ইসলামের জ্ঞান চর্চার অন্যতম পীঠস্থান… টিমবাকটু

Tuareg posing for a portrait in camp near Timbuktu

সময়টা ষোড়শ শতক, পশ্চিম আফ্রিকার এক শহর, যেখানে শতাধিক কালো চামড়ার মানুষ বিজ্ঞান, সাহিত্য, চিকিৎসা বিদ্যায় পারদর্শী হয়ে উঠেছিল। তখনকার নিরিখে এই শহর হয়ে উঠেছিল মরুভূমির মধ্যে এক রূপকথার শহর। আফ্রিকার অন্যান্য শহরের মানুষের কাছে এই শহর, অর্থাৎ টিমবাকটু ছিল জ্ঞানতৃষার মরুদ্যানসম। শহরে বইপত্র থেকে আরম্ভ করে স্বর্ণ রৌপ্য দ্রব্যের কোনও অভাব ছিল না। শহরের মানুষ যেমন জ্ঞান ও মননে ছিলেন সম্পদশালী, তেমন বিত্তেও ছিলেন ধনী। মরুভূমির মাঝের এই রহস্যময় শহর পৃথিবীর নানা স্থান থেকে ভ্রামণিকদের আকৃষ্ট করত।

শিক্ষার স্বর্ণযুগ

তৎকালীন পণ্ডিতদের মতে, টিমবাকটু আফ্রিকার সুপ্রাচীন মহান ঐতিহ্য ও আম্ফ্রিকার শিক্ষার এককালীন স্বর্ণযুগকে তুলে ধরে।

ইউরোপীয়দের কাছে টিমবাকটু ‘এল ডোরাডো’র মতো গল্পকথা। যেহেতু আফ্রিকা মহাদেশ ও সাহারা মরুভূমি ইউরোপীয় ও মার্কিন সভ্যতার কাছে এখনও অনেকটাই রহস্যময়, তাই অনেক সাহেব পণ্ডিত বিশ্বাস করতে চান না যে টিমবাকটুতে এককালে বিখ্যাত একও বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপিত হয়েছিল। এই শহরের শিক্ষিত ও পণ্ডিতরা আত্মিক, মানসিক ও জ্ঞান চর্চার উন্নতির শিখরে নিয়ে গিয়েছিলেন মানুষকে। নাইজার নদী থেকে ভূমধ্যসাগর , অতলান্তিক মহাসাগর থেকে আরবীয় উপদ্বীপ পর্যন্ত ছিল টিমবাকটুর বাণিজ্য পথ। উট ও সোনার বিনিময়ে বস্ত্র, লবণ ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় দ্রব্য খরিদ করত স্থানীয় মানুষেরা।

কিন্তু টিমবাকটুর উত্থান ও উন্নতি কীভাবে হয়েছিল? সাহারার তপ্ত বালুকারাশির মধ্যে কীভাবে গড়ে উঠেছিল মণিমুক্তখচিত এই শহর?

টিমবাকটুর সূচনাঃ

টিমবাকটু স্থাপন করছিল সাহারার বিখ্যাত তুয়ারেগ উপজাতি। একাদশ শতকে বুকটু নামক এক তুয়ারেগ রমণী নাইজার নদীর প্লাবনভূমিতে এক জনপদ গড়ে তোলেন। সাহারার কঠিন পরিবেশ ও জলশূন্য পরিবেশে বুকটুর এই জনপদেই ছিল মিষ্টি জলের কুয়ো ও জলাশয়। এই জনপদেই তুয়ারগরা গবাদি পশুদের চড়াত, জল সংগ্রহ করত, সাহারার অন্যান্য অঞ্চলে বাণিজ্য করতে যাওয়ার সময় বুকটু তাঁদের জিনিসপত্রের হেফাজত করত। এই ছোট্ট জনপদ তুয়ারেগদের কাছে পরিচিত ছিল ‘টিন-বুকটু’ নামে, যার অর্থ বুকটুর কুয়ো। এই টিন বুকটুই কালক্রমে টিমবাকটু নামক রাজসিক শহরে পরিণত হয়।

শুরু থেকেই এই শহরের অবস্থান সুবিধাজনক। সাহারার দক্ষিণাংশ দিয়ে প্রবাহিত উত্তরবাহিনী নাইজার নদী, তুরায়েগ, আরব, ওয়াংরা, সোনঘাই, সোনিনকে প্রভৃতি উপজাতিদের মিলনস্থল ইত্যাদি কারণে ব্যবসাবাণিজ্যের অন্যতম কেন্দ্র হয়ে উঠেছিল এই শহর। মালীর বৌরে ও বামবুক খনি থেকে আহরিত সোনার মাধ্যমেই ব্যবসা বাণিজ্য হত। এই শহরে প্রথম স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করে মার্কা, ওয়াংগারা, সারাকোল ও মান্দিনকার ব্যবসায়ীরা। তাঁদের ও তুয়ারেগদের মধ্যে সুন্দর আদান প্রদানের সম্পর্ক শুরু হয়। মাটির বাড়ি ও মসজিদ স্থাপনের পর আফ্রিকার বিভিন্ন প্রদেশ থেকে মুসলমান উলেমাদের পা পড়ে এই শহরে।

মানসা মুসার প্রভাবঃ

১৩২৫ সনে মালি ও তৎসংলগ্ন অঞ্চলের শাসকে মানসা মুসা নিজের মক্কা যাত্রা থেকে ফিরছিলেন। তাঁর সঙ্গে ছিল প্রায় ৬০০০০ জন অনুগামী, ৮০০০ সৈনিক, ১৫০০০ উট এবং প্রায় ১৮০,০০০ কেজি সোনা। কথিত আছে, মুসার কাছে এত সোনা ছিল যে ফেরার পথে যে যে শহরে তিনি অবস্থান করছিলেন সেই সেই শহরের ভাগ্য ফিরে যাচ্ছিল।

টিমবাকটুতে এসে তিনি তার প্রধান স্থপতি আন্দালুসিয়ান আবু ইশক আস সাহেলিকে আদেশ দেন পশ্চিম আফ্রিকার সর্ব বৃহৎ উপাসনা গৃহ তৈরি করতে। মুসার আদেশে গড়ে ওঠে জিঙারি বার বা আল মসজিদ আল কবীর, যা এখনও টিমবাকটুর ঐতুহ্যময় ইতিহাসের সাক্ষী।

ইসলামের চোখে টিমবাকটু শহরঃ

মানসা মুসার হাত ধরেই টিমবাকটুর নাম সারা বিশ্বে অল্প অল্প করে ছড়িয়ে পড়তে থাকে। দামী, বিখ্যাত ও সচরাচর পাওয়া যায় না এমন ইসলাম সাহিত্য ও সংস্কৃতির বই ছাপা হতে শুরু করে এই শহরে। ইবন বতুতা, হাসান আল ওয়াজান প্রমুখ বিখ্যাত ভ্রামণিকরা এই শহরের উন্নত সংস্কৃতির দর্শন করতে আসেন। হাসান আল ওয়াজান নিজের ভ্রমণকাহিনীতে লিখেছিলেন, ‘টিমবাকটুই একমাত্র শহরে, যে শহরে বইয়ের মূল্য অন্যান্য দ্রব্যের থেকে বেশি।’

আফ্রিকার মুসলমানদের মক্কা যাওয়ার পথের বিশ্রাম নেওয়ার স্থান ছিল এই শহর, ফলে নানা কিসিমের লোক, অনেক পণ্ডিত ব্যক্তিরা এই শহরকে সমৃদ্ধ করেছে।

শিক্ষাগত অবস্থানঃ প্রায় ১৫০ টি মাদ্রাসা, সাংকোরে মসজিদে গড়ে ওঠা একটি বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে শিক্ষার ঔজ্জ্বল্যে ঝলমল করত এই শহর। বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রায় ২৫০০০ ছাত্র ছিল। তাফসির, হাদিস, ফিখ, উসুল, আকিদাহ, মিউতুন, নাওয়াহ, বালাঘ, মানতিক পড়ানো হত এই বিশ্ববিদ্যালয়ে। প্রথম কিছু বছর সবকিছুই একটু একটু করে শিখিয়ে তারপর ছাত্রর পছন্দ ও দক্ষতা অনুসারে এক এক জন উলেমার কাছে তাঁদের বিশেষ কোনও বিষয়ে শিক্ষালাভ শুরু হত।

শিক্ষক ও ছাত্র এক পরিবার হয়ে যেত এর মাধ্যমে, এই মুলাজামাহ পদ্ধতির মাধ্যমেই টিমবাকটুর বহু পণ্ডিত উপকৃত হয়েছে।

টিমবাকটুর মানুষ এর সঙ্গে সঙ্গে আফ্রিকা মহাদেশের অন্যান্য মানুষের উন্নতিসাধনের কাজও করত।

১৭ শতক ও ১৮ শতকের ইসলামিক ইতিহাস ও তারিখ গুলোতে টিমবাকটুর ঐতিহ্যের কথা পাওয়া যায়, বিশেষ করে ১৬৫৩ এর তারিখ এ সুদানে টিমবাকটুর কথা বিশেষ ভাবে উল্লিখিত আছে।

যে সমস্ত ইউরোপীয় স্কলারা মনে করেন আফ্রিকা ইতিহাস সেরকম গরিমাময় নয়, টিমবাকটু তাঁদের কাছে এক জ্বলন্ত প্রমাণ। সামাজিক, সাংস্কৃতিক, মানসিক, অর্থনৈতিক সবকিছুর উন্নতির শিখরে ছিল টিমবাকটু। ইতিহাস তার প্রমাণ বারবার দিয়ে থাকে।

Sankore mosque in Timbuctou, Mali