ইসলামের প্রথম এবং শেষ বিজ্ঞান

Hills, prayer
ID 71895857 © Leo Lintang | Dreamstime.com

ইলম আস-সুলুক হল জ্ঞানকে কার্যকর করার একটি পদ্ধতি যার মাধ্যমে তাত্ত্বিক জীবন গড়ে ওঠে। এটি আন্তরিকতার প্রাণ। সালাকা শব্দের অর্থ “হাঁটা বা যাওয়া,” যেমন আল্লাহ তা’আলা সূরা ত্ব-হা তে উল্লেখ করেছেনঃ

“তিনি তোমাদের জন্যে পৃথিবীকে শয্যা করেছেন এবং তাতে চলার পথ করেছেন, আকাশ থেকে বৃষ্টি বর্ষণ করেছেন এবং তা দ্বারা আমি বিভিন্ন প্রকার উদ্ভিদ উৎপন্ন করেছি” (আল কুরআন-২০:৫৩)

ইলম আস-সুলুক হল নির্ভরতা, প্রতিফলন এবং প্রয়োগের পথে পদক্ষেপ নেওয়া এবং এটি ইসলামের প্রথম এবং শেষ বিজ্ঞান। বিস্ময়ের শুরু এবং শেষ এটিই।

রাসূল হওয়ার পূর্বে, আল্লাহ তা’আলা হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লামকে তাঁর হৃদয় প্রস্তুত করতে এবং কুরআনের বাণী গ্রহণের উপযোগী করতে তাঁকে নির্জন সময় কাটানোর জন্য উৎসাহিত করেন। তাঁর জীবনের শেষদিকে, রমযানে তিনি শুধুমাত্র জিব্রাইল আ’লাইহিস সালামকে আগের তুলনায় আরও বেশি কুরআন শুনিয়েছিলেন তাই নয়, বরং তিনি তাঁর ‘ইতিকাফ’ দ্বিগুণ করে দশ দিন থেকে বিশ দিনে নিয়ে গেছিলেন।

এই কারণেই এটি ইসলামের প্রথম বিজ্ঞান, যেটি ছাড়া রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লামের হৃদয় কখনও ওহী পাওয়ার জন্য প্রস্তুত হত না। তাহলে এটিই কেন শেষ বিজ্ঞান? কারণ আজ অবধি প্রতিটি মুসলিম যারা ইসলামকে বুঝতে এবং তাঁর রবকে জানার চেষ্টা করবে তাদের অবশ্যই প্রথমে কিছুটা সময় ব্যয় করে হৃদয়কে পবিত্র করতে হবে যাতে কুরআনের প্রকৃত অর্থ গ্রহণ করার জন্য তাদের হৃদয় প্রস্তুত হয় এবং আমরা এই আধ্যাত্মিক চেতনা রমযান বা রমযানের বাহিরে ‘ইতিকাফ’ এর মাধ্যমে পেতে পারি।

আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেছেনঃ “আর যারা আমার পথে  সাধনায় আত্মনিয়োগ করে আমি অবশ্যই তাদেরকে আমার পথে পরিচালিত করব। নিশ্চয় আল্লাহ সৎকর্মশীলদের সাথে আছেন” (আল কুরআন-২৯:৬৯)

ধার্মিক অনেক মানুষ আছে কিন্তু অল্প কিছু মানুষই আছে যারা আধ্যাত্মিকতা লাভ করেছেন  কারণ আধ্যাত্মিকতা হল আল্লাহর তরফ থেকে প্রাপ্ত এক বিরাট নিয়ামত। ফিকহ (আইনশাস্ত্র) আপনাকে ধার্মিক করে তুলবে তবে ‘ইলম আস-সুলুক’ আপনাকে আধ্যাত্মিকতা দান করবে। এই পার্থক্যটি এই কারণে যে, আপনি ‘ইলম আল-সুলুক’ কিতাব পাঠদানের মত শিক্ষাদান করতে পারবেন না। একারণেই ইমাম গাজ্জালির বইগুলো এত জটিল। তিনি তাঁর রচিত বইগুলির মাধ্যেম আমাদের সামনে ঐ বিষয়গুলি নিয়ে এসেছেন যা সাধারণত আমরা ভাষায় প্রকাশ করতে পারিনা।

যাইহোক, ১৯৩৪ সালে কার্ট গোল্ডস্টেইন নামে একজন মনোবিজ্ঞানী যুগান্তকারী এক কাজ করেন। ‘দ্য অর্গানিজম’ নামে একটি বই রচনা করেন যাতে তিনি একপ্রকার মানসিক অবস্থা বিবৃত করেন এবং একে “আত্ম-বাস্তবায়ন” নামে অভিহিত করেন। মিঃ গোল্ডস্টেইনের বিবৃতিটি পরবর্তীতে আব্রাহাম মাসলো ব্যাখ্যা করেন। মাসলো ব্যাখ্যা করেছিলেন যে, এই অনন্য ব্যক্তিরা (তাঁর মতে বিশ্বের জনসংখ্যার ১%) যারা ‘আত্ম-বাস্তবায়ন’ অর্জন করতে পেরেছেন তাদের কিছু বৈশিষ্ট্য আছে। নিম্নলিখিত বৈশিষ্ট্যগুলি এর অন্তর্ভুক্তঃ বাস্তবতাকে সঠিকভাবে উপলব্ধি করা, আধ্যাত্মিকতার প্রতি আকর্ষণ থাকা, প্রকৃতির প্রতি ভালোবাসা রাখা, বিশ্বমানবতার জন্য উদ্বিগ্নতা জাগ্রত হওয়া, বিভিন্ন সমস্যা সমাধানের জন্য ফলদায়ক কোনো পন্থা আবিষ্কারের চেষ্টা করা, অন্যের ত্রুটি না খোঁজা এবং দ্বন্দ এড়িয়ে চলা।

এগুলি কি নবী এবং ধার্মিক লোকদের বৈশিষ্ট্য নয়? এই গুণাবলীর সাথে তুলনা করুন আল্লাহর রাসূলের গুণাবলীকে। আবু বকর, উমর, উসমান, আলী, হাসান বসরী, সালাহুদ্দীন আইয়্যুবী প্রমুখের গুণাবলীকেও এগুলির সাথে তুলনা করুন। নিভৃতচারী সে শাইখের গুণাবলীকেও তুলনা করুন যিনি আজও সমাজে আধ্যাত্মিকতার আলো ছড়িয়ে যাচ্ছেন। তারা সকলে এই একই গুণবিশিষ্ট।

মাঝে মাঝে বিজ্ঞান এসে আমাদের মনে সংশয় সৃষ্টি করে, আমাদের ঈমানের ক্ষতি সাধনের চেষ্টা করে। যাইহোক ঈমানী দুর্বলতার কারণে আমাদের আরও সমৃদ্ধ দলীল প্রমাণের প্রয়োজন পরে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে বিজ্ঞান ইসলামের সকল বিধানের অনুগত, এটা শুধু আমাদেরকে বুঝতে হবে। কারণ বিজ্ঞান ভূল প্রমাণিত হতে পারে কিন্তু ইসলাম কখনও ভূল প্রমাণিত হয়নি, হবেও না। তাই অনেক আলেমই এই বিষয়টি বোঝাতে চেষ্টা করেন যে, বিজ্ঞানের পিছনে না ছুটে আমাদের উচিত আল্লাহর প্রতি ঈমানকে আরও মজবুত করা।

তাই মুসলিম হিসেবে শুধু ফিকহের জ্ঞান অর্জনের প্রতি নিবদ্ধ না হয়ে আমাদের উচিত ইলম আস-সুলুকের প্রতিও গুরুত্ব দেওয়া। কারণ এই ইলমের কারণেই মানুষের মাঝে মানবতাবোধ জাগ্রত হয়, আল্লাহর প্রতি ঈমান আরও মজবুত হয়। আপনি এটিকে আত্ম-বাস্তবায়ন বা ইলম আস-সুলুক বা তাযকিয়াহ যাই বলুন না কেন এর প্রকৃতরূপ একটিই, যা অর্জন করতে পারলে এই বিশ্বটি আরও ভাল হবে।