ইসলামী সাম্রাজ্য দ্বারা সিন্ধু বিজয়ের গল্প

war
Битва при Манцикерте

(প্রথম পর্ব )

সিন্ধু, সিন্ধুস্থান… নামটা শুনলেই যেন হাজার বছর আগের ইতিহাসের ফিরে যেতে ইচ্ছে করে। করবে নাই বা কেন? বর্তমানে পাকিস্তানে অবস্থিত এই দেশটিতে যে সমস্ত গল্প লেখা রয়েছে ইতিহাসের আখরে তা রোমহর্ষক। ইসলাম প্রসারের অনেক আগে থেকেই ভারতের পশ্চিম উপকূল, শ্রীলঙ্কার সঙ্গে আরব সাগরের উপদ্বীপের বাণিজ্য চলত। পশ্চিম এশিয়া থেকে পূর্ব দিকে মৌসুমী বায়ুর সঙ্গে জাহাজগুলো মালাবার ও শ্রীলঙ্কার উপকূলে এসে মসলাপাতির খরিদারি করে আবার পশ্চিম মৌসুমী বায়ুর সঙ্গে আরবীয় উপদ্বিপীয় অঞ্চলে ফিরে যেত। মসলাই ছিল মূলত বাণিজ্যিক পণ্য। পশ্চিম এশিয়া, উত্তর আফ্রিকা, দক্ষিণ ইউরোপ ইত্যাদি অঞ্চলে এই মসলার ছিল প্রবল চাহিদা। উত্তর আফ্রিকা ও পশ্চিম এশিয়াতে মুসলমান শাসন কায়েম হওয়ার পরেও এই বাণিজ্য চলেছে। এই বাণিজ্যের মাধ্যমেই কেরালা ও শ্রীলঙ্কায় ইসলাম ধর্মের সূচনা হয়।

সিন্ধু অঞ্চল তখন প্রবলভাবে কুখ্যাত ছিল জলদস্যুদের জন্য। সমুদ্রপথে বাণিজ্য তখন ছিল বিপজ্জনক, যেকোনও মুহূর্তে জলদস্যুরা জাহাজ দখল করে লুঠপাঠ চালাতো। কখনও জাহাজ শুদ্ধ মানুষকে খুনও করত। এরকমই এক জাহাজে ৭০৭ খ্রিস্টাব্দে আক্রমণ হয়, জাহাজটি এক মুসলমান বণিকের জাহাজ ছিল। শ্রীলঙ্কা থেকে পার্শিয়ান উপসাগরে ফিরছিল। জাহাজে রত্নসামগ্রী লুটে নেওয়ার পর সিন্ধের রাজার আদেশে জলদস্যুরা জাহাজের ক্যাপ্টেন সহ সমস্ত যাত্রীকে সিন্ধে নিয়ে যায়। সেখানে তাদের বন্দি করে রাখা হয়। 

হাজাজ বিন ইউসুফ শাকাফি তখন ইরাকের ঊম্মাইয়াদ শাসক হিসাবে অধিষ্ঠান করছিলেন। তাঁর কাছে খবর যায়। তিনি সিন্ধের রাজা দাহিরের কাছে তৎক্ষণাৎ পত্র পাঠান জাহাজের যাত্রীদের মুক্তির দাবী নিয়ে। তিনি জলদস্যুদের শাস্তির দাবীও করেছিলেন। দাহির প্রবল অহংকারের সঙ্গে সেই পত্র নাকচ করে দেয়। এতে দুই তরফে শুরু হয় দ্বন্দ্ব। হাজাজ বিন ইউসুফ ছিলেন খলিফার প্রতিনিধি, তিনি সেনাপতি উবাইদুল্লাহ বিন বিনহানের তত্ত্বাবধানে সৈন্যবাহিনী পাঠান সিন্ধু দখলের জন্য। দাহিরের কুশলী সেনাদের কাছে সেই বাহিনী পরাজিত হয়। উবাইদুল্লাহ যুদ্ধক্ষেত্রে নিহত হন।

আত্মসম্মানবোধে আহত হয়ে হাজাজ আবার ৭০০০ পদাতিক সৈন্যের এক বাহিনী তৈরি করেন। এই বাহিনীর নেতা হন মুহাম্মদ বিন কাশিম শাকাফি। মাত্র সতেরো বছর বয়সেই তিনি নিপুণ রণকৌশল আয়ত্ব করেছিলেন। তিনি সামুদ্রিক বাহিনী ও পদাতিক বাহিনী নিয়ে সমুদ্র ও বালুচিস্তানের মরুভূমি উভয় স্থান থেকেই আক্রমণ শুরু করেন। 

দাহিরকে পরাস্ত করার মূল উপায় ছিল উন্নত অস্ত্র ব্যবহার করা। মুসলমান শাসকরা ততদিনে উন্নত অস্ত্র বানানো শুরু করে দিয়েছে। পারস্য, বাইজান্টিয়াম ও মধ্য এশিয়ার যুদ্ধ থেকে প্রাপ্ত অভিজ্ঞতাই তাদের উন্নত অস্ত্র গঠনে সাহায্য করেছে। 

একটি অস্ত্রের নাম ছিল মিঞ্জানিক, এটি একটি বড় আকারের গুলতি যা দিয়ে শত্রুদের উদেশ্যে পাথর ছোঁড়া হত। গুলতিটি মূলত চীনদেশ থেকে আমদানি হলেও ইসলামের কারিগররা সেটিকে আরও উন্নত করে তুলেছিল।

২০০ পাউন্ডের বেশি বড় পাথর ছুঁড়তে পারত মিঞ্জানিক। পাথর ছুঁড়ে দুর্গের দেওয়াল ভেঙ্গে ফেলা হত।

পঞ্জগোরে ও আরমাবেলে আক্রমণ করার পর মুহাম্মদ বিন কাশিম দেবল বন্দরের দিয়ে আগুয়ান হয়। এটি বর্তমানের করাচি শহরের কাছে অবস্থিত। দেবলের রাজা শহরের দরজা বন্ধ করে আত্মগোপন করেন। কিন্তু এখানেও উন্নত অস্ত্রের মাধ্যমে শহরটিকে ধূলিসাৎ করে শহরের মুসলমান বন্দিদের মুক্তি দেয় কাশিম। 

দেবলের পর উত্তর ও পূর্ব অঞ্চলে কাশিম আক্রমণ চালায়। সমগ্র বালুচিস্তান ও সিন্ধ অঞ্চল তাঁর দখলে আসে, এর মধ্যে সিস্তান, বাহরাজ, কচ্ছ, অরোরে, কাইরেজ ও জিয়োরও ছিল। 

জিয়োরের যুদ্ধে রাজা দাহির নিহত হয়, তাঁর এক ছেলে জয় সিংহ ব্রহনবাদের যুদ্ধে কাশিমকে পরাস্ত করার চেষ্টা করেন। কিন্তু শেষে তিনি নিজেই পরাজিত হন।
এরপর কাশিম যাত্রা করেন মূলতানের দিকে, পশ্চিম পাঞ্জাবের মূলতান ছিল তাঁর লক্ষ্য। 

ভারতীয়রা কুশলী যুদ্ধের আয়োজন করলেও এখানেও মিঞ্জানিকের পাথরের ঘায়ে তারা হার স্বীকার করে নেয়। ৭১৩ খ্রিস্টাব্দে মূলতানও আরব সাম্রাজ্যের অন্তর্গত হয়।

এই পুরো অভিযানটি খলিফা ওমন ইবন আল খাত্তাবের শাসনকালে শুরু হয় এবং শেষ হয় প্রথম ওয়ালিদের রাজত্বকালে। 

(চলবে)