ইসলামী চিন্তায় ক্ষুধার দর্শন

hannah-busing-unsplash
Bereketli sofralarımız olsun. Fotoğraf: Hannah Busing-Unsplash

পবিত্র রমযান মাস আগমনের আগে, ডায়েট সম্পর্কিত বিভিন্ন টিপস শেয়ার করা হয়েছে যাতে মুসলমানরা সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের মধ্যে সহজভাবে রোজা রাখতে পারেন। যেমন সারা দিন ধীরে ধীরে আপনাকে শক্তি যোগাবে এমন কার্বোহাইড্রেট খান এবং আপনার ডায়েটে ফাইবার জাতীয় খাবার যুক্ত করুন যাতে নিজেকে পরিপূর্ণ বোধ হয় ইত্যাদি। যাইহোক আমরা কি কখনও ভেবে দেখেছি যে, সারাদিন তৃপ্তি অনুভব করার চেয়ে রোজার উদ্দেশ্য মূলত ক্ষুধার্ত বোধ জাগ্রত হওয়া? এখানে আমি এমন লোকদের সমালোচনা করছি না যারা এই জাতীয় পরামর্শ দেয় বা অনুসরণ করেন; কিন্তু রোজার মূল উদ্দেশ্যই তো ক্ষুধার অনুভূতি জাগ্রত হওয়ার মাধ্যমে আল্লাহর প্রতি নিজের অন্তরকে আবদ্ধ করা।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়াসাল্লাম যখন জান্নাত ভ্রমণ করছিলেন তখন আল্লাহর সাথে তাঁর একটি অন্তরঙ্গ আলাপচারিতা ঘটেঃ

আল্লাহ বললেনঃ “হে আহমাদ, আপনি কি জানেন আমার বান্দা কখন আমার নিকটবর্তী হয়?”

নবীজী জবাব দিলেনঃ “না, আমি জানি না, আমার রব।”

আল্লাহ বললেনঃ “যখন সে ক্ষুধার্ত হয় অথবা সেজদায় থাকে।”

নবীজী তখন জিজ্ঞাসা করলেনঃ “হে আল্লাহ, ক্ষুধার্ত থাকার ফলাফল কী?”

আল্লাহ জবাব দিলেনঃ “প্রজ্ঞা, অন্তরের সুরক্ষা, আমার নিকটবর্তী হওয়া, স্বল্প দুঃখ, মানুষের উপর বোঝা কমা, সত্য বলা এবং সে সচ্ছল নাকি দারিদ্র্য অবস্থায় বাস করছে এ বিষয়ে উদ্বিগ্ন না হওয়া।”

(তথ্যসূত্র: বিহার আল আনোয়ার)

ক্ষুধার উপকারিতা এ থেকে স্পষ্ট। অন্য একটি বর্ণনায় এটিকে আরও জোর দেওয়া হয়েছে যেখানে নবীজী সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ

“আমি তোমাদেরকে খুব বেশি খাওয়ার ক্ষেত্রে সতর্ক করছি কারণ এটি হৃদয়কে শক্ত করে দেয় এবং আল্লাহর আনুগত্যের ক্ষেত্রে তোমাদের মাঝে অলসতা সৃষ্টি করে এবং এটি উত্তম পরামর্শ শ্রবণ থেকে কানকে বধির করে দেয়।” (তথ্যসূত্র: বিহার আল আনোয়ার)

ভরা পেটে হৃদয়ে অমনোযোগীতা সৃষ্টি হয়, কিন্তু ক্ষুধার মাধ্যমে হৃদয় জেগে ওঠে। তৃপ্তি যেমন দেহকে ভারী করে তোলে ও আত্মাকে নিস্তেজ করে তোলে, তেমনি ক্ষুধা আত্মাকে আলোকিত করে। ঈসা আ’লাইহিস সালামও এর উপর জোর দিয়েছেন:

“হে বনি ইসরাইল! ক্ষুধার্ত হলেই খাবে! তবে এত অধিক পরিমাণে খাবে না যে, তাতে তোমার মন সন্তুষ্ট হয়ে যায়। বস্তুতঃ তুমি যখন তৃপ্তি পাবে, তখন তোমার ঘাড় মোটা হয়ে যাবে, তোমার শরীর মোটা হয়ে যাবে এবং তুমি তোমার পালনকর্তাকে ভুলে যাবে” (তথ্যসূত্র: বিহার আল আনোয়ার)

সুতরাং, ক্ষুধা আপনাকে আপনার রবের নিকতবর্তী হতে সাহায্য করবে। রোজার সময় একজন স্বয়ংক্রিয়ভাবে আল্লাহর নিকটবর্তী হওয়া অনুভব করে; সহজ কথা হলো ক্ষুধা আপনার মাঝে ধর্মীয় বোধ জাগ্রত করে।, ক্ষুধার যন্ত্রণা আপনাকে বুঝতে সাহায্য করে যে, আপনি আপনার রবের সামনে কতটা দুর্বল এবং অভাবী। এ কারণেই ইমাম আলী বলেছেন:

“নিজের বদঅভ্যাস গুলো পরিবর্তন করার জন্য ক্ষুধার্ত থাকা অনেক সহায়ক” (তথ্যসূত্র: ঝুরার আল হিকাম)

ক্ষুধা আপনার নফসকে নিয়ন্ত্রণ করতে শেখায় যা আপনাকে শৃঙ্খলাবদ্ধ করে। এই কারণেই রোজার প্রথম সপ্তাহের পরে, আপনি বুঝতে শুরু করেন যে, রোজা রাখা আসলে খারাপ কিছু নয়।

সুতরাং, ঈমানদারের মুখ সর্বদা হাসিখুশি এবং আনন্দিত থাকে তবে তারা আল্লাহর পরিপূর্ণ সন্তুষ্টি অর্জন করেছে কিনা তা নিশ্চিত না হওয়ার কারণে তাদের দুঃখ আসে।

ক্ষুধার উপকারিতা কুরআনেও দেখা যায়। কুরআনের ১৮ তম সূরায় আমাদের কাছে মূসা আ’লাইহিস সালামের সেই বিখ্যাত ঘটানাটি বলা হয়েছে যেখানে গোপন অন্তর্নিহিত জ্ঞান সম্পর্কে জানার জন্য আল্লাহর মনোনীত দাসদের একজনের সাথে তাঁকে দেখা করতে বলা হয়েছিল। “অতঃপর যখন তাঁরা দুই সুমুদ্রের সঙ্গমস্থলে পৌছালেন, তখন তাঁরা নিজেদের মাছের কথা ভুলে গেলেন। অতঃপর মাছটি সমুদ্রে সুড়ঙ্গ পথ সৃষ্টি করে নেমে গেল” (১৮:৬১)। “যখন তাঁরা সে স্থানটি অতিক্রম করে গেলেন, মূসা তার সঙ্গীকে বললেনঃ আমাদের জন্য খাবার আনুন। এই সফরে ক্লান্ত হয়ে পড়েছি” (১৮:৬২)। “সে বললঃ আপনি কি লক্ষ্য করেছেন, আমরা যখন প্রস্তর খন্ডে আশ্রয় নিয়েছিলাম, তখন আমি মাছের কথা ভুলে গিয়েছিলাম। শয়তানই আমাকে একথা স্মরণ রাখতে ভুলিয়ে দিয়েছিল। মাছটি আশ্চর্য জনক ভাবে সমুদ্রে নিজের পথ করে নিয়েছে” (১৮:৬৩)। “অতঃপর তারা চলতে লাগল, অবশেষে যখন একটি জনপদের অধিবাসীদের কাছে পৌছে তাদের কাছে খাবার চাইল, তখন তারা তাদের অতিথেয়তা করতে অস্বীকার করল। অতঃপর তারা সেখানে একটি পতনোম্মুখ প্রাচীর দেখতে পেলেন, সেটি তিনি সোজা করে দাঁড় করিয়ে দিলেন। মূসা বললেনঃ আপনি ইচ্ছা করলে তাদের কাছ থেকে এর পারিশ্রমিক আদায় করতে পারতেন” (১৮:৭৭)। সুতরাং, ক্ষুধার্ত হওয়া জ্ঞান অর্জনের জন্য একটি স্বীকৃত বিষয়।