ইসলামিক ব্যাংকিং ব্যবস্থা যেভাবে চ্যালেঞ্জের মোকাবেলা করে

ব্যবসা Contributor
মতামত
ব্যাংকিং ব্যবস্থা
Photo: Dreamstime

প্রচলিত ব্যাংকিং ব্যবস্থায় সঞ্চয়কারী, ব্যাংকার ও ঋণ গ্রহীতার সম্পর্ক দাতা ও গ্রহীতার ন্যায়। এ ব্যবস্থায় ঋণ গ্রহীতার ব্যবসায়িক লাভ-ক্ষতি যাই হোক, সুদের হার পূর্বনির্ধারিত। ক্ষতি হলেও তাকে এই সুদের বোঝা বহন করতে হয়। ব্যাংকে অর্থ সঞ্চয়কারীর সুদের হারও পূর্বনির্ধারিত। ব্যাংকের লাভ লোকসানের সঙ্গেওসঞ্চয়কারীর লাভ-ক্ষতির কোনো সম্পর্ক নেই।

তবে এর বিপরীতে ইসলামী ব্যাংক ব্যবস্থায় সঞ্চয়কারী ও ব্যাংকের লাভ-ক্ষতি পরস্পর সম্পর্কযুক্ত। এজন্য ইসলামী ব্যাংককে অনেক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় ইসলামী ব্যাংক তার লক্ষ্য অর্জনে স্বতন্ত্র নীতি ও কর্মধারা অনুসরণ করে।

ইসলামিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার কিছু বৈশিষ্ট্য

ইসলামিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো শুধুমাত্র ব্যক্তিস্বার্থ নয়; বরং সমষ্টিগত কল্যাণ ও সামাজিক কল্যাণ এরসকল কার্যক্রমের মূল কথা। সম্পদের উৎপাদন বৃদ্ধি বা আয়ের উৎসের সৃষ্টিই শুধু নয়, বরং সম্পদের সুষম বণ্টন নিশ্চিত করা ইসলামী ব্যাংকিং ব্যবস্থারএকটি গুরুত্বপূর্ণ মূলনীতি। এই উদ্দেশ্যে দরিদ্র, স্বল্পবিত্ত বা বিত্তহীনদের জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণে বিনিয়োগের ব্যবস্থা করা এবং পর্যায়ক্রমে তাদের অবস্থার উন্নয়ন ইসলামী ব্যাংকিং ব্যবস্থার বৈশিষ্ট্য।মূল্যবোধ সমন্বিত, বহুমুখী ও গতিশীল উন্নয়ন এ ব্যবস্থার আদর্শ। এ সমন্বিত উন্নয়ন লক্ষ্য অর্জনের মাধ্যমে একটি ভারসাম্যপূর্ণ সমাজ নির্মাণইইসলামিকব্যাংকিং ব্যবস্থার লক্ষ্য।

সামাজিক উন্নয়নই অর্থনৈতিক উন্নয়নের মূল ভিত্তি। তাই ইসলামিক ব্যাংকিং অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নের দুই ধারাকে সমন্বিত করে।

ইসলামিক অর্থ ব্যবস্থার নৈতিক বিধানের সারসংক্ষেপ হলো-

১) সকল সম্পদের নিরঙ্কুশ মালিক আল্লাহ। মানুষ বাহক হিসেবে আল্লাহর আদেশ ও নিষেধ মেনে সে সম্পদ অর্জন ও খরচ করবে।

২) মানুষ সম্পদ ব্যবহার করবে ইহকালীন ও পরকালীনকল্যাণ আহরণের জন্য।

৩) অর্থনৈতিক কার্যক্রমে মানুষন্যায়বিচার ও দয়ার অনুশীলন করবে।

৪) তারা কল্যাণমূলক কার্যক্রমের ব্যবস্থা করবে। সমাজকে সকল অকল্যাণমূলক কার্যক্রম ও কষ্ট-যাতনা থেকে মুক্ত করবে। এভাবে মানুষের জীবন ভারমুক্ত ও সহজ করবে।

বিনিয়োগে অংশীদারিত্বের নীতি

এই নীতি অনুসারে, লাভ-ক্ষতি অনুযায়ী অংশীদারি পদ্ধতিতেব্যবসার মাধ্যমে ব্যাংক ও গ্রাহক উভয়ই লাভ-ক্ষতিতে নির্দিষ্ট হারে অংশ নেয়। এ ধরনের কারবারে ব্যাংক ও গ্রাহকের সাফল্য বা ব্যর্থতা এক সুতোয় গাঁথা। ফলে গ্রাহক ও ব্যাংকের মধ্যে একাত্মতা সৃষ্টি হয়। এটি ইসলামী ব্যাংকিং ব্যবস্থার একটি উজ্জ্বল বৈশিষ্ট্য।

ইসলামী ব্যাংকিং ব্যবস্থায় টাকার লগ্নি হয় না। পণ্যের কেনা-বেচা কিংবা ইজারা পদ্ধতিতে এসব বিনিয়োগ পরিচালিত হয়। পণ্য ক্রয়-বিক্রয় কিংবা দ্রব্যের ভাড়ার মাধ্যমে অর্জিত অর্থ ব্যবসায়িক লাভরূপে গণ্য করা হয়।

মুদ্রাস্ফীতি দূরীকরণ

সুদভিত্তিক অর্থ ব্যবস্থায় পণ্যের সঙ্গে টাকার প্রত্যক্ষ কোনো সম্পর্ক থাকে না। এ কারণে সেখানে প্রকৃত অর্থনৈতিক কার্যক্রম ছাড়াই নির্দিষ্ট হারে মুদ্রার প্রবৃদ্ধি ঘটে। এর ফলে মুদ্রার সামগ্রিক সোপান এবং বাজারে অর্থের সরবরাহ বেড়ে যায়। এর ফলে সৃষ্ট মুদ্রাস্ফীতি আধুনিক অর্থনীতির অন্যতম একটি প্রধান সমস্যা। এর ফলে সামাজিক সুবিচার ও অর্থনৈতিক শৃঙ্খলা বিঘ্নিত হয়। এর বিপরীতে ইসলামী ব্যাংকিং ব্যবস্থার পণ্যভিত্তিক বিনিয়োগ কার্যক্রম মুদ্রাস্ফীতির কারণ দূর করে।

এছাড়া সুদভিত্তিক ব্যাংকিং ব্যবস্থায় ঋণ গ্রহীতার ব্যবসায়িক লাভ-ক্ষতি যাই হোক না সুদের হার পূর্ব থেকেই নির্ধারিত থাকে। সঞ্চয়কারীর সুদের হারও পূর্বনির্ধারিত থাকে। যে কারণে ব্যাংকের লাভ-ক্ষতির সঙ্গে গ্রাহকের লাভ-ক্ষতির কোনো সম্পর্ক নেই। সব পক্ষ থেকেই পূর্বনির্ধারিত সুদ গ্রহণ বা প্রদান করার কারণে তাদের মাঝে পারস্পরিক দায়বোধ গড়ে ওঠার কোনো সুযোগ এখানে নেই।এর বিপরীতে ইসলামী ব্যাংক ব্যবস্থায় সঞ্চয়কারী ও ব্যাংকের লাভ-ক্ষতি পরস্পর সম্পর্কযুক্ত। সঞ্চয়কারী, ব্যাংকার ও বিনিয়োগ গ্রহীতা পরস্পর বন্ধনে আবদ্ধ।

ইসলামী শরিয়াহর নীতি অনুসরণ

ইসলামী ব্যাংকিং ব্যবস্থায়অর্থ জমা, গ্রহণ ও বিনিয়োগ কার্যক্রমসহ সকল কাজেই শরিয়াহ নীতি অনুসরণ করা হয়। সুদকে উচ্ছেদ করে আর্থিক ক্ষেত্রে প্রকৃত পণ্যভিত্তিক ব্যবসায়ের প্রচলন ইসলামী ব্যাংকের অন্যতম মূলনীতি। আর্থিকভাবে লাভজনক কোনো ব্যবসা সামাজিক বিবেচনায় অকল্যাণকর হলে ইসলামী ব্যাংক তাতে কোনো অংশ নেয় না। ইসলামী ব্যাংকের কার্যক্রম শরিয়াহর বিধান অনুযায়ী পরিচালিত হচ্ছে কিনা তা তদারক করেন সম্পূর্ণ স্বাধীন শরিয়া কর্তৃপক্ষ। শরিয়া সুপারভাইজারি কমিটি ব্যাংকের কার্যক্রমে ইসলামী শরিয়া সংক্রান্ত যথার্থতা তদারক করে এবং নিয়মিত পরামর্শ ও নির্দেশনা দেন। এছাড়া কোথাও কোনো ভুল হলে তা শুধরিয়ে দেন।

এভাবে বাস্তব সম্মত বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করে ইসলামিক ব্যাংকিং ব্যবস্থা সমাজ থেকে সুদকে উচ্ছেদ করে সম্পদের সুষম বন্টন নিশ্চিত করে। তাই এই ব্যবস্থাকে আরও সুসংহত করতে এই ব্যবস্থায়আর্থিকলেনদেন ও বিনিয়োগের মাধ্যমে আমাদেরকেই এগিয়ে আসতে হবে।