ইসলামিক দৃষ্টিকোণ থেকে বাচ্চা হওয়ার পূর্বে অর্থ সঞ্চয়ের গুরুত্ব

dreamstime_s_147837592
to 147837592 © Andrey Popov | Dreamstime.com

ইসলামে সম্পদ খরচের ক্ষেত্রে কৃপণ হওয়া যেমন নিষিদ্ধ, তেমনি প্রাচুর্যের সময় অপচয় করে সম্পদ নষ্ট করাও নিষিদ্ধ। পবিত্র কুরআনে অপচয় ত্যাগের কঠোর নির্দেশ দিয়ে আল্লাহ বলেন, “তোমরা পানাহার করো, কিন্তু অপচয় করো না; নিশ্চয় আল্লাহ অপচয়কারীদেরকে ভালোবাসেন না।” (আল কুরআন-৭:৩২)

অপচয় এবং কৃপণতা দুইটিকেই ইসলামে অনুমোদন দেওয়া হয় না। এই দুই প্রান্তিকতার মধ্যখানে মধ্যমপন্থা হিসেবে মিতব্যয়ী হয়ে ভবিষ্যতের জন্য কিছু অর্থ সঞ্চয় করে রাখা ইসলামের শিক্ষা। যারা অপচয় এবং কৃপণতার পথ পরিহার করে মিতব্যয়িতার পথ অবলম্বন করবে আল্লাহ তাদেরকে নিজের বান্দা হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

এ প্রসঙ্গে আল্লাহ বলেন, “রহমানের বান্দা তো তারাই যারা অপব্যায়ও করে না আবার কৃপণতাও করে না। তাদের পন্থা হয় এতদুভয়ের মধ্যবর্তী।” (আল কুরআন-২৫:৬৭)

তবে এক্ষেত্রে মনে রাখতে হবে, সঞ্চয় করতে গিয়ে কৃপণের তালিকায় যেন নাম না উঠে।

কেন করব আমরা সঞ্চয়?

আমাদের সমাজে এ সম্পর্কে অনেক ভুল ধারণা প্রচলিত আছে। যে ব্যক্তি হালাল-হারাম, প্রয়োজন-অপ্রয়োজন বিবেচনা করে খরচ করেন এবং অপব্যয়, অপচয় থেকে বিরত থাকেন তাকে অনেকসময় কৃপণ মনে করা হয়। মুলত স্ত্রী, সন্তান-সন্ততির ভরণপোষণ, পিতামাতার প্রয়োজনীয় চাহিদা পূরণের মতো আল্লাহ নির্দেশিত খাতে খরচ করতে অবহেলাই হলো- প্রকৃত কৃপণতা। অনেকে সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও পরিবারের প্রয়োজনীয় খরচটুকু করে না, অভাবগ্রস্থকে কিছু দান করে না; জরুরী দ্বীনি কাজে অর্থ ব্যয় করে না তাকেও কৃপণ বলা হয়।

বস্তুত হালাল-হারামের বিধিনিষেধ মেনে খরচকে সীমাবদ্ধ করতে হবে। প্রাচুর্যের সময় খরচের উৎসবে মেতে না উঠে অপ্রয়োজনীয় কিংবা হারাম খরচ বাদ দিয়ে মিতব্যয়িতার পথ অবলম্বন করে উদ্ধৃত অর্থ ভবিষ্যতের জন্য সঞ্চয় করতে হবে। যেন পরে নিজের প্রয়োজনে অন্যের কাছে হাত পাতার মতো পরিস্থিতির মুখোমুখি না হতে হয়।

আল্লাহ বলেন, “তুমি কৃপণতার বশবর্তী হয়ে নিজের হাত ঘাড়ের সঙ্গে বেঁধে রেখে একেবারে ব্যয়-কুণ্ঠ হয়ো না। আবার অপব্যায়ী হয়ে একোবরে মুক্তহস্তও হয়ো না, তাহলে তুমি তিরস্কৃত ও নিঃস্ব হয়ে বসে থাকবে।” ((আল কুরআন-১৭:২৯)

কতটা সঞ্চয়ের নির্দেশ রয়েছে?

অপব্যায় না করে নিজের সন্তানদের জন্য এবং অনাগত সন্তানদের জন্যও সঞ্চয় করা ইসলামের শিক্ষা। সন্তানদেরকে কারও মুখাপেক্ষী রেখে যাওয়া বা পরবর্তীতে সন্তান জন্ম নিলে কারও নিকট হাত পাতা ইসলামের শিক্ষা নয়। এটা নবীজি সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লামও কখনও পছন্দ করেননি। নবীজি সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “তুমি তোমার উত্তরাধিকারীদেরকে মানুষের করুণার মুখাপেক্ষী রেখে যাওয়ার চেয়ে তাদেরকে সচ্ছল রেখে যাওয়াটাই অধিক উত্তম।”

ইসলাম সঞ্চয়কে কতটুকু গুরুত্ব দিয়েছে তা আরও স্পষ্ট হয় নবীজির আরেকটি হাদিস থেকে। তিনি বলেছেন, “উত্তম দান তাই, যা নিজ অভাবমুক্ততা রক্ষার সঙ্গে হয়।”

সুতরাং, নিজের প্রয়োজন ও পরিবারের প্রয়োজনে মানুষ যে খরচ করে তা ইসলামে শতভাগ অনুমোদিত এবং এটিতে বিরাট সওয়াবও রয়েছে। বরং, যদি কোনো ব্যক্তি যদি এই দায়িত্ব পালনে অবিহেলা করে তবে সে নিজের উপর অর্পিত ফরজ দায়িত্ব অবহেলার দায়ে আল্লাহর নিকট গুনাহগার সাব্যস্ত হবে এবং এজন্য আখিরাতে তাকে কঠোর জবাবদিহিতারও মুখোমুখি হতে হবে।

অর্থ উপার্জন এবং নিজ পরিবারের জন্য সেই অর্থ খরচ করা ইসলামের দৃষ্টিতে একটি বড় নেক আমল। পরিবারের সদস্য সংখ্যা যখন বেশি হয় তখন অর্থ খরচ করার পরিমাণটাও বৃদ্ধি পায়; কিন্তু অনেকক্ষেত্রে উপার্জন তাৎক্ষণিকভাবে বৃদ্ধি পায় না। এজন্য পরিবারের সদস্য সংখ্যা যখন কম থাকে তখন থেকেই যদি অর্থ সঞ্চয়ের মনোভাব গঠন করা যায় তবে তা পরবর্তীতে অনেক ফলপ্রসূ হয়।

অনাগত শিশুর বিভিন্ন খরচ সম্পর্কে ওয়াকিবহাল থাকা

তাই যদি আপনি চান নিজের পরিবারকে উত্তমরূপে ভরণপোষণ করবেন তবে এক্ষেত্রে সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ হবে নিজের অনাগত শিশুটির জন্য এখন থেকেই কিছু অর্থ জমানো শুরু করুন। কারণ, নতুন শিশুর জন্ম হলে চারিদিক থেকে আপনার কাধে অনেক খরচের বোঝা চাপবে। তার খাবারের বন্দোবস্ত, তার পোশাকের বন্দোবস্ত, তার আকিকার জন্য পশু ক্রয় করা ইত্যাদি অনেক খরচ তখন আপনার সামনে দেখা দিবে।

আর আপনি যদি চান এই বোঝাকে পূর্ব পরিকল্পনার মাধ্যমে হালকা করতে তবে এখন থেকেই পদক্ষেপ নিন। এছাড়াও শিশু যখন বড় হবে তখন তার শিক্ষার জন্যও আপনাকে অনেক খরচ করতে হবে। তাই আজই পরিকল্পনা মাফিক অর্থ সঞ্চয় শুরু করুন। আর মনে রাখুন আপনার নেক নিয়তের কারণে অর্থাৎ, সন্তানকে উত্তমরূপে ভরণপোষণের জন্য আপনি যে সঞ্চয় শুরু করছেন তার জন্যও আপনি সওয়াবের ভাগিদার হবেন।