ইসলামের দৃষ্টিতে ভ্যালেন্টাইনস ডে বা ‘ভালবাসা দিবস’

সমাজ ১২ ফেব্রু. ২০২১ Contributor
ফোকাস
ভ্যালেন্টাইনস ডে
Photo by alleksana from Pexels

আল্লাহ তা’আলা আমাদের জন্য ইসলামকে দ্বীন বা জীবনব্যবস্থা হিসেবে বাছাই করেছেন এবং অন্য কোনো জীবনব্যবস্থা যে তিনি কখনও গ্রহণ করবেন না তা স্পষ্টরূপে বলেছেন। আল্লাহ বলেন,

“এবং যে কেউই ইসলাম ছাড়া অন্য কোনো জীবনব্যবস্থার আকাঙ্খা করবে, তা কখনোই তার নিকট হতে গ্রহণ করা হবে না, এবং আখিরাতে সে হবে ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে একজন।” (আল কুরআন-৩:৮৫)

অপরদিকে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, এই উম্মাতের মধ্যে কিছু লোক (ইবাদতের প্রক্রিয়া ও সামাজিক রীতিনীতির ক্ষেত্রে) আল্লাহর শত্রুদের অনুসরণ করবে। আবু সাঈদ আল খুদরী(রাযিঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,

“তোমরা অবশ্যই তোমাদের পূর্ববর্তীদের অনুসরণে লিপ্ত হবে। প্রতি বিঘত এবং প্রতিটি বাহুর দৈর্ঘ্যে তোমরা তাদেরকে অনুসরণ করবে। এমনকি তারা যদি সরীসৃপের গর্তে প্রবেশ করে থাকে, তবে তোমরাও সেখানে তাদেরকে অনুসরণ করে প্রবেশ করবে৷” আমরা বললাম, “ইয়া রাসূলুল্লাহ!আমরা যাদেরকে অনুসরণ করব তারা কি ইহুদী ও খ্রিস্টান?” তিনি বললেন: “তারা ছাড়া আর কারা?” (বুখারী, মুসলিম)

ভ্যালেন্টাইনস ডে ও বিপণন 

আজ মুসলিম বিশ্বের প্রায় সকল স্থানে ঠিক এটাই ঘটছে। মুসলিমরা তাদের অনুসরণীয় চাল-চলন, রীতিনীতি ত্যাগ করে ইহুদী ও খ্রিস্টানদেরকে সকল ক্ষেত্রে অনুসরণ করছে। টিভি, পত্র-পত্রিকা, স্যাটেলাইট চ্যানেল এবং ইন্টারনেটের মত বিশ্বব্যাপী মিডিয়ার প্রচারে কাফিরদের অনুসৃত সকল রীতিনীতি আজ মুসলিমদের ঘরে ঘরে পৌঁছে যাচ্ছে এবং এর অনুসরণ ও অনুকরণ তাদের জন্য সহজতর হয়ে উঠছে।

বর্তমান সমাজে প্রচলিত এরূপ বহু অপসংস্কৃতির সাথে একটি সাম্প্রতিক সংযোজন হয়েছে ভ্যালেন্টাইনস ডে, যা “ভালোবাসা দিবস” নামে আমাদের সমাজের যুবক-যুবতীদের মাধে ঢুকে পড়েছে এবং ক্রমে জনপ্রিয়তা লাভ করছে। পাশাপাশি বিভিন্ন পত্রপত্রিকা ও ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান এ দিবসটিকে পৃষ্ঠপোষকতা প্রদান করছে।

তাই এই নিবন্ধের একটি ক্ষুদ্র প্রচেষ্টা হচ্ছে, ইসলামের আলোকে এই ভালবাসা দিবসকে মূল্যায়ন করে মুসলিম সমাজের যুবক-যুবতীদেরকে কাফিরদের অন্ধ অনুসরণ থেকে নিবৃত্ত করা। নিশ্চয়ই ইহুদী ও খ্রীস্টানসহ অন্যান্য কাফিরদের সংস্কৃতির অনুসরণের পরিসমাপ্তি ঘটবে জাহান্নামের আগুনে। তাই এই নিবন্ধের উদ্দেশ্য আমাদের যুবসম্প্রদায়কে জাহান্নামের পথ থেকে ফিরিয়ে জান্নাতের প্রশান্তির দিকে আহবান করা।

ভ্যালেন্টাইনস ডে-এর উৎস এবং প্রচলন

‘ভ্যালেন্টাইন’স ডে’র উৎস হচ্ছে সতের শতক পূর্বের পৌত্তলিক রোমকদের মাঝে প্রচলিত আধ্যাত্মিক ভালবাসার একটি উৎসব। রোমানদের এই পৌত্তলিক উৎসবের সাথে কিছু কল্পকাহিনী জড়িত ছিল, যা পরবর্তীতে খ্রিস্টান রোমকদের মাঝেও প্রচলিত হয়ে পড়ে। এ সমস্ত কল্প-কাহিনীর মধ্যে অন্যতম একটি হচ্ছে এই বিশ্বাস যে, এই দিনে রোমের প্রতিষ্ঠাতা রমিউলাস একটি নেকড়ের দুধ পান করেছিলেন, যা ছিল তার শক্তি ও জ্ঞানের উৎস। রোমকরা খ্রীস্টধর্ম গ্রহণের পরও এই উৎসব উদযাপনকে অব্যাহত রাখে, কিন্তু এর পৌত্তলিক খোলস পাল্টে ফেলে একে খ্রিস্টীয় খোলসে আবৃত করে তারা এই উৎসবকে ভিন্ন একটি ঘটনার সাথে সংশ্লিষ্ট করে।

এই ঘটনাটি হচেছ সেইন্ট ভ্যালেন্টাইন নামক জনৈক খ্রিস্টান সন্ন্যাসীর জীবন উৎসর্গ করার ঘটনা। মূলত ইতিহাসে এরূপ দুজন সেইন্ট ভ্যালেন্টাইনের কাহিনী পাওয়া যায় ৷ এদের একজন সম্পর্কে দাবী করা হয় যে, তিনি শান্তি ও ভালোবাসার বাণী প্রচারের ব্রত নিয়ে জীবন দিয়েছিলেন। আর তার স্মরণেই রোমক খ্রিস্টানরা এই উৎসব পালন অব্যাহত রাখে। এই সময়টিতেই এই আধ্যাত্মিক ভালবাসার উৎসব রূপান্তরিত হয়ে জৈবিক কামনা ও যৌনতার উৎসবে রূপ নেয়। এ উৎসবের মধ্যে যোগ করা হয় একবছরের জন্য সঙ্গী বাছাইয়ের অনুষ্ঠান, যাতে একজন তরুণের জন্য একজন তরুণীকে একবছরের জন্য নির্ধারণ করে দেওয়া হত। তারা একবছর পরস্পরের সাথে মেলামেশা করার পর একে অপরের প্রতি আগ্রহী হলে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হত, নতুবা পরবর্তী বছরেও এই একই প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যেত।

ভ্যালেন্টাইনস উৎসবের বিরোধিতা 

খ্রিস্টান ধর্মের ধর্মীয় ব্যক্তিত্বরা এই প্রথার বিরুদ্ধে ছিলেন, কেননা তারা বুঝতে পেরেছিলেন যে, এটা সমাজে অশালীনতা ও ব্যাভিচারকে ছড়িয়ে দিয়ে সমাজকে ধ্বংস করার জন্য শয়তানের বহু কূটচালের একটি, এবং ধর্মের সাথে এর নূন্যতম কোনো সম্পর্কই নেই। এমনকি খ্রীস্টধর্মের প্রাণকেন্দ্র ইতালীতে এই প্রথা অবশেষে বিলুপ্ত করা হয়। তবে আঠার ও ঊনিশ শতকে সেখানে পুনরায় তা চালু হয়।

‘ভ্যালেন্টাইন’স ডে’র উৎস সম্পর্কে আরেকটি মতবাদ হচেছ এই যে, এর উৎস খ্রীস্টীয় ৩য় শতকে রোমক সম্রাট দ্বিতীয় ক্লডিয়াসের শাসনামলে। এ সময় ক্লডিয়াস একটি বিধান জারী করেন যে, সেনাবাহিনীর সদস্যরা বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হতে পারবে না। তার ধারণায়, বিবাহ তাদের যুদ্ধক্ষেত্রে দৃঢ় থাকাকে ব্যাহত করবে। কিন্তু এ সময় সেইন্ট ভ্যালেন্টাইন নামে এক পাদ্রী এই আইনের বিরুদ্ধাচরণ করেন এবং গোপনে সৈনিকদের বিয়ের কার্য সমাধা করতে থাকেন। এর পরিণতিতে তাকে কারাবরণ করতে হয়। পরিশেষে সম্রাট তাকে খ্রিস্টধর্ম পরিত্যাগের বিনিময়ে মুক্তি ও পুরস্কারের লোভ দেখান। কিন্তু তিনি খ্রিস্টধর্মের ওপর অটল থেকে মৃত্যুদন্ড গ্রহণ করে। তার মৃত্যূদন্ড কার্যকরের তারিখটি ছিল ২৭০ খ্রিষ্টব্দের ১৪ই ফেব্রুয়ারী, যা কার্যকর হয় ১৫ই ফেব্রুয়ার। সেজন্য এই দিনটিকে ঐ পাদ্রীর নামে নামকরণ করা হয় ৷

ইসলামের দৃষ্টিতে ভ্যালেন্টাইনস ডে

এরপর খ্রিস্টানদের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা পোপ ১৪ই ফেব্রুয়ারীকে ভালবাসার উৎসব দিবস হিসেবে নির্ধারণ করেন ৷ দেখুন, কিভাবে খ্রিস্টানদের সর্বোচ্চ এক ধর্মীয় নেতা একটি নব-উদ্ভাবনকে ধর্মীয় বেশ পরিয়ে সমাজে চালু করে দিলেন। আর কিভাবে খ্রিস্টানরাও একে সাদরে গ্রহণ করে নিল। এজন্যই আল্লাহ তা’আলা কুরআনে বলেছেন,

“তারা তাদের পন্ডিত এবং সন্ন্যাসীদেরকে (আল্লাহর পাশাপাশি) তাদের রব হিসেবে গ্রহণ করে নিয়েছে ৷” (আল কুরআন-৯:৩১)

এখন চিন্তা করুন, খ্রিস্টানদের ধর্মীয় উৎসব হিসেবে প্রচলিত একটি উৎসবকে মুসলমানরা কিভাবে গ্রহণ করতে পারে? ইসলাম যেখানে বিবাহ বহির্ভূত যেকোনো সম্পর্ক স্থাপনকে হারাম ঘোষণা করেছে সেখানে মুসলিম যুবক-যুবতীরা ভালোবাসার নামে অশ্লীলতা ব্যপকাকারী এই দিবসটিকে কিভাবে পালন করতে পারে? সিদ্ধান্ত আপনার। এ দিবসটিকে ত্যাগ করে জান্নাতের পথের পঠিক হবেন নাকি এ দিবসটি পালন করে জাহান্নামের আযাবের প্রস্তুতি নিবেন?