ইসলামী বিধান অনুযায়ী অসিয়ত বা উইল যেভাবে করবেন

অসিয়াত

অসিয়ত অর্থ ইচ্ছা করা। ইসলামী আইন অনুযায়ী অসিয়ত হলো একটি আইনগত ঘোষণা।

কোনো সুনির্দিষ্ট সম্পদ বা মুনাফার মধ্যে উপহার প্রদানের পদ্ধতিতে অসিয়তকারীর মৃত্যু পর্যন্ত তা স্থগিত রাখার অধিকার দান করাই হল অসিয়ত। একজন অসিয়তকারীর অসিয়ত তার মৃত্যুর মুহূর্ত থেকে কার্যকর হয়। যে অসিয়ত করে তাকে অসিয়তকারী এবং যার নামে অসিয়ত করা হয় তাকে অসিয়ত-গ্রহীতা বলা হয়।

অসিয়ত করার যোগ্যতাসম্পন্ন ব্যক্তি

সম্পত্তি হস্তান্তরের ক্ষেত্রে ইসলামী আইনে অসিয়ত গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে। অসিয়ত কুরআন-হাদিস সংক্রান্ত আইনবিশেষ। প্রত্যেক বালেগ, সুস্থ মস্তিষ্কের মুসলমানই অসিয়তের মাধ্যমে সম্পত্তি হস্তান্তর করতে পারে।

অসিয়ত করার সময় কয়েকটি শর্ত রয়েছে। এক. অসিয়তকারী সুস্থ থাকা আবশ্যক। বিকৃত মস্তিষ্কের অসিয়ত কার্যকর হবে না। দুই. যেকোনো চুক্তিপত্র করতে যেরূপ মুক্ত সম্মতি প্রয়োজন হয়, অসিয়তের ক্ষেত্রেও তা দরকার। শক্তিপ্রয়োগে বাধ্য করে অসিয়ত করে নিলে তা গ্রহনীয় হবে না। তিন. অসিয়তকারী যেকোনো অসিয়ত রদ ও পরিবর্তন করতে পারে এবং এক্ষেত্রে তার সর্বশেষ অসিয়ত কার্যকর বলে গণ্য হবে। চার. অসিয়তকারী কমপক্ষে দুইজন সাক্ষীর সম্মুখে অসিয়তনামার সকল বিষয় অবগত হয়ে তাতে স্বাক্ষর করবেন। কমপক্ষে দুইজন সাক্ষী হিসেবে উইল বা অসিয়তনামায় স্বাক্ষর করবেন।

সম্পত্তির কত অংশ অসিয়ত করা যায়

ইসলামী আইন অনুযায়ী কোনো মুসলমান তার দাফন-কাফন ব্যয় ও ঋণ পরিশোধের পর, বাকি সম্পত্তির এক-তৃতীয়াংশের অধিক অসিয়তের মাধ্যমে হস্তান্তর করতে পারে না। অসিয়তকারীর মৃত্যুর পর উত্তরাধিকারীরা এক-তৃতীয়াংশের অধিক অসিয়তে সম্মত হলেও অসিয়তনামার মাধ্যমে এক-তৃতীয়াংশের অধিক পরিমাণ সম্পত্তিতে দান কার্যকর হবে না।

অসিয়ত মৌখিক বা লিখিত

অসিয়ত মৌখিক অথবা লিখিতভাবে কার্যকর করা চলে। ইসলামী আইনে কোনো অসিয়তকে বৈধ করার জন্য লিখিতভাবে তা প্রস্তুত করার প্রয়োজনীয়তা নেই এবং যতক্ষণ পর্যন্ত অসিয়ত প্রদানকারীর অসিয়ত করার ইচ্ছা স্পষ্টভাবে উপলব্ধি করা যাবে ততক্ষণ পর্যন্ত কোনো বিশেষ প্রক্রিয়া এমনকি কোনো লিখিত বা মৌখিক ঘোষণারও প্রয়োজন নেই।

অসিয়তের ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা

ইসলামী আইন অনুযায়ী অসিয়ত করার ব্যাপারে যে সকল সীমাবদ্ধতা রয়েছে সেগুলো নিম্নে আলোচনা করা হলো-

১। ইসলামী আইন অনুযায়ী একজন মুসলিম অসিয়তকারী যেকোনো অনাত্মীয়কে তার সমুদয় সম্পত্তির মাত্র এক-তৃতীয়াংশ অসিয়তপত্রের মাধ্যমে দান করতে পারে, কিন্তু এর অধিক অসিয়ত করতে পারে না।

২। অসিয়তকারী তার কোনো উত্তরাধিকারীর নামে অসিয়তনামার মাধ্যমে সম্পত্তি দান করতে পারে না। এরূপ দান আইনত গ্রহনীয় হবে না।

৩। অসিয়তকারী তার কোনো উত্তরাধিকারীর নামে অসিয়তনামার মাধ্যমে কোনো সম্পত্তি দান করলে মূলত আইন সংগত হবে না বটে; কিন্তু অসিয়তকারীর মৃত্যুর পর তার অন্যান্য উত্তরাধিকারী তা মেনে নিলে সংশ্লিষ্ট অসিয়তটি আইনসিদ্ধ ও কার্যকরী হবে।

৪। ইসলামী আইন অনুযায়ী একজন মুসলিম তার অন্যান্য উত্তরাধিকারীকে বঞ্চিত করে কেবল একজন উত্তরাধিকারীর জন্য অসিয়ত করতে পারে না।

৬। অসিয়তকারী তার মৃত্যুর সময় যদি কোনো অস্তিত্বহীন ব্যক্তির নামে অসিয়ত করে যায়, তবে উক্ত অসিয়ত অবৈধ বলে গণ্য হবে। তবে অসিয়ত করার দিন হতে ছয় মাসের মধ্যে কোনো সন্তান জন্ম নিলে তাকে অসিয়তনামার মাধ্যমে সম্পত্তি দান করে দিতে হবে।

৭। অসিয়তকারীর কোনো উত্তরাধিকারী না থাকলে তিনি তার সব সম্পত্তি যেকোনো অপরিচিত ব্যক্তিকে অসিয়তনামার মাধ্যমে দান করে দিতে পারেন। তবে ইসলামী আইনে বৈধ নয় এমন কোনো ক্ষেত্রে অসিয়ত করা যাবে না।

৮। শর্তসাপেক্ষে কেউ অসিয়ত করতে পারে না। শর্তসাপেক্ষে অসিয়তনামার মাধ্যমে দান অবৈধ বলে গণ্য হবে।

৯। একজন অসিয়তকারী ভবিষ্যতে পাবে এরূপ অসিয়তপূর্বক দান করতে পারেন না এবং এরূপ দানও অবৈধ।

১০। এক-তৃতীয়াংশ সম্পত্তি অসিয়তকারী কর্তৃক অসিয়ত করার পর বাকি দুই-তৃতীয়াংশ সম্পত্তি তার ওয়ারিশদের মধ্যে বন্টিত হবে।

১১। যেহেতু অসিয়তকারীর মৃত্যুর পর অসিয়ত কার্যকরী হয়, সেহেতু অসিয়তকারী তার জীবদ্দশায় যেকোনো সময় অসিয়ত রদ বা বাতিল করতে পারে।

অসিয়ত বাতিলকরণ

অসিয়ত বাতিল করা যায়। অসিয়তকারী তার জীবদ্দশায় অসিয়ত রদ বা বাতিল করতে পারেন। যেসকল পদ্ধতির মাধ্যমে অসিয়তকারী তার অসিয়তপত্র রদ করতে পারেন তা নিম্নরূপ-

১. অসিয়তকারী তার কৃত অসিয়ত লিখিত বা মৌখিক ঘোষণার মাধ্যমে প্রত্যাহার করতে পারে।

২. যদি অসিয়তকারী অসিয়তকৃত সম্পত্তিতে এমন কোনো কাজ করেন, যার ফলে উক্ত সম্পত্তির পরিবর্তন সাধিত হয়, তাহলে সংশ্লিষ্ট অসিয়তটি বাতিল হয়ে যাবে।

৩. অসিয়তকৃত সম্পত্তিতে যদি অসিয়তকারীর স্বত্বের অবসান ঘটে, তাহলে সংশ্লিষ্ট অসিয়তটি রদ হয়ে যাবে।