ইসলামের দৃষ্টিতে ধনী হওয়া কি খারাপ?

dreamstime_s_174308366
photo 174308366 © Ilham Saputra | Dreamstime.com

প্রথম পর্ব 

বিষয়টি অনেক বিস্তৃত হওয়ায় আমরা এই আলোচনাটিকে কয়েকটি পর্বে বিন্যস্ত করেছি। এ নিবন্ধগুলি মনোযোগ সহকারে পাঠ করলে আপনার বুঝে আসবে যে, ধনী হওয়া সম্পর্কে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি কি? আসলে কি ধনী হওয়া খারাপ নাকি ধনী হওয়াও আল্লাহর অশেষ নি’আমত সমূহের মধ্যে একটি নি’আমত। এ সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা দেওয়ার জন্যই আমাদের এই আলোচনা।

প্রথমেই যে বিষয়ে দৃষ্টিপাত করতে চাই তা হলো আল্লাহ কেন সকলকে শুধুমাত্র ধনী বা সকলকে শুধুমাত্র দরিদ্র বানালেন না।

কাউকে ধনী আর কাউকে দরিদ্র কেন বানালেন?

আল্লাহ সৃষ্টিজগতের একমাত্র রিযিকদাতা। রিযিক প্রাপ্তির জন্য তিনি ঈমান আনার শর্তও জুড়ে দেন নি। মুসলিম-অমুসলিম-নির্বিশেষে সকলকে তিনি তার হিকমত অনুযায়ী রিযিক দান করেন। কিন্তু কুদরতিভাবে তিনি রিযিক বন্টনের মধ্যে পার্থক্য রেখেছেন। পৃথিবীর সকল মানুষকে তিনি ধনী বা দরিদ্র বানাননি। তিনি চাইলে পৃথিবীর সব মানুষকে অভিন্ন রিযিক দিতে পারতেন। অবশ্য মায়ের বুকের দুধের ক্ষেত্রে পৃথিবীর ধনী, দরিদ্র সকলের সমান অধিকার রয়েছে এবং সবার জন্য একই পরিমাণ রিযিক তিনি নির্ধারণ করেছেন। কিন্তু দুগ্ধকাল পার হওয়ার পর থেকেই সকলের রিযিকে তারতম্য দেখা দেয়। কিন্তু এই তারতম্য কেন?

কুরআন থেকে আমরা এর পাঁচটি কারণ জানতে পারি।

১) সহযোগিতার উদ্দেশ্য

সকলকেই ধনী বা দরিদ্র বানানো হয়নি, যাতে প্রত্যেকে একে অপরের মাধ্যমে উপকৃত হতে পারে। অর্থাৎ মানুষ যাতে বিভিন্ন পেশায় থেকে একে অপরকে সহযোগিতা করতে পারে। আল্লাহ বলেন, “তারা কি তোমার রবের করুণা বণ্টন করে? আমিই তাদের মধ্যে তাদের জীবিকা বণ্টন করি পার্থিব জীবনে এবং একজনকে অপরজনের ওপর মর্যাদা দিয়ে থাকি, যাতে একে অন্যের দ্বারা তারা উপকৃত হতে পারে…।” (আল কুরআন-৪৩:৩২)

২) অহংকারীদের অপছন্দ

কিছু মানুষ সম্পদ পেয়ে উদ্ধত হয়ে ওঠে, অহংকার করে। যেমন— মূসা আ’লাইহিস সালামের যামানায় কারুন উদ্ধত ও অহংকারী হয়ে উঠেছিল। এ বিষয়ে আল্লাহ তা’আলা ইরশাদ করেন, ‘কারুন ছিল মুসার সম্প্রদায়ভুক্ত। কিন্তু সে তাদের প্রতি ঔদ্ধত্য প্রকাশ করেছিল। আমি তাকে দান করেছিলাম এমন ধনভাণ্ডার, যার চাবিগুলো বহন করা এক দল শক্তিধর লোকের পক্ষেও কষ্টসাধ্য ছিল। স্মরণ করো, যখন তার জাতি তাকে বলেছিল, অহংকার কোরো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ অহংকারীদের পছন্দ করেন না।” (আল কুরআন-২৮:৭৬)

সুতরাং সকল মানুষকে এ কারণে অঢেল সম্পদ দেওয়া হয়নি, যাতে তারা উদ্ধত হতে না পারে। এ সম্পর্কে আল্লাহ বলেন, “আল্লাহ তাঁর সব বান্দাকে জীবন উপকরণে প্রাচুর্যতা দিলে তারা পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করত। কিন্তু তিনি তাঁর ইচ্ছামতো যথাযথ পরিমাণে রিযিক বন্টন করেন।” (আল কুরআন-৪২:২৭)

৩) সকলের পরীক্ষা

আল্লাহ কিছ মানুষকে দরিদ্র আবার কিছু মানুষকে ধনী বানিয়েছেন। রিযিকের এই হ্রাস-বৃদ্ধি সকলের জন্যই পরীক্ষাস্বরূপ। ধনীদের জন্য আল্লাহর নির্দেশ পালন ও মানুষের অধিকার আদায়ের পরীক্ষা এবং দরিদ্রদের জন্য সবরের পরীক্ষা। আল্লাহ বলেন, “তুমি তোমার চক্ষুদ্বয় কখনও সেগুলির প্রতি প্রসারিত করো না, যেগুলি আমি তাদের বিভিন্ন শ্রেণিকে পার্থিব জীবনের উপভোগের বস্তুস্বরূপ দিয়েছি; এগুলো দিয়েছি তাদেরকে পরীক্ষা করার জন্য। বস্তুত তোমার রবের রিযিকই উত্কৃষ্ট ও অধিক স্থায়ী।” (আল কুরআন-২০:১৩১)

৪) আখিরাতে পুরস্কার

যাদেরকে সম্পদ দেওয়া হয়নি হয়নি তাদের জন্য সান্ত্বনা হলো, আল্লাহ তাদেরকে এর বিনিময়ে তাদের পরকালীন জীবন সমৃদ্ধ করার ওয়াদা দিয়েছেন। তবে এর জন্য শর্ত হলো, ঈমানের পাশাপাশি নেক আমল সহকারে কবরে যেতে হবে। আল্লাহ বলেন, “কেউ পার্থিব সুখ-শান্তি কামনা করলে আমি যাকে ইচ্ছা, যে পরিমাণ ইচ্ছা এই দুনিয়াতেই তা দিয়ে থাকি। পরকালে তাদের জন্য জাহান্নাম নির্ধারণ করি, যেখানে তারা প্রবেশ করবে নিন্দিত ও অনুগ্রহবঞ্চিত অবস্থায়। আর যারা ঈমানদার হয়ে আখিরাত কামনা করে এবং তার জন্য যথাযথ চেষ্টাও করে, তাদের প্রচেষ্টার বিনিময়ে তাদেরকে অবশ্যই পুরস্কার দেওয়া হবে।” (আল কুরআন-১৭:১৮-১৯)

৫) ভারসাম্য রক্ষার্থে

মানবসমাজ টিকিয়ে রাখার স্বার্থেই সকল মানুষকে একই রকম করা হয়নি। কেননা সাধারণত খুব ধনাঢ্য বা খুব দরিদ্র ব্যক্তিদের মধ্যেই অপরাধপ্রবণতা বেশি থাকে। তাই সব মানুষকে একই রকম বানানো হলে সমাজ পাপাচারে ও অন্যায়ে ভরে যেত। এ বিষয়ে আল্লাহ বলেন, “যখন আমি কোনো মানববসতি ধ্বংস করতে চাই তখন তার সমৃদ্ধিশালী লোকদের নির্দেশ দিয়ে থাকি। কিন্তু তারা সেখানে অসৎকাজ করতে থাকে। আর তখন আজাবের ফায়সালা ঐ জনবসতির ওপর অবধারিত হয়ে যায়।” (আল কুরআন-১৭:১৬)

সুতরাং, এ থেকে বোঝা যায় বিভিন্ন হিকমতে ও মানবসমাজ টিকিয়ে রাখার স্বার্থেই সকল মানুষকে ধনী বানানো হয়নি।