ইসলামী শরীয়াহর লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য

ইসলামে রূপান্তর ২৭ জানু. ২০২১ Contributor
ফিচার
শরীয়াহর
© Nazife Hatipoglu | Dreamstime.com

পরিভাষাগত ভাবে শরীয়াহ দু’টি অর্থ বহন করে।

১. প্রথমটি সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ তা’আলার সাথে সম্পর্কযুক্ত যাতে মানবজীবনের যাবতীয় বিষয় অন্তর্ক্তুক্ত।

২. অপরটি বিশেষত ইসলামী আইন বা ফিকহের অন্তর্ভুক্ত।

প্রথমটি শরীয়াহ কুবরা এবং দ্বিতীয়টি শরীয়াহ ছুগরা নির্দেশ করে। তবে বোঝার সুবিধার জন্য শরীয়াহ কুবরা বোঝাতেই সাধারণত ‘শরীয়াহ’ শব্দটি ব্যবহার করা হয়ে থাকে এবং ‘ফিকহ’ নির্দেশ করে শরীয়াহ ছুগারা-কে।

ব্যাপক অর্থে শরীয়াহ হলো ইসলাম নির্দেশিত পন্থায় জীবন পরিচালনার জন্য আইন-কানুন এবং মানুষের অনুসরণের জন্য আল্লাহ তা’আলার পক্ষ থেকে নাযিলকৃত সর্বোত্তম ব্যবস্থা। শরীয়াহর অনুসরণ মানবজীবনকে এমন এক সুষ্পষ্ট ও সরল পথ দেখায় যা মানুষকে উন্নতি, অগ্রগতি ও পরিপূর্ণতার দিকে নিয়ে যায় এবং পরিশেষে মানুষ আল্লাহ তা’আলার সন্তুষ্টি লাভের পথ দেখতে পায়।

‘শরীয়াহ’ শব্দটির সাথে দ্বীন শব্দটির গভীর সম্পর্ক রয়েছে। দ্বীন বলতে আত্মসমর্পণ বা অনুসরণ বোঝায়। আর শরীয়াহ হলো রাসূল সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লামের বাতলানো পথে আল্লাহর দ্বীনকে অনুসরণ করা।

শরীয়াহর ধারণা

শরীয়াহ শব্দের অভিধানিক অর্থ ‘চলার পথ’। ইসলামী পরিভাষায় পবিত্র কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে মুসলমানরা কিভাবে জীবন পরিচালনা করবে, কিভাবে নানামুখী সমস্যার সমাধান করবে তারই নির্দেশক হলো ইসলামী শরীয়াহ। ইসলামী শরীয়াহ মুসলিমদের জীবন চালনার অপরিহার্য উপাদান। এটি ছাড়া কারো পক্ষে ইসলামী পন্থায় জীবনযাপন করা সম্ভব নয়।

ফিকহশাস্ত্রবিদদের মতে, ‘শরীয়াহ’ বলতে সেসব আদেশ-নিষেধ ও পথনির্দেশ বোঝায়, যা মহান আল্লাহ তা’আলা তাঁর বান্দার প্রতি জারি করেছেন। আল্লাহপাক তাঁর এসব নির্দেশ জারি করেছেন এই উদ্দেশ্যে যে, মানুষ তাঁর প্রতি ঈমান আনবে এবং এসব আদেশ মেনে চলে জীবনযাপন করবে। এসব আদেশ-নিষেধ, আইন-কানুন, শিক্ষা ও মূলনীতি গোটা মানবজীবনের সকল দিক ও বিভাগে পরিব্যাপ্ত। যেমনঃ ইবাদাত-বন্দেগী, নৈতিকতা, রুচি, আচরণ,রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিষয়াদী এবং ব্যক্তি ও সমষ্টিগত স্বার্থ বিষয়ক।

শরীয়াহর শ্রেণীবিভাগ

ইসলামী শরীয়াহকে সামগ্রিকভাবে মূলত তিন ভাগে ভাগ করা যায়।

১) আকিদা

পরিভাষাগতভাবে আকিদা শব্দের অর্থ বন্ধন বা বিশ্বাস। ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে আকিদা বলতে আল্লাহ, তাঁর নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম এবং আখিরাতের প্রতি কারোও মনে মজবুত বিশ্বাস পোষণ করা বোঝায়। আকিদা ইসলামের মূল ভিত্তি এবং প্রকৃত মুসলমান হওয়ার প্রাথমিক শর্ত। মুসলমানের কাজকর্মের মাধ্যমেই আকিদার প্রতিফলন ঘটে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “ইসলাম একটি ইমারতের মতো যার ভিত্তি হলো আকিদা।”

২) ফিকহ

ফিকহ বা শরীয়াহ সুগরা বলতে ইসলামী আইন-কানুন বোঝায়। ফিকহ শব্দের অভিধানিক অর্থ হল গভীর জ্ঞান ও সূক্ষ্মদর্শিতা, কোনো কিছু উপলব্ধি করা ও স্মৃতিপটে আনা, এবং বাস্তবতা জানার উদ্দেশ্যে পর্যালোচনা করা। আর পরিভাষিক অর্থে ফিকহ হল ঐ জ্ঞান বা বিদ্যার নাম, যা শরীয়াহর বিধানসমূহ বিস্তারিত প্রমাণ ও বাস্তবতাসহ তাত্ত্বিক অনুসন্ধান চালিয়ে তা উপলব্ধি করার চেষ্টা করে। অন্য কথায় মানুষের জীবনযাপনের যাবতীয় নিয়মাবলী, ব্যবস্থাবলী, আইন-কানুন ও বিধিবিধানই হল ইসলামী ফিকহ। এক কথায় এটা হল ইসলামের আইনশাস্ত্র।

৩) আখলাক

আখলাক শব্দের অর্থ স্বভাব সমষ্টি বা চরিত্র। আখলাক বলতে সচ্চরিত্র ও দুশ্চরিত্র দুটোকেই বোঝায়। আখলাক মুসলিমের ব্যবহার, রুচি বা তার কাজের নৈতিক ভিত্তিকে বোঝায়, যা তার কর্মকে প্রভাবিত করে। । তাকওয়া, সততা, ন্যয়পরায়ণতা, আমানতদারী, শালীনতা ইত্যাদি সচ্চরিত্রের বৈশিষ্ট্য। আর মিথ্যা, অসততা, আমানতের খেয়ানত, বেহায়াপনা ইত্যাদি দুশ্চরিত্রের অন্তর্গত। আখলাকের গুরুত্ব সম্পর্কে বলতে গিয়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “তোমাদের মধ্যে তারাই সবচেয়ে উত্তম যাদের ব্যবহার উত্তম ও চরিত্র সবচেয়ে সুন্দর।” (বুখারী)

শরীয়াহর লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য

ইসলামী শরীয়াহর প্রধান উদ্দেশ্য হচ্ছে সমাজের কল্যাণ ত্বরান্বিত করা এবং অকল্যাণ প্রতিরোধ করা। মানবতার যাবতীয় কল্যাণ সাধন করা হচ্ছে শরীয়হর প্রধান উদ্দেশ্য। বিশেষভাবে শরীয়াহর উদ্দেশ্যকে নিচের পাঁচটি সাধারণ মূলনীতির আলোকে বর্ণনা করা যায়।

১) দ্বীনের সংরক্ষণ করা

শরীয়াহর উদ্দেশ্য হল যে কোনো পরিস্থিতিতে দ্বীন ইসলামকে সংরক্ষণ ও রক্ষা করা। কেননা, দ্বীন হচ্ছে জীবনের নির্যাস।

২) জীবনের সংরক্ষণ করা

শরীয়াহর অন্যতম একটি উদ্দেশ্য হলো মানবজীবনের নিরাপত্তা বিধান করা। একজন মানুষ যেমন অন্য মানুষকে হত্যা করতে পারে না, তেমনি কোনোভাবে তার ক্ষতিসাধনও করতে পারে না। মানবজীবনকে সামগ্রিকভাবে রক্ষা করাই হলো শরীয়াহর মূল লক্ষ্য।

৩) বংশধারা সংরক্ষণ করা

মানুষের বংশধারা যাতে অব্যাহত ও সুরক্ষিত থাকে তার নিশ্চয়তা বিধান করা শরীয়াহর অন্যতম লক্ষ্য। রুচিসম্মত ও পবিত্র পন্থায় সন্তান-সন্তুতি লাভ করার অধিকার যেমনভাবে মানুষকে দেওয়া হয়েছে তেমনিভাবে বিবাহপূর্ব ও বিবাহপরবর্তী অবৈধ যৌন সম্পর্কও ইসলামে হারাম বা নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

৪) বিবেক বুদ্ধি সংরক্ষণ করা

যে কোনো পরিবেশ ও পরিস্থিতিতে বিবেকবুদ্ধি সংরক্ষণ করা ইসলামী শরীয়াহর অন্যতম লক্ষ্য। বিবেকবুদ্ধি ও মানসিক অবস্থার পরিপূর্ণরূপে সংরক্ষণের জন্য যেকোনো নেশাদ্রব্য নিষিদ্ধ বা হারাম করা হয়েছে।

৫) সম্পদ সংরক্ষণ করা

শরীয়াহর অন্যতম উদ্দেশ্য হলো মানুষের কষ্টার্জিত অর্থ-সম্পদের সংরক্ষণ করা। কুরআনেও এ বিষয়ে জোর তাগিদ প্রদান করা হয়েছে। আল্লাহ বলেন, “তোমরা নিজেদের মধ্যে একে অপরের অর্থ-সম্পদ গ্রাস করো না এবং মানুষের ধন-সম্পত্তির কিয়দাংশ জেনে-শুনে অন্যায়ভাবে গ্রাস করবার উদ্দেশ্যে উহা বিচারকদের কাছে পেশ করো না।” (২:১৮৮)