ইসলামের দৃষ্টিতে ধনী হওয়া কি খারাপ? (২য় পর্ব)

dreamstime_s_126270682

প্রথম পর্বে আলোচনা করা হয়েছে মানুষকে আল্লাহ কোন হিকমতে ধনী ও দরিদ্র এই ২ শ্রেণীতে বিভক্ত করেছেন। এই পর্বে আমরা ইসলামে ধনীদের কিছু ফযিলত এবং তাদের দায়িত্ব নিয়ে আলোচনা করব। এ থেকে আমাদের অনুমিত হবে যে, ধনী হয়ে যদি কেউ ইসলাম নির্দেশিত পথে তার অর্থ ব্যয় করে বা সম্পদের হক আদায় করে তবে তা তার জন্য জান্নাত ও আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের মাধ্যম হবে।

ধনীদের কর্তব্য

আল্লাহ তা’আলা সৃষ্টিজগতের মাঝে পৃথিবীকে বৈচিত্র্যময় করে বানিয়েছেন। আর এ বৈচিত্র্যময় পৃথিবী নির্মাণে সম্পদশালী সচ্ছল মানুষের যেমন প্রয়োজন ছিল, তেমনই প্রয়োজন ছিল অভাবী দরিদ্রদের। প্রয়োজনের ক্ষেত্রে সকলেই একে অপরের মুখাপেক্ষী।

আল্লাহ মানুষকে সম্পদের দিক থেকে বিভিন্ন শ্রেণিতে বিভক্ত করেছেন। মূলত এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, মানুষকে পরীক্ষা করা। ধনীরা নি’আমতের শোকর করে কী না, কৃতজ্ঞ হয় কী না? আর দরিদ্ররা সবর তথা ধৈর্যশীল হয় কী না। শোকর আর সবর উভয়ের বিনিময় হচ্ছে জান্নাত। ধনীদের নি’আমতের শোকরের পরীক্ষা করার জন্যই আল্লাহ তা’আলা বিশেষ কিছু বিধান তাদের উপর আরোপ করেছেন, যা দরিদ্রদের দেননি।

ধনীদের সম্পদের যাকাত সম্পর্কে আল্লাহ বলেন, “আর যারা স্বর্ণ ও রৌপ্য জমা করে এবং তা আল্লাহর পথে ব্যয় না করে, তাদেরকে কঠোর শাস্তির সংবাদ শুনিয়ে দাও। যেদিন জাহান্নামের অগ্নিতে তা উত্তপ্ত করা হবে এবং তা দ্বারা তাদের ললাট, পার্শ্ব ও পৃষ্ঠদেশে দাগ দেওয়া হবে। সেদিন বলা হবে এটাই সে সম্পদ যা তোমরা নিজেদের জন্য জমা করেছিলে। সুতরাং, তোমরা যা জমা করেছিলে তার স্বাদ আস্বাদন করো” (আল কুরআন-৯:৩৪)

সুতরাং, আল্লাহর পথে যাকাত আদায় করলে ধনীরা জাহান্নামের এই মর্মন্তুদ শাস্তি থেকে বাচতে পারবে।

ঈদুল-ফিতরের সময় সদকাতুল ফিতর আদায়

সদকাতুল ফিতর হলো নির্ধারিত পরিমাণ সেই সদকা, যা ধনীদেরকে ঈদের নামাজের আগে প্রদান করতে হয়। ঈদের দিন নামাজের পূর্বে যিনি নিসাব পরিমাণ সম্পদ অর্থাৎ, সাড়ে সাত ভরি স্বর্ণ বা সাড়ে বাহান্ন ভরি রুপা বা সমমূল্যের ব্যবসায়িক পণ্যের মালিক থাকবে, তার নিজের ও পরিবারের ছোট–বড় সবার পক্ষ থেকে ফিতরা আদায় করা ওয়াজিব। সদকাতুল ফিতর আদায়ের অনেক সওয়াব হাদিসে বর্ণিত হয়েছে।

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সালাম বলেছেন, “অশালীন কথা ও অনর্থক কাজে সিয়ামের যে ক্ষতি হয়েছে তা পূরণের জন্য এবং নিঃস্ব, দরিদ্র, অসহায় মানুষদের আহার জোগানোর জন্য সদকাতুল ফিতরকে অপরিহার্য করা হয়েছে।” (আবু দাউদ)

ঈদুল আযহায় কুরবানিঃ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন, “যে ব্যক্তি সচ্ছলতা সত্ত্বেও কুরবানি করবে না, সে যেন আমাদের ঈদগাহের কাছেও না আসে।”

অন্য বর্ণনায় ইরশাদ করেছেন, “তোমাদের আমি কুরবানির গোশত তিন দিনের বেশি খেতে নিষেধ করেছিলাম অধিক পরিমাণে দরিদ্র মানুষের আগমনের কারণে। এখন থেকে তোমরা যত দিন ইচ্ছা খেতে পারো, জমা করতে পারো এবং সদকা করো।” (সহিহ মুসলিম)

হজ্জ ও ওমরাহ পালন

যদিও মক্কাবাসী দরিদ্রদের ওপরও হজ্জ্ব ফরজ, তথাপি দূর-দূরান্তে বসবাসকারীদের জন্য পরিবারের খরচ ও সফরের খরচ বহনের সামর্থ্য থাকা অবস্থায় তা ধনীদের জন্যও ফরজ হয়। এ বিষয়ে আল্লাহ তা’আলা বলেন, “সামর্থ্যবান মানুষের ওপর আল্লাহর জন্য বায়তুল্লাহ শরীফের হজ্জ করা ফরজ। আর যে কুফরি করে, তবে আল্লাহ তো নিশ্চয়ই সৃষ্টিকুল থেকে অমুখাপেক্ষী।” (আল কুরআন-৩:৯৭)

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন, “যে ব্যক্তি সচ্ছলতা ও আল্লাহর ঘরের সফরের সম্বল থাকা সত্ত্বেও তার জীবদ্দশায় হজ্জ করেনি, সে ইহুদি অবস্থায় মারা গেল, নাকি নাসারা অবস্থায় মারা গেল এতে আমার কোনো কিছু যায় আসে না।” (তিরমিযী)

এছাড়া আরো অনেক আর্থিক আমল রয়েছে, যা দরিদ্রদের জন্য খুব কষ্টে করার সুযোগ থাকলেও ধনীদের জন্য সেগুলি বেশি সহজ ও অধিক পরিমাণে সম্ভব। এর মধ্যে কিছু হচ্ছে, জনকল্যাণমূলক কাজে নফল সদকা করা, নিঃস্ব অসহায়দের রুজি রোজগারের ব্যবস্থা করে দেওয়া,

এতিমদের দায়িত্ব নেওয়া, রোগীদের চিকিৎসা করা, অসহায়দের ঘর নির্মাণ করে দেওয়া, মসজিদ, মাদ্রাসার জন্য জমি ওয়াকফ করা, মৃত্যুর পূর্বে সমস্ত সম্পত্তি থেকে সর্বোচ্চ এক-তৃতীয়াংশ পর্যন্ত সদকায়ে জারিয়ামূলক কাজের জন্য অসিয়ত করে যাওয়া ইত্যাদি।

সুতরাং, এ থেকে বোঝা যায়, ধনীরা যদি তাদের অর্থের হক পরিপূর্ণরূপে আদায় করতে পারে তবে সে একজন খাটি মুমিন হিসেবেই বিবেচিত হবে। আর এতে তার আখিরাতও উজ্জ্বল হবে।

 

(চলবে এবং পরবর্তী পর্বে আমরা জানব কয়েকজন ধনী সাহাবীদের কথা )