ইসলামী বিশ্বে নির্যাতিত অভিবাসী গৃহকর্মীরা, প্রয়োজন জোরালো প্রতিবাদ

domestic worker
ID 148614775 © Elnur | Dreamstime.com

সাম্প্রতিককালে বহুলপ্রচলিত একটি নিউজ ওয়েবসাইট স্টেপফিড আরবের কিছু অংশে দাস-দাসীদের ক্রয়-বিক্রয় সংক্রান্ত বিজ্ঞাপনের বিষয়ে একটি গল্প প্রকাশ করেছে। সমালোচনার ঝড় অত্যন্ত প্রত্যক্ষভাবেই চোখে পড়েছিল, কারণ অনেকদিন যাবৎ বিষয়টি নিয়ে বিশেষ কোনও প্রকার আলোচনা হয়নি। মানবাধিকারের মতো বিষয়টি যে বিশ্বের প্রতিটি মানুষের জন্য সমানভাবে প্রযুক্ত নয়, সে কথা সুস্পষ্টভাবে লেখাটিতে প্রকাশিত হয়েছিল। খবরে এমন একটি সময়ের কথা আলোচট হয় যে সময়ে মানুষের জীবন কেনা বেচা অতি সাধারণ বিষয় ছিল। অস্বস্তিকর হলেও একটি বিষয় মেনে নিতে কোনও দ্বিধা নেই যে দাসত্বপ্রথা আজও বেঁচে আছে। বিভিন্ন রূপে।

২০১৬ সালের গ্লোবাল স্লেভারি ইনডেক্স জানিয়েছে যে আধুনিক দাসত্বের শেকল পড়তে বাধ্য হয়েছে প্রায় সাড়ে চার কোটি পুরুষ, মহিলা এবং শিশু। সূচকটি অস্ট্রেলিয়ান ওয়াক ফ্রি ফাউন্ডেশনের সমীক্ষা থেকে প্রাপ্ত। তারা দাসত্বকে সংজ্ঞায়িত করেছে যে ‘কোনও ব্যক্তি (যিনি) হুমকি, জবরদস্তি, ক্ষমতার অপব্যবহার বা প্রতারণার কারণেও তারা কাজ করতে অস্বীকার করতে পারবেন না’। কার্যত দাসত্ব বা এই দাসপ্রথা এখন বিশ্বব্যাপী প্রতিটি দেশে অবৈধ। তবে এই প্রথাটি এখনও অন্যভাবে অব্যাহত রয়েছে। ভারতে সর্বাধিক সংখ্যক দাস রয়েছে (১.৮ কোটি ) এবং উত্তর কোরিয়া মাথাপিছু সর্বাধিক দাস (তার মোট জনসংখ্যার ৪.৪%) রয়েছে বলে জানা গেছে।

ঘরোয়া নির্যাতন

২০১৪ সালে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডাব্লু) মধ্য প্রাচ্যের একটি দেশের ৯৯ জন গৃহকর্মীর সাক্ষাত্কার নিয়েছে। তাদের রিপোর্ট অনুযায়ী অনেকক্ষেত্রেই বাড়ির পরিচারিকাকে দীর্ঘ সময় ধরে কাজ করনো হয়ে থাকে, যার জন্য তাদের প্রায়শই বেতন দেওয়া হয় না। কখনও কখনও প্রতিদিন ২১ ঘন্টা দীর্ঘ সময় ধরে কাজ করা হয়। সাক্ষাত্কারী ৯৯ জনের মধ্যে ২৪জন শারীরিক বা যৌন নির্যাতনের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) জানিয়েছে যে বিশ্বের গৃহকর্মী কেবলমাত্র ৩০%-এর নীচে এমন দেশগুলিতে কাজ করেছেন যেগুলিতে তারা সংশ্লিষ্ট শ্রম আইনের সুবিধা থেকে সম্পূর্ণ বাদ পড়েছে। বিচার সংক্রান্ত সুরক্ষার এই অভাবের পরিপ্রেক্ষিতে এটি আশ্চর্যজনক নয় যে নির্যাতনের হার এত বেশি। আইনটি খুব কমই ক্ষতিগ্রস্থদের শ্রম বা মানবাধিকার রক্ষায় হস্তক্ষেপ করে। প্রায়শই আইনি সুরক্ষা পেতে গেলে পর্যাপ্ত সাক্ষ্যেরও প্রয়োজন হয় যেমন ক্যামেরায় ধরা পড়া কোনও ভিডিও ভাইরাল হওয়া এবং তৃতীয় কোনও ব্যক্তির উপস্থিতিতে অনৈতিক কোনও ঘটনা ঘটে যাওয়া ইত্যাদি।

অভিবাসী দাসত্ব

জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (আইওএম) জানাচ্ছে, অনেক পশ্চিম আফ্রিকার বাসিন্দা অর্থের বিনিময়ে ক্রেতার কাছে বিক্রি হচ্ছে। অনেকে আবার ইউরোপের উন্নত জীবনের প্রত্যাশায় সংঘাত-পীড়িত দেশ ত্যাগ করছে। অনেকে দাসপ্রথার নির্যাতন সহ্য অর্তে না পেরে অপরাধে লিপ্ত হচ্ছে। সমগ্র প্রক্রিয়ার পরিণতি হচ্ছে মৃত্যু।

দাসত্ব নিয়ে কি ইসলামের কোন সমস্যা আছে?

ইসলামী সংস্কার ও দাসত্বপ্রথা এই বিষয়টি অত্যন্ত বিস্তৃত এবং জটিল। যা এই সংক্ষিপ্ত পরিসরে প্রকাশ করা মোটেই সহজসাধ্য নয়। তবে একটি বিষয় বেশ জোরের সঙ্গে বলা যেতে পারে তা হ’ল গৃহকর্মীদের অপব্যবহার, বা ব্যক্তি অপহরণ এবং বিক্রয় স্পষ্টভাবে এই ক্ষেত্রে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। ইসলামী পণ্ডিত জোনাথন এসি ব্রাউন সম্ভবত ইসলাম এবং দাসত্ব সম্পর্কিত আলোচনার মধ্যে সবচেয়ে সমালোচিত প্রশ্ন উত্থাপন করেছেন; যে দাসত্ব শব্দটিকে ঠিক কীভাবে সংজ্ঞায়িত করা হবে?  আমেরিকান দাসত্বপ্রথা এবং ইসলামী সাহিত্যের মধ্যে বিবৃত দাসত্বের ধারণাকে পৃথকীকরণের প্রতিই তিনি বিশেষ আগ্রহী। আমরা গত শতাব্দীতে জন্মগ্রহণকারী বেশিরভাগ মানুষ দাস শব্দটি শুনলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে আমেরিকার দাসত্ব প্রথার কথাই মনে আসে। কিন্তু জোরপূর্বক সব শ্রমকে দাসত্ব হিসাবে অভিহিত হতে পারে।

দাসদের অবস্থার উন্নতি করার জন্য ইসলামিক আইন অনেক শর্ত রেখেছিল। পাশাপাশি এমন শর্তও রয়েছে যে এর নির্মূলের দিকে নিয়ে যায়। কোনও গোলামকে তার মালিকের দ্বারা নির্যাতন করা দেখে নবীজি বলেছিলেন যে, “নিশ্চয়ই আপনি নিজের মধ্যে অজ্ঞতা বোধ করেন। এরা হলেন আপনার ভাই ও বোন … প্রত্যেকে নিজের অধীনে থাকা ভাই বোনকে একই খাবার ও পোশাক দেবে যা সে নিজে খায় ও পরে। তার সামর্থ্যের বাইরে তাকে কিছু চাপিয়ে দেওয়া উচিত নয়। আপনি যদি তার উপর বোঝা প্রদান করেন, তবে তাকে সহায়তা করুন ”। ইসলামিক সংস্কৃতি এবং পণ্ডিতবর্গের বিরোধিতা ছিল এই দাসপ্রথার প্রতি। আমরা বলতে পারি ইসলাম সর্বদাই দাসত্ব প্রথার ন্যায় অমানবিক বিষয়গুলোর প্রতি বিরোধিতা করে এসেছে এবং এখনও সেই বিরোধিতার প্রকাশ নানাভাবে লক্ষ করা যায়। মানুষের প্রতি মানুষের ভালবাসা, সহমর্মিতা, প্রীতির ভাব বজায় রাখাই হল এই সংস্কৃতির অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য। কাজেই এই ধরনের আচরণের প্রতি আমাদের বিরোধিতা করাটাই শ্রেয়।