ইসলামের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শহর বেথলেহেম

Islamic Mosque Tower Church of the Nativity Bethlehem West Bank Palestine. Chruch located above cave/grotto where Jesus was born.
Islamic Mosque Tower Church of the Nativity Bethlehem West Bank Palestine. Chruch located above cave/grotto where Jesus was born. Photo 88934559 © - Dreamstime.com

আল্লা’তালার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দূত হলেন ঈসা (আঃ), আর যে শহরে এই ঈশ্বরপ্রেরিত দূতের জন্ম সেই শহরের নাম বেথলেহেম। আরবীয় শব্দ ‘বায়েত লহম’ থেকে শহরের নামের উৎপত্তি, ‘বায়েত লহম’-এর অর্থ মাংসের শহর। জেরুজালেমের প্রায় দশ কিলোমিটার দক্ষিণে প্যালেস্টাইনের পশ্চিম অংশে শহরটির অবস্থান। যদিও বেথলেহেম শহরের ঠিক কোথায় মহান ঈসা (আঃ) -এর জন্ম হয়েছিল তা জানা যায় না, তবুও কুরআনে মহামান্য আল্লা’তালা যে বাণী দিয়েছেন তাতে খানিক আঁচ করা যায়।

ঈসা (আঃ) -এর জন্ম

তারপর মারিয়াম (আঃ) -এর গর্ভে সন্তান ধারণ করল এবং তা নিয়ে দূরবর্তী একটি স্থানে চলে গেল। সন্তান প্রসবের বেদনা তাকে এক খেজুর বৃক্ষতলের দিকে তাড়িত করল। সে বলে উঠল, ‘হায়! এর আগেই যদি আমি মরে যেতাম আর (মানুষের) স্মৃতি থেকে পুরোপুরি মুছে যেতাম!’

তখন নিম্নদিক থেকে তাকে ডাক দেয়া হল, ‘তুমি দুঃখ করো না, তোমার প্রতিপালক তোমার পাদদেশ দিয়ে এক নির্ঝরিণী প্রবাহিত করে দিয়েছেন। আর তুমি খেজুর গাছের কান্ড ধরে তোমার দিকে নাড়া দাও, তাহলে তা তোমার উপর তাজা-পাকা খেজুর ফেলবে। অতঃপর তুমি খাও, পান কর এবং চোখ জুড়াও। আর যদি তুমি কোন লোককে দেখতে পাও তাহলে বলে দিও, ‘আমি পরম করুণাময়ের জন্য চুপ থাকার মানত করেছি। অতএব আজ আমি কোন মানুষের সাথে কিছুতেই কথা বলব না’। অতঃপর সে তার সন্তানকে বয়ে নিয়ে তার সম্প্রদায়ের কাছে আসল। তারা বলল, ‘হে মারইয়াম! তুমি তো এক অদ্ভুত জিনিস নিয়ে এসেছ!” [কুর আন ১৯ঃ২৩]

খলিফা উমর (রাঃ)-এর শাসনকাল

প্যালেস্টাইনের মাটিতে ইসলামের আবির্ভাব হয় ৬৩৭ সনে, যোগ্য শাসক খলিফা উমর ইবদুন আল খাত্তাব (রাঃ)-এর শাসনকালে এই দেশের মানুষ নিজেদের জীবন, সংস্কৃতি ও বিশ্বাসে ইসলামকে স্থান দেয়। উমর ইবদুন আল খাত্তাবের নেতৃত্ব্বেই মুসলমানেরা প্রথমে বেথলেহম তারপর জেরুজালেমে প্রবেশ করে। তারপর প্যালেস্টাইনের মানুষ তাদের সাদরে আমন্ত্রণ জানায়, শুধু তাই নয় , শহরের গোষ্ঠীপতি নিজে উমরকে অনুরোধ করেন চার্চগুলোরও দেখাশোনা ও রক্ষা করতে। উমর বিন আল খাত্তাব (রাঃ) জেরুজালেমের চার্চ অফ নেটিভিটি ও পবিত্র সেপালকার গির্জা পরিদর্শন করেন। এর মাধ্যমে তাঁর উদার মনোভাবই প্রকাশ পায়।

ঐতিহাসিক ইবন খালদুন বলেছেন,

‘উমর যখন পবিত্র সেপালকরের গির্জা পরিদর্শনে এলেন তখন তিনি কুলপতির কাছে প্রার্থনা করার জন্য একটি স্থানের খোঁজ করলেন। কুলপতি তখন তাকে গির্জাতে প্রার্থনা করার প্রস্তাব দিলে উমর তাতে একেবারেই অসম্মত হলেন। তিনি জানালেন, ‘আমি যদি গির্জায় প্রার্থনা করি তাহলে আমাকে বিশ্বাস করে যারা অনুসরণ করছে তাঁদের বিশ্বাসে আঘাত লাগবে। অতঃপর তিনি গির্জার ঠিক অপরদিকে হাঁটু মুড়ে বসে আল্লা’তালাকে স্মরণ করেন ও প্রার্থণা সমাপন করেন। একই ঘটনা জেরুজালেমের নেটিভিটি গির্জাতেও ঘটে, সেখানেও উমর গির্জার অপরদিকে একটি সিঁড়ির উপর প্রার্থনা সম্পন্ন করেন।’

বর্তমানে এই দুটি স্থান উমর মসজিদ নামে পরিচিত। স্থানীয় মুসলমানদের দাবী, এই মসজিদগুলি আসলে উমর (রাঃ) -এর ধর্ম সহিষ্ণুতার প্রতীক। বেথলেহমের মসজিদর সামনে দুটি বৃহৎ আকারের খেজুর গাছ মহান ঈসা (আঃ) -এর জনমাহাত্ম্যকেই বর্ণনা করে। ঈসা (আঃ) -এর জন্মের  প্রতীক হিসাবেই ঐ গাছ দুটি প্রোথিত।

৬৩৭ সনেই বেথলেহম ‘জন্দ ফিলাস্তিন’-এর অংশ হয়ে ওঠে। উম্মাইয়াদ ও আব্বাসাইদ খলিফার সামরিক কেন্দ্রর মধ্যে অন্যতম হয়ে ওঠে এই শহর। তবে এই শহরের শাসক পরিবর্তিত হয়েছে বারবার। ১০৯৯ সনে শাসক ফাতিমিদ আল হাকিম বি-আমির আল্লাহর শাসনকালে প্রস্তাব দেওয়া হয় নেটিভিটির গির্জাকে ধ্বংস করে ফেলা হবে। যদিও বাস্তবে তা কিছুতেই কার্যকরী করতে দেওয়া হয় না। এই ১০৯৯ সনেই ক্রুসেডার বা ধর্ম যোদ্ধারা বেথলেহম দখল করে। তারা শহরের গ্রীক অর্থোডক্স যাজক সম্প্রদায়কে পদানত করে, মুসলমানদেরও হেনস্থার শেষ থাকে না। তবে, এই বিপর্যয় বেশিদিন থাকেনি, ১১৮৭ সনে মিশর ও সিরিয়ার সুলতান ধর্মযোদ্ধাদের কাছ থেকে বেথলেহম আবার দখল করে নেয়। শেষ পর্যন্ত ১৫১৭ সনে অটোমান তূর্কিরা শহরের দখল নেয়। যদিও তাদের শাসনকাল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পর্যন্ত কায়েম ছিল।

আধুনিক সময়ের ইতিহাস

১৯২০ থেকে ১৯৪৮ পর্যন্ত ব্রিটিশদের দখলে ছিল বেথলেহম, তারপর তা প্যালেস্টাইনের দখলীকৃত অংশের মধ্যে চল আসে।

২০০২ সালে ইজরায়েল ও প্যালেস্টাইনের সংঘর্ষে প্রভূত ক্ষয়ক্ষতি হয় নেটিভিটির চার্চের, ইজরায়েলের ডিফেন্স ফোর্সের হাতে প্রচুর প্যালেস্টাইনের মানুষ নিহত হন।

উপসংহারে এটাই বলা যায়, বেথলেহমের নাম যতই খ্রিস্টানদের সঙ্গে যুক্ত করা হোক না কেন, এটা কখনই ভুলে যাওয়া উচিৎ না যে ইসলামের অন্যতম কেন্দ্র হিসেবে এই শহরের বেশ গভীর গুরুত্ব রয়েছে। জেরুজালেমের সঙ্গে সঙ্গে বেহলেহমও ইসলামের সহনশীলতা, ধৈর্য ও মহানুভবতার ইতিহাসকে তুলে ধরে। এই ইতিহাস খলিফা উমর (রাঃ) -এর চুক্তিতেই স্পষ্ট…

‘ মহান, সহনশীল আল্লাহর নামে আমি এই শপথ গ্রহণ করছি যে আল্লাহর সেবক এই উমর খাত্তাব প্যালেস্টাইনের জনসাধারণের সমস্ত সুখ সুবিধার দিকে সম্পূর্ণ নজর দেবে। তাঁদের বাসস্থান, জীবন যাপন , ধর্ম বিশ্বাস সব বিপন্মুক্ত থাকবে। তাঁদের বলপূর্বক ইসলাম ধর্ম গ্রহণে বাধ্য করা হবে না।’