ইসলামের আলোকে স্বপ্ন কয় প্রকার এবং তার ব্যাখ্যা কী

ID 55649080 © Leo Lintang | Dreamstime.com
ID 55649080 © Leo Lintang | Dreamstime.com

প্রতিটি মানুষ ঘুমের ঘোরে স্বপ্ন দেখে। স্বপ্ন দেখা একটা স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। মানুষের যেমন বৈচিত্র্য রয়েছে, তেমনি মানুষের দেখা স্বপ্নেও রয়েছে ভিন্নতা। স্বপ্ন ঘুমের ঘোরে দর্শিত চিন্তা-ভাবনার নাম। অন্যদিকে এই স্বপ্নই হচ্ছে মানুষের কাক্সিক্ষত ভবিষ্যৎ। স্বপ্নকে আরবি ভাষায় ‘রুইয়া’ এবং ফার্সিতে ‘খাব’ বলা হয়। মানুষ ভালো স্বপ্ন যেমন দেখে, তেমন দেখতে পারে ভয়ঙ্কর বা দুঃস্বপ্ন। দারুণ স্বপ্ন মানুষকে আনন্দ দিলেও কিছু স্বপ্ন মানুষকে ভাবাতুর করে রাখে। চিন্তা-ভাবনা ও অস্থিরতায় ফেলে দেয়।

ধর্মীয় গবেষক এবং দার্শনিকদের মাঝে স্বপ্নের কোন বাস্তবতা আছে কিনা এই ব্যাপারে কিছু মতপার্থক্য রয়েছে।  দার্শনিকদের মতে মানুষ যা  চিন্তা করে ভাবে এর প্রতিচ্ছবি তার ঘুমের ভেতরে ফুটে ওঠে। তাদের ধারণা মতে বাস্তবতার সাথে কোন মিল নেই।  তবে ইসলামিক জ্ঞান সম্পন্ন জ্ঞানীদের এ ব্যাপারে দ্বিমত রয়েছে।  তাদের বক্তব্য হলো,  সব স্বপ্নই মানুষের ধারণা প্রসূত নয়।  অনেক স্বপ্নই রয়েছে যা দিক নির্দেশক , অর্থবহ।

হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত রাসুল (সা.) ইরশাদ করেছেন স্বপ্ন তিন প্রকার। ১. রুইয়ায়ে সালেহাহ তথা ভালো স্বপ্ন। আল্লাহ মহানের পক্ষ থেকে কোনো সুসংবাদ হিসেবে যা বিবেচ্য। ২. রুইয়ায়ে শায়তানি তথা শয়তান কর্তৃক প্ররোচনামূলক প্রদর্শিত স্বপ্ন। ৩. রুইয়ায়ে নাফসানি তথা মানুষের চিন্তা-চেতনার কল্পচিত্র। এরপর রাসুল (সা.) বলেছেন, যদি কেউ অপছন্দনীয় তথা ভয় বা খারাপ কোনো স্বপ্ন দেখে তাহলে সে যেন তাড়াতাড়ি অজু করে নামাজে দাঁড়িয়ে যায় এবং দর্শিত স্বপ্নের ব্যাপারে অনভিজ্ঞ কাউকে কিছু না বলে। [আবু দাউদ] হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে এও বর্ণিত আছে যে, রাসুল (সা.) ফজরের নামাজের পর সাহাবিদের জিজ্ঞেস করতেন তোমাদের মধ্যে কেউ কোনো স্বপ্ন দেখেছ কি? অতঃপর রাসুল (সা.) নিজে এগুলোর ব্যাখ্যা করতেন।

মহানবী (সাঃ) এর বাণীর আলোকে আমরা এ বিশ্বাস স্থাপন করতে পারি যে,  ভালো স্বপ্ন মহান আল্লাহ তাঁর প্রিয় অনেক বান্দাদের দেখান।  আবার কিছু কিছু স্বপ্ন শয়তানের প্ররোচনা হয়ে থাকে।  কিছু স্বপ্ন মানুষের চিন্তা ও  ধারণার  ফসল। একটি কথা উল্লেখ্য যে, সব নবি-রাসুলের স্বপ্ন অহি। এ জন্যই স্বপ্নযোগে আদিষ্ট হয়ে হজরত ইব্রাহিম (আ.) এর পুত্র কোরবানিতে প্রস্তুতি জরুরিও ছিল আবার সঠিকও ছিল। অন্য কোনো ব্যক্তি এ জাতীয় কোনো স্বপ্ন দেখলে তার জন্য এভাবে কোরবানি করতে উদ্যত হওয়া সম্পূর্ণ হারাম। তবে স্বপ্নের ব্যাপারে সবচেয়ে গুরুত্বপূণ কথা হলো স্বপ্ন কাউকে না বলা। স্বপ্ন ব্যাখ্যা খুবই কঠিন এবং জ্ঞানতাত্ত্বিক একটি বিষয়। যে কেউ ইচ্ছা করলেই এই কাজটি করতে পারেন না। তাই এ ব্যাপারে সতর্ক থাকা উচিত।

কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, “যখন ইউসুফ তার পিতাকে বলল, হে আমার পিতা! আমি (স্বপ্নে) দেখেছি এগারোটি তারা, চাঁদ ও সূর্য, আমার প্রতি সেজদাবনত অবস্থায় রয়েছে। (এ কথা শুনে হযরত ইউসুফ (আ.)-এর পিতা বলল) হে আমার স্নেহের পুত্র, তুমি তোমার (এ) স্বপ্নের কথা তোমার ভাইদের কাছে বলে দিয়ো না, তারা তোমার বিরুদ্ধে অতঃপর ষড়যন্ত্র আঁটতে থাকবে”। (সূরা ইউসূফ : ৪, ৫)। হযরত ইউসুফ (আ.) তার স্বপ্নের কথা ভাইদের নিকট প্রকাশ করে দিয়েছিলেন। হযরত ইউসুফ (আ.)-এর ভাইয়েরা গুরুত্বপূর্ণ এ স্বপ্নের কথা জানতে পেরে পরবর্তীতে তাকে মেরে ফেলার ষড়যন্ত্র করেছিল এবং ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে হযরত ইউসুফ (আ.)-কে গভীর কুয়াতে নিক্ষেপ করেছিল। একটি পর্যায়ে গিয়ে হযরত ইউসুফ (আ.)-এর স্বপ্ন সত্যে পরিণত হয়েছিল। বহুদিন পর্যন্ত হযরত ইউসুফ (আ.)-এর সাথে তার পরিবারের কোনো যোগাযোগ খোঁজখবর ছিল না। যখন হযরত ইউসুফ (আ.)-এর পিতা-মাতা ও ভাইদের সাথে দেখা হয়েছিল। তারা হযরত ইউসুফ (আ.)-কে দেখা মাত্র সেজদায় লুটিয়ে পড়েছিলেন। কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, “তার পিতামাতা এবং ওরা সকলে (হযরত ইউসুফ (আ.)-এর ভাইগণ) তার প্রতি (দরবারের নিয়মানুযায়ী সম্মানের) সেজদা করল (হযরত ইউসুফ (আ.) তার সে স্বপ্নের কথা মনে হলো), সে বলল, হে আমার পিতা, এ হচ্ছে আমার পূর্বেকার সে স্বপ্নের ব্যাখ্যা (আজ) আমার প্রভু যা সত্যে পরিণত করেছেন”। (সূরা ইউসূফ : ১০০)।

বুখারি ও মুসলিম শরিফে হযরত আবু হোরায়রা (রা.) হতে বর্ণিত হয়েছে, হযরত রাসূল (সা.) ইরশাদ করেছেন, যে আমাকে স্বপ্নে দেখবে, সে শীঘ্রই জাগ্রত অবস্থায়ও আমাকে দেখবে। কারণ শয়তান আমার আকৃতি ধারণ করতে পারবে না। বুখারি শরিফে হযরত আবু কাতাদাহ (রা.) বর্ণিত হয়েছে, হযরত রাসুল (সা.) ইরশাদ করেছেন, উত্তম স্বপ্ন আল্লাহর পক্ষ হতে, আর খারাপ স্বপ্ন শয়তানের পক্ষ হতে, সুতরাং তোমাদের মধ্যে কেউ উত্তম স্বপ্ন দেখলে সে যেন তা শুধু এরূপ লোকের নিকট প্রকাশ করে থাকে যে তাকে আন্তরিকভাবে ভালোবাসে। আর যদি কেউ তার অপছন্দনীয় স্বপ্ন দেখে তাহলে সে যেন তার ক্ষতি এবং শয়তানের ক্ষতি হতে আল্লাহর নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করে এবং বাম দিকে তিনবার থুথু নিক্ষেপ করে। আর স্বপ্নটি যেন কারো নিকট প্রকাশ না করে। তাহলে তাতে তার আর কোনো অনিষ্ট ঘটবে না। তিরমিজি শরিফে হযরত আবু রাযীন উকাইলী (রা.) বর্ণিত হয়েছে, হযরত রাসূল (সা.) ইরশাদ করেছেন, মুমিনের স্বপ্ন নবুয়তের ছিচল্লিশ ভাগের একভাগ। তোমরা একান্ত বন্ধু ও বিশেষ জ্ঞানী লোক ছাড়া স্বপ্ন প্রকাশ করবে না।

আল্লাহ তায়ালা আমাদের সবাইকে হেফাজত করুন এবং দ্বীনের ওপর শুদ্ধভাবে আমল করার তাওফিক দান করুন। আমিন।