ইসলামের দৃষ্টিতে জীবনের মূল্য

পরিবেশবিদরা পৃথিবীতে জীবনের উত্স হিসাবে পানির গুরুত্বকে স্বীকার করে। আল্লাহও কুরআনে সকল জীবের সৃষ্টি পানি থেকে সেটা উল্লেখ করেছেনঃ

“কাফেররা কি ভেবে দেখে না যে, আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীর মুখ বন্ধ ছিল, অতঃপর আমি উভয়কে খুলে দিলাম এবং প্রাণবন্ত সবকিছু আমি পানি থেকে সৃষ্টি করলাম। এরপরও কি তারা বিশ্বাস স্থাপন করবে না?” (আল কুরআন-২১:৩০)

আল্লাহ কুরআনে আরও বলেনঃ

“আল্লাহ আকাশ থেকে পানি বর্ষণ করেছেন, তা দ্বারা যমীনকে তার মৃত্যুর পর পুনর্জীবিত করেছেন। নিশ্চয় এতে তাদের জন্যে নিদর্শন রয়েছে, যারা শ্রবণ করে।” (আল কুরআন-১৬:৬৫)

মুহাম্মদ মুস্তফা (সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম)- পরিবেশের পথিকৃৎ

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদেরকে শিখিয়েছেন যে, “যদি কোনো মুসলমান একটি বৃক্ষ রোপণ করে অথবা কোনো শস্য উৎপাদন করে এবং তা থেকে কোনো মানুষ কিংবা পাখি অথবা পশু ভক্ষণ করে, তবে তা উৎপাদনকারীর জন্য সদকা (দান) স্বরূপ গণ্য হবে।” অন্যদিকে তিনি এটিও শিখিয়েছেন যে, অনর্থক কোনো গাছ কেটে ফেলা বা গাছের ক্ষতি করা গুরুতর পর্যায়ের গুনাহ।

আধুনিক বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি ও প্রযুক্তির যুগে আমরা বুঝে না বুঝে অনেক প্রাণী ও জীবকেই ক্ষতির মুখে ঠেলে দিচ্ছি। এমন কিছু পদক্ষেপ নিচ্ছি যা পরিবেশকে ক্ষতি করছে। কিন্তু ইসলামী শিক্ষা বিজ্ঞানের প্রয়োজনীয়তাকে স্বীকার করলেও এই ধরণের ক্ষতির পক্ষপাতি কখনই না। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি যেন সর্বদা পরিবেশ বান্ধব হয় এটাই মুসলিম ও ইসলামের একমাত্র চাহিদা।

মানবজীবন রক্ষা করা

ইসলামের দৃষ্টিতে অপর কোনো মানুষকে হত্যা করা যেমন জঘন্য অপরাধ তেমনি আত্মহত্যা করাও জঘন্য গুনাহ। কারণ জীবন আল্লাহর পক্ষ থেকে আমাদের উপর আমানত স্বরূপ। এর যথেচ্ছা ব্যবহারের অনুমতি আল্লাহ আমাদেরকে দেননি।

রাসূল সাল্লালাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লামের শিক্ষা অনুযায়ী ইসলাম আমাদের উপর ৫টি জিনিসের নিরাপত্তার দায়িত্ব দিয়েছে। সেগুলি হলঃ

১- ধর্ম

২- জীবন

৩- সন্তান বা পরিবার

৪- বুদ্ধি বা মন

৫- সম্পত্তি বা সম্পদ

কেউ ভাবতে পারেন যে জীবনকে ধর্মের পরে দ্বিতীয়তে কেন উল্লেখ করা হল। এর উত্তরে বলা যেতে পারে যে, জীবনই হল সেই উপাদান যেটি টিকে থাকলে আমরা আল্লাহর ইবাদত করতে পারব।

মানব জীবনের পবিত্রতা

জীবনের মূল্য সম্পর্কে গুরুত্বারোপ করে আল্লাহ কুরআনে বলেন, “এ কারণেই আমি বনী-ইসলাঈলের প্রতি লিখে দিয়েছি যে, যে কেউ প্রাণের বিনিময়ে প্রাণ অথবা পৃথিবীতে অনর্থ সৃষ্টি করা ছাড়া কাউকে হত্যা করে সে যেন সব মানুষকেই হত্যা করে। এবং যে কারও জীবন রক্ষা করে, সে যেন সবার জীবন রক্ষা করে। তাদের কাছে আমার পয়গম্বরগণ প্রকাশ্য নিদর্শনাবলী নিয়ে এসেছেন। বস্তুতঃ এরপরও তাদের অনেক লোক পৃথিবীতে সীমাতিক্রম করে।” (আল কুরআন-৫:৩২)

লক্ষ্য করুন! একজন মানুষকে হত্যা করা সমগ্র মানবজতিকে হত্যা করার সমতুল্য আর একজনের জীবন রক্ষা করা সমগ্র মানবজাতিকে রক্ষা করার সমতুল্য বলে আল্লাহ ঘোষণা দিয়েছেন। এ থেকেই অনুমান করা যায় যে, জীবন কতটা পবিত্র।

প্রাচীনকালে পৌত্তলিক আরবদের মধ্যে নবজাতক মেয়েদেরকে জীবিত কবর দেওয়ার ভয়াবহ রীতি প্রচলিত ছিল। তবে, আজ এই প্রথাটি শিশুদের জন্মের আগেই তাদেরকে হত্যা করার জন্য আরও বিকশিত হয়েছে।

কুরআনে আল্লাহ তা’আলা এই ঘৃণ্যকর্মের সমালোচনা করে আখিরাতে এর ভয়াবহ শাস্তির কথা উল্লেখ করে বলছেন, “যখন জীবন্ত পুঁতে-ফেলা কন্যা-শিশুকে জিজ্ঞেস করা হবে কোন্ অপরাধে তাকে হত্যা করা হয়েছে?” (আল কুরআন-৮২:৮-৯)

প্রকৃতপক্ষে, হত্যাকারীর মৃত্যুদণ্ড নির্ধারণের মাধ্যমে, ইসলামী আইন জীবন রক্ষার ব্যবস্থা করে। তবুও, প্রক্রিয়াধীন আইন ব্যতীত অন্য কারও প্রাণ নেওয়ার অধিকার ইসলাম দেয়নি। তদুপরি, এটি ইসলামী আইনের একটি অনন্য বৈশিষ্ট্য যে, পরিবারের পক্ষ থেকে খুনীকে ক্ষমা করার ব্যবস্থাও রয়েছে।

পরিবার সুরক্ষা

ইসলামী আইনের তৃতীয় লক্ষ্য বংশ বা পরিবারের সুরক্ষা। ইসলাম বিপরীত লিঙ্গের সাথে মুক্ত মিশ্রণকে কঠোরভাবে নিষেধ করেছে। এ কারণে ইসলামে বিবাহের গুরুত্ব অপরিসীম।

ইসলাম মানুষের যৌন অনুপ্রেরণাকে নোংরা হিসেবে নয়, বরং প্রাকৃতিক ও সুন্দর হিসেবে দেখে। এজন্য ইসলাম বিবাহের মাধ্যমে এ জাতীয় আবেগকে নিয়ন্ত্রণ করেছে।

এজন্য অবৈধ যৌন সম্পর্ক রাখা, যা প্রায়শই অযাচিত গর্ভাবস্থা এবং ফলস্বরূপ শিশু হত্যার দিকে পরিচালিত করে, এটি ইসলামের দৃষ্টিকোণ থেকে সবচেয়ে জঘন্য একটি কাজ।

এছাড়া পারিবারিক ব্যবস্থা যদি ভেঙে যায় তবে শিশুরা অনৈতিক কাজে জড়িয়ে পড়বে, যার দরুণ সমাজে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হবে। এ কারণে ইসলাম পারিবারিক বন্ধনকে মজবুত করতে এত গুরুত্বারোপ করে।