ইসলামী খেলাফাতের এককালীন প্রাণকেন্দ্র মসজিদে নববী

মসজিদে নববী মুসলমানদের কাছে খুব গুরুত্বপূর্ণ। আল্লাহতায়ালার অসংখ্য পবিত্র নিদর্শন রাজির মধ্যে পবিত্র কাবা শরিফের পরেই গুরুত্বপূর্ণ ও পবিত্র নিদর্শন পবিত্র মসজিদে নববী (সা.)। মহিমান্বিত এ মসজিদে নববী অর্থ নবীজির মসজিদ। এই মসজিদটিই হচ্ছে পৃথিবীর সর্বোত্তম ও পবিত্র স্থানের মধ্যে দ্বিতীয়। যেথায় মহব্বত সহকারে এক রাকাত নামাজ পড়লে ৫০ হাজার রাকাত কবুল হওয়া নামাজের সওয়াব পাওয়া যায়। এ মসজিদের গুরুত্ব ও মর্যাদা নিয়ে কোরআন-হাদিসের অসংখ্য নির্দেশনা রয়েছে। যেটি সৌদি আরবের মদিনায়ে মুুনাওয়্যারায় অবস্থিত। এই মসজিদের অভ্যন্তরে দক্ষিণে অবস্থিত হযরত (সা.)-এর নূরানী রওযায়ে আক্দাস শরিফ। যা পবিত্র খানায়ে কা’বার পর পৃথিবীর সর্বোত্তম স্থান হিসেবে স্বীকৃত।

বর্তমানে মুসলমানদের কাছে পবিত্র কাবার পর মসজিদে নববীকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে গণ্য করা হয়। হাজীরা সবাই পরিদর্শন করেন এ মসজিদ। কারণ এ মসজিদের মধ্যে রয়েছে হজরত মুহাম্মদ সা:-এর রওজা মোবারক। মক্কা থেকে হিযরতের পর জীবনের বাকি বছরগুলো মদিনাতেই কাটান তিনি।
তবে হজরত মুহাম্মদ সা:-এর সময়ে নির্মিত মসজিদের অবকাঠামো বর্তমানে বিদ্যমান নেই। শুরুতে মসজিদটি ছিল মূলত দেয়াল ঘেরা একটি খোলা স্থান। ওহী তথা কুরআন নাজিলে, মানুষের সম্মিলন স্থান এবং বিচার ফয়সালা সম্পন্ন হতো এখানে। কুরআন শেখার জন্য একটি উঁচুস্থান ছিল। মসজিদের কিছু অংশে ছাদের ব্যবস্থা ছিল যার খুঁটি ছিল খেজুর গাছের। আর কিবলা ছিল জেরুসালেমের দিকে। পরে কুরআনে কিবলা পরিবর্তনের আয়াত নাজিল হলে কিবলাও পরিবর্তন করা হয়।

রাসুল (সা.) মদিনায় হিজরত করার পর মসজিদে নববীকে কেন্দ্র করেই বিকশিত হয়েছিল ইতিহাসের প্রথম মুসলিম সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থার। মহানবী (সা.)-এর সার্বিক তত্ত্বাবধান ও অংশগ্রহণে ঐতিহাসিক এই মসজিদ গড়ে ওঠে। সাহাবিদের দ্বিন শেখানো থেকে শুরু করে রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ সব কাজ তিনি মসজিদে নববীতে বসেই আঞ্জাম দিতেন। সাহাবিরা এখানেই তাঁর কাছে কোরআন শিখতেন আবার এর প্রাঙ্গণে হতো যুদ্ধের প্রশিক্ষণ ও প্রস্তুতিসভা। মদিনায় হিজরত করার পর কুবা এলাকায় যাত্রাবিরতি দেন রাসুলে আকরাম (সা.)। সেখানে চার দিন অবস্থানকালে একটি মসজিদও নির্মাণ করেন।
কুবা থেকে বিদায় নিয়ে তিনি বর্তমান মসজিদে নববীর এলাকায় এসে স্থায়ী হন এবং মসজিদ নির্মাণ করেন। তত্কালীন সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনে এই মসজিদের প্রভাব সবচেয়ে বেশি। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর পর খোলাফায়ে রাশেদার যুগ পর্যন্ত মসজিদে নববীই ছিল ইসলামী খিলাফতের প্রাণকেন্দ্র। এখান থেকে মুসলিম বিশ্ব পরিচালিত হতো।

রাসুলে আকরাম (সা.)-এর হাতে মসজিদে নববীর প্রতিষ্ঠা হলেও যুগে যুগে বহু সংস্কার ও সম্প্রসারণ হয়েছে এই মসজিদের। ফলে প্রতিষ্ঠাকালীন আয়তন এক হাজার ৫০ স্কয়ার মিটার থেকে বেড়ে বর্তমানে দুই লাখ ৩৫ হাজার স্কয়ার মিটারে দাঁড়িয়েছে। সপ্তম হিজরিতে মসজিদে নববীর প্রথম সম্প্রসারণ রাসুল (সা.)-ই করেন। তখন আয়তন বেড়ে হয় দুই হাজার ৪৭৫ স্কয়ার মিটার। এরপর ওমর বিন খাত্তাব (রা.) (১৭ হিজরি) থেকে শুরু করে বাদশাহ ফাহাদ বিন আবদুল আজিজ (১৪১৪ হিজরি) পর্যন্ত মোট আটবার মসজিদে নববীর সংস্কার ও সম্প্রসারণ হয়েছে। ৯১ হিজরিতে ওমর বিন আবদুল আজিজ (রহ.) খলিফা ওয়ালিদ বিন আবদুল মালেকের নির্দেশে মসজিদে নববীর সম্প্রসারণ করেন। এ সময় হজরত আয়েশা (রা.)-এর কক্ষটি মসজিদে নববীর অন্তর্ভুক্ত করেন এবং তার ওপর নয়নাভিরাম সবুজ গম্বুজ স্থাপন করেন।
১৯০৯ সালে এই মসজিদের মাধ্যমেই আরব উপদ্বীপের বিদ্যুতায়ন শুরু হয়। বাদশাহ ফাহাদের যুগেই মসজিদে নববীর আধুনিকায়নের কাজ হয়। ১৪০৪ হিজরি (১৯৮৫ খ্রি.) থেকে ১৪১৪ পর্যন্ত দীর্ঘ ১০ বছরের সংস্কার ও সম্প্রসারণে তা নতুন অবকাঠামো লাভ করে। এতে মসজিদের আয়তন বৃদ্ধি পায় ৮২ হাজার মিটার। যাতে প্রায় সাত লাখ মুসল্লি নামাজ আদায় করতে পারত। বাদশাহ ফাহাদ মসজিদে নববীতে নারীদের নামাজ আদায়ের জায়গা তৈরি করেন। এ ছাড়া মসজিদের বাইরের নিরাপত্তা দেয়াল, মসজিদ প্রাঙ্গণের ছাতা, ইলেকট্রিক গম্বুজ, আধুনিক অজুখানা, নতুন মিনার, গাড়ি পার্কিংয়ের জায়গা, আধুনিক পাঠাগার ইত্যাদি সংযুক্ত হয়। বর্তমানে মসজিদে নববীতে ১০টি সুউচ্চ মিনার ও প্রায় ২০০টি ছোট-বড় গম্বুজ রয়েছে। তবে এই মসজিদের মূল আকর্ষণ মহানবী (সা.)-এর রওজায়ে আতাহ্র, তার মিম্বর, কক্ষ, সবুজ গম্বুজ ও সমৃদ্ধ লাইব্রেরি।