ইসলামিক ফিন্যান্স: ব্যবসার এক অনন্য পদ্ধতি

Islamic Finance, Kewangan Islam
3D illustration of a magnifier over the text Islamic finance written with golden letter. Black background.

এই নিবন্ধটির উদ্দেশ্য হল ইসলামিক ফিন্যান্সের সাথে পাঠককে পরিচিত করানো এবং প্রচলিত অর্থব্যবস্থার সাথে এর তুলনা করা।

এই তুলনাটি মধ্য প্রাচ্য এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় প্রচলিত ইসলামিক ফিন্যান্সের অনুশীলনের ভিত্তিতে তাত্ত্বিক ও অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞানের ভিত্তিতে করা হবে।

শিরোনাম থেকে এই কথাটি পরিষ্কার যে, এই নিবন্ধে আলোচনা করা হয়েছে ইসলামিক ফিন্যান্স মূলত সমাজে প্রচলিত যথারীতি সুস্থপ্রকৃতির ব্যবসারই একটি ধরণ। কারণ আর্থিক লেনদেনের ক্ষেত্রে ইসলামিক আইন যে কতটা প্রয়োজনীয় তা মানব যুক্তি দ্বারা সমর্থিত ও বিকশিত এবং ইসলামিক পদ্ধতিতে লেনদেন এমন পদ্ধতিতে আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারিত হয়েছে যে, তা মানব রুচির সাথে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ।

ইসলামিক ফিন্যান্স কেন প্রয়োজনীয়

ইসলামের একটি অনন্য বৈশিষ্ট্য হল মানব রুচির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ বিধান মানুষের উপর আরোপ করে যাতে সকল মানুষই সহজভাবে তা গ্রহণ ও পালন করতে পারে। ইসলামের এই অনন্য বৈশিষ্ট্যের একটি সহজ উদাহরণ হল মুসলমানদের আর্থিক লেনদেন ও অর্থনীতির ক্ষেত্রে ইসলামিক ফিন্যান্সের সূত্রপাত।

আজ সমগ্র বিশ্বের মানুষের কাছে চাই সে মুসলিম হোক বা অমুসলিম হোক এই কথাটি বিনাদ্বিধায় স্বীকৃত যে, ইসলাম শুধুমাত্র বিশ্বাস স্থাপনের নামই নয়; বরং নিজের জীবনে পরিপূর্নভাবে আল্লাহর সব হুকুমকে বাস্তবায়ন করার নাম। আর ইসলামে যে জীবনের সকল ক্ষেত্রের দিকনির্দেশনার পাশাপাশি অর্থনীতির ক্ষেত্রেও পরিপূর্ণ দিকনির্দেশনা রয়েছে তাও আজ সর্বজনস্বীকৃত।

ইসলামের সামগ্রিকতাকে এই কয়েকটি বিষয়ের মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলা সম্ভবঃ

– তাওহীদ বা আল্লাহর একত্ববাদ;

– কিয়ামতের দিন সকল পুরুষ ও মহিলার তাদের কর্মের ব্যাপারে সমানভাবে জবাবদিহিতা;

– রাসূল সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লামের অনুসরণের মাধ্যমে দুনিয়া ও আখিরাতে হেদায়াতের সন্ধান পাওয়া এবং

– দুনিয়াতে আল্লাহর প্রতিনিধি হিসেবে কর্মসম্পাদন করা, যার মাধ্যমে মানুষের নিজের ও তার পারিপার্শিক সকলের মঙ্গলের জন্য সকল পদক্ষেপ নেওয়া হয়।

সুতরাং, প্রতিটি মুসলমানের জন্যই ইসলাম হল সামগ্রিক একটি জীবনব্যবস্থা যেটি তার রবের পক্ষ থেকে তার উপর আরপিত। শুধুমাত্র কিছু আচার অনুষ্ঠান পালন করার নামই ইসলাম নয়।

সুতরাং, ইসলামিক ফিন্যান্সের প্রয়োজনীয়তা একজন মুসলিমের নিজের চাহিদার উপর ভিত্তি করেই গড়ে ওঠে যাতে সে আর্থিক ক্ষেত্রে এমন সুযোগ সুবিধা পায় যা তার চাহিদার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয় এবং যার মাধ্যমে আর্থিকভাবেও লাভবান হওয়া যায়।

শরীয়াহ কেন?

আর এ অনুসারেই, কুরআন থেকে প্রাপ্ত ইসলামী জীবন পদ্ধতি এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লামের শিক্ষা থেকে প্রাপ্ত ইসলামী জীবন পদ্ধতি থেকে একটি নিয়মনীতির উদ্ভব ঘটে- যাকে শরীয়াহ বলা হয়।

শরীয়াহ শব্দের অর্থ হল রাস্তা বা পথ; যার সাধারণ লক্ষ হল মানবজাতির ৫টি মৌলিক প্রয়োজন তথা জীবন, মন বা যুক্তি, ধর্ম, সহায়-সম্পত্তি এবং ভবিষ্যত প্রজন্মের সংরক্ষণ এগুলির সংরক্ষণ করা এবং প্রচার করা।

সম্পত্তির ক্ষেত্রে শরীয়াহর লক্ষ্য হল কোনো মানুষের ব্যক্তিগত সম্পত্তি এবং একইভাবে জনগনের সমষ্টিগত সম্পত্তি সংরক্ষণ করা এবং এগুলি কিভাবে যথোপযুক্ত উপায়ে ব্যবহৃত হতে পারে তা নিশ্চিত করা। সুতরাং, ইসলামিক অর্থব্যবস্থা দুটি বিষয়ের সমন্বয়। তথা ব্যক্তিগত সম্পত্তি সংরক্ষণ ও জনসম্পদের সম্পত্তি সংরক্ষণ।

ইসলামী অর্থনীতির মূল স্তম্ভ

ইসলামী অর্থনীতি ও আর্থিক ব্যবস্থার চারটি মূল স্তম্ভ হলঃ অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে স্বাধীনতা, অন্য কোনো ব্যক্তি বা সরকার কর্তৃক অযাচিত আগ্রাসন থেকে সুরক্ষা, মালিক ও শ্রমিকের দায়িত্ব ও অধিকারের মধ্যে ভারসাম্য বিধান এবং ধনীদের বাড়তি ধনসম্পদে দরিদ্রদের অধিকার নিশ্চিত করা, যাকে আমরা যাকাত বলে থাকি।

এই সর্বশেষ স্তম্ভটির মাধ্যমে সমাজে ধনী ও দরিদ্রদের মধ্যে সামঞ্জস্য বিধান করা হয় এবং একে যাকাত বলা হয়; যেটি নেসাব পরিমাণ সম্পত্তির মালিক সকল ধনীর উপরই আরোপিত হয়। এছাড়াও ধনীরা নফল সদকা প্রদানের মাধ্যমে দরিদ্রদের অবস্থার পরিবর্তনে ভূমিকা রাখতে পারে।

এই নিবন্ধে আমরা এটা বোঝাতে চেয়েছি যে, ইসলাম বর্তমান সমাজে প্রচলিত ভোগবাদী অর্থনীতি থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। কারণ, ইসলামী অর্থনীতি ব্যবস্থায় ধনী ও দরিদ্র শ্রেণির মাঝে ভারসাম্যপূর্ণ আর্থিক সম্পর্ক সৃষ্টি হয় যা মানবরচিত কোনো আর্থিক ব্যবস্থাতেই সম্ভব নয়।