সমষ্টিকেই ‘আবদ’ বা বান্দা বলা হয়। এ ছাড়া রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম যখন মিরাজের ঘটনা হজরত উম্মে হানী(রাযিঃ)-এর কাছে বর্ণনা করেছিলেন, তখন উম্মে হানী(রাযিঃ) তাঁকে পরামর্শ দিয়েছিলেন যেন এ কথাটই সকলের সামনে প্রকাশ না করেন। কারণ এতে কাফেররা তাঁর প্রতি মিথ্যারোপ করবে। ব্যাপারটি যদি নিছক স্বপ্নই হত, তবে কাফেরদের মিথ্যারোপ করার কি কারণ ছিল?

এরপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম যখন ঘটনা প্রকাশ করলেন, তখন কাফেররা মিথ্যারোপ করল এবং ঠাট্টা-বিদ্রূপ করল। এমনকি কত নও-মুসলিম এ সংবাদ শুনে ধর্মত্যাগ পর্যন্ত করল। ব্যাপারটি যদি নিছক স্বপ্নের হত তাহলে এত সব তুলকালাম কাণ্ড ঘটার সম্ভাবনা ছিল কি? তবে এ ঘটনার আগে বা পরে স্বপ্নের আকারে কোনো আত্মিক মিরাজ হয়ে থাকলে তা এর পরিপন্থী নয়।

ইসরা ও মিরাজ সম্পর্কে সকল মুসলমানের ঐকমত্য রয়েছে। শুধু ধর্মদ্রোহী যিন্দীকরা একে মানেনি।

ইসরা ও মিরাজের সংক্ষিপ্ত ঘটনা

অর্থাৎ, নবী করিম সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম ইসরা ও মিরাজের সফর জাগ্রত অবস্থায় করেছেন, স্বপ্নে নয়। মক্কা থেকে বায়তুল মুকাদ্দাস পর্যন্ত এ সফর বোরাকযোগে করেন। বায়তুল মুকাদ্দাসের দরজায় উপনীত হয়ে তিনি বোরাকটি কিছুটা দূরে বেঁধে রাখেন এবং বায়তুল মুকাদ্দাসের মসজিদে প্রবেশ করে দুই রাকাত সালাত আদায় করেন।

এরপর সিঁড়ির সাহায্যে প্রথম আসমান, তারপর অন্যান্য আসমানে যান। ঐ সিঁড়িটির স্বরূপ সম্পর্কে আল্লাহই ভালো জানেন। যাইহোক, প্রতিটি আসমানে সেখানকার ফেরেশতারা তাঁকে অভ্যর্থনা জানান এবং ষষ্ঠ আকাশে মুসা(আঃ) ও সপ্তম আকাশে ইবরাহিম (আঃ)-এর তাঁর সঙ্গে সাক্ষাত হয়। এরপর তিনি পয়গাম্বরগণের স্থানগুলোও অতিক্রম করে যান এবং এক ময়দানে পৌঁছেন, সেখানে তাকদীর লেখার শব্দ শোনা যাচ্ছিল।

এরপর তিনি সিদরাতুল মুনতাহা দেখেন। সেখানে আল্লাহর নির্দেশে নানা রঙের স্বর্ণের প্রজাপতি ছোটাছুটি করছিল। ফেরেশতারা স্থানটিকে ঘিরে রেখেছিল। সেখানেই তিনি একটি দিগন্তবেষ্টিত সবুজ রঙের পালকির ন্যায় ‘রফরফ’ ও বায়তুল মামুর দেখেন। বায়তুল মামুরের কাছেই কাবার প্রতিষ্ঠাতা ইবরাহিম(আঃ) প্রাচীরের সঙ্গে হেলান দিয়ে বসা ছিলেন। এই বায়তুল মামুরে দৈনিক ৭০ হাজার ফেরেশতা প্রবেশ করেন। কিয়ামত পর্যন্ত সেখানে আবার প্রবেশ করার সুযোগ তাঁদের আর আসবে না।

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম স্বচক্ষে জান্নাত ও জাহান্নাম দেখেন। সে সময় তাঁর উম্মতের জন্য প্রথমে ৫০ ওয়াক্তের সালাত ফরজ হওয়ার নির্দেশ হয়। এরপর তা কমিয়ে পাঁচ ওয়াক্ত করে দেওয়া হয়। এর দ্বারা সব ইবাদতের মধ্যে সালাতের বিশেষ গুরুত্ব ও শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণিত হয়। এরপর তিনি বায়তুল মুকাদ্দাসে ফিরে আসেন এবং বিভিন্ন আকাশে যেসব পয়গাম্বরের সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়েছিল তাঁরাও তাঁর সঙ্গে বায়তুল মুকাদ্দাসে নামেন। তাঁরা এখান থেকেই বিদায় নেন এবং রাসুল সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম বোরাকে সওয়ার হয়ে অন্ধকার থাকতেই মক্কায় পৌঁছে যান।

ইসরা ও মিরাজের যাত্রা সম্পর্কে মক্কার লোকদের প্রতিক্রিয়া

মিরাজের এই যাত্রা সাধারণ মানুষের মধ্যে উত্তেজনার সৃষ্টি করে এবং সন্দেহপ্রবণরা রাসূল সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম-এর প্রতি বিভিন্ন প্রশ্ন ছুড়ে দেয়। মক্কার কাফেররা মুসলমানদের বিরুদ্ধে উত্তেজনা উস্কে দিতে একে একটি সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করে নেয়।

তারা রাসূল সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম কে জেরুসালেমের মসজিদুল আকসা বা বায়তুল মুকাদ্দাস মসজিদের বিবরণ জিজ্ঞেস করা শুরু করল, যেখানে তিনি এর পূর্বে কখনোই যাননি। কিন্তু সকলকে বিস্মিত করে রাসূল সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম তাদের সকল প্রশ্নের যথার্থ জবাব দিলেন। কিন্তু এতেও তাদের ইসলামের বিরুদ্ধে বিদ্বেষের কোনোরূপ পরিবর্তন হয়নি এবং তারা অবিশ্বাস ছাড়া আর কোনো কিছুই গ্রহণ করতে পারেনি।

আবু বকর(রাযিঃ)-এর অটল বিশ্বাস 

মুমিন মুসলমানরা মিরাজের এই যাত্রাকে অবিশ্বাস্য হিসেবে কখনও চিন্তা করেননি। যে মহাশক্তিধর আল্লাহ এই বিশাল আসমান ও জমিন সৃষ্টি করেছেন, তিনি তাঁর রাসূলকে উর্ধ্বাকাশে বিভিন্ন নিদর্শন দেখিয়ে আনতে পারার মত যথার্থ সক্ষমতা রাখেন, এ বিশ্বাস তো সকল মুসলমানেরই আছে।

বিশ্বাসের এই বিষয়টিতে সবচেয়ে দৃঢ়তা দেখা যায়, আবু বকর(রাযিঃ)-এর ভাষ্যে। তিনি মুশরিকদের অবিশ্বাসের জবাবে বলেছিলেন,

“হ্যা, এ আমি ঘটনার সত্যতার সাক্ষ্য দিচ্ছি।”

এই ঘটনার প্রেক্ষিতেই আবু বকর(রাযিঃ) এর উপাধি হয় ‘আস-সিদ্দিক’ বা ‘সত্যের সাক্ষ্যদাতা’।