ইসলামী শরী‘আতের আলোকে উত্তরাধিকার সাব্যস্ত হওয়ার কারণসমূহ

dreamstime_s_109974337
o 109974337 © Ilia Burdun | Dreamstime.com

উত্তরাধিকার সিরিজ (১ম পর্ব)

 

ইসলাম ভারসাম্যপূর্ণ দ্বীন। মানুষের ইহলৌকিক ও পারলৌকিক কল্যাণের রক্ষাকবচ একমাত্র ইসলাম। বৈধ পন্থায় উপার্জিত ব্যক্তি মালিকানাকে ইসলাম স্বীকার করে। আবার মালিকানাধীন সম্পদ ব্যয়ের ক্ষেত্রেও রয়েছে ইসলামের সুস্পষ্ট নীতিমালা। নিজ প্রয়োজনে খরচের পাশাপাশি পরিবার পরিজন, আত্মীয়স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশী ও অন্য আর কাকে কখন কি পরিমাণে সম্পদ দেওয়া দরকার তার সুস্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে শরী’আতে। আর সম্পদ রেখে মারা গেলে কারা কী পরিমাণ অংশ পাবে বা উত্তরাধিকার হবে তাও শরী’আত স্পষ্টরূপে বলে দিয়েছে।

আবার কেউ তার সম্ভাব্য উত্তরাধিকারীকে নিজ হাতে কোনো সম্পদ দিতে চাইলে তার সঠিক নীতিমালাও শরী’আত বাতলে দিয়েছে। এসব নীতিমালা সঠিকভাবে অনুসরণের মাধ্যমেই পরিবার ও সমাজ শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের যোগ্য হয়ে থাকে। কিন্তু আফসোসের বিষয় হল, বর্তমানে কিছু মুসলিম কর্তৃক এসকল মূল্যবান নীতিমালা ও নির্দেশনা অনুসরণ না করার কারণে পরিবার ও সমাজ হয়ে উঠেছে বিশৃংখল ও অশান্তিপূর্ণ। শুধু তাই নয় বরং সম্পদের মালিক নিজ জীবদ্দশাতেই বিপাকে পড়ে যায় অনেক ক্ষেত্রে।

তাই আমরা কয়েকটি পর্বে ইসমালী শরী’আতের আলোকে উত্তরাধিকার আইন সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করব; যাতে পাঠক সহজে বিষয়টির গুরুত্ব বুঝতে পারে এবং ইসলামী নির্দেশনার আলোকে উত্তরাধিকারের হক আদায় করতে পারে।

আজকের নিবন্ধে ইসলামী শরী‘আতে উত্তরাধিকার সাব্যস্ত হওয়ার কারণসমূহ নিয়ে আলোচনা করা হবে। ইসলামী শরী‘আতে উত্তরাধিকার সাব্যস্ত হওয়ার তিনটি কারণ রয়েছে। সেগুলি নিম্নে উল্লেখা করা হল-

প্রথম কারণ: বিবাহ

ইসলামী শরী’আত অনুসারে, বৈধ বৈবাহিক চুক্তিকে বিবাহ বলা হয়। এমনকি যদি স্বামী তার স্ত্রীর সাথে নির্জনে সাক্ষাতের সুযোগ না পায় বা তাদের মধ্যে যৌন মিলন নাও ঘটে তবুও আকদ হয়ে গেলেই বিবাহ হয়েছে বলে গণ্য হবে। আর বিবাহের পর স্বামী, স্ত্রী পরস্পরের সম্পত্তির উত্তরাধিকারী সাব্যস্ত হয়, যতক্ষণ তাদের মধ্যে বৈবাহিক চুক্তি কার্যকর থাকে। উদাহরণস্বরূপ, যদি কোনো ব্যক্তি তার স্ত্রীকে তালাকে দেয় এবং তার ‘ইদ্দত’ (বিবাহ পরবর্তী অপেক্ষার সময়) কেটে যায়, তবে বিবাহ বন্ধন ভঙ্গের কারণে তাদের মধ্যে আর পারস্পরিক উত্তরাধিকার থাকবে না।

তবে, কোনো কোনো বিজ্ঞ আলেমের মতে, যদি কোনো  স্বামী তার মৃত্যুর পূর্বে মারাত্মক অসুস্থতার সময় স্ত্রীকে তালাক প্রদান করে এবং স্বামীর প্রতি এই অভিযোগ আনা হয় যে উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত করতেই আচমকা স্ত্রীকে তালাক দেওয়া হয়েছে, এক্ষেত্রে স্ত্রীর ইদ্দত শেষ হয়ে গেলেও তালাকপ্রাপ্ত স্বামীর সম্পত্তির উত্তরাধিকার হবে। কয়েকজন বিশেষজ্ঞর মতে, এই নির্দিষ্ট পরিস্থিতে ওই স্ত্রী যদি অন্য কোনো পুরুষের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হোন তাহলেও পূর্ববর্তী স্বামীর সম্পত্তিতে ভাগ পাবেন কারণ তাকে অন্যায় ভাবে বঞ্চিত করা হয়েছিল।

দ্বিতীয় কারণ: ওয়ালা (দাসমুক্তির পরেও মালিকের আনুগত্যে থাকা)

এটিও এক ধরণের আত্মীয়তা। যদি কোনও মালিক তার দাসকে মুক্তি দেয় এবং মুক্ত দাস তার নিকটই থেকে যায়, তবে তাদের মধ্যে ওয়ালা (আনুগত্য) নামে এক ধরণের সম্পর্ক শুরু হয়। এটি মালিকের অনুগ্রহ যে, সে দাসকে মুক্ত করে দেয়; তবে দাস মালিকের মহানুভবতায় তার নিকট অবস্থান করে। এই শর্তে দাস মালিকের উত্তরাধিকার সাব্যস্ত হয়। তবে বর্তমানে দাস না থাকায় এই বিধানটি বিলুপ্ত হয়েছে।

তৃতীয় কারণ: আত্মীয়তা

আত্মীয়তা হল জন্মের কারণে বা রক্ত সম্পর্কের দরূণ দুই বা ততোধিক মানুষের মধ্যে একটি সংযোগ। এটি নিকটবর্তী বা দূরবর্তী দুরকমই হতে পারে। প্রত্যেক পুরুষ বা মহিলার সাথে যাদের জন্মের সংযোগ রয়েছে, সে যতই নিকটবর্তী হোক বা দূরের হোক, পিতার দিক থেকে হোক বা মায়ের দিক থেকে হোক সর্বাবস্থায় সে আত্মীয় সাব্যস্ত হবে। এটি উত্তরাধিকার সাব্যস্ত হওয়ার প্রধান কারণ।

আত্মীয় স্বজনদের মধ্যে উত্তরাধিকারীরা তিন ভাগে বিভক্ত:

১) পূর্বপুরুষ: মৃত ব্যক্তির পিতা, পিতামহ (পিতার বাবা), পিতার দিক থেকে জীবিত উর্ধ্বতন সকল পুরুষ; এবং মৃত ব্যক্তির মা এবং মাতামহ, মায়ের দিক থেকে জীবিত উর্ধ্বতন সকল মহিলা উত্তরাধিকার সাব্যস্ত হয়।

২) সন্তান-সন্ততি: মৃত ব্যক্তির পুত্র এবং পুত্রের দিক থেকে নিম্নের দিকে যেমন নাতি, নাতির ছেলে প্রভৃতি এবং অনুরূপভাবে মেয়ে এবং মেয়ের দিক থেকে নিম্নের দিকে সকলে উত্তরাধিকার সাব্যস্ত হয়।

৩) পূর্বপূরুষ বা সন্তান-সন্ততি ব্যতীত অন্যান্য সম্পর্ক: মৃত ব্যক্তির ভাই-বোন বা ভাই-বোনের সন্তান-সন্ততি প্রভৃতিরাও উত্তরাধিকার সাব্যস্ত হয়।

এগুলি হল ইসলামী শরি’আতের আলোকে উত্তরাধিকার সাব্যস্ত হওয়ার মূল তিনটি কারণ। কোনো ব্যক্তি মারা গেলে তার অসিয়তকৃত সম্পত্তি ব্যতিত বাকি সমুদয় সম্পত্তি নির্দিষ্ট হারে এ সকল আত্মীয়দের মাঝে বন্টিত হবে।

 

(চলবে এবং পরবর্তী পর্বে আমরা আলোচনা করব উত্তরাধিকার সাব্যস্ত হওয়ার মাঝে প্রতিবন্ধকতা এবং উত্তরাধিকার সাব্যস্ত হওয়ার শর্তসমূহ সম্পর্কে)