ইসলামের বিশ্বজনীন জনপ্রিয়তার মূল কারণ কী?

adli-wahid-3-QB-YKxTKY-unsplash
Fotoğraf: Adli Wahid-Unsplash

ইসলাম শান্তির ধর্ম। যুগে যুগে কালে কালে মহান রাব্বুল আলামিন বহু নবী-রাসুলদের পাঠিয়েছেন এই ধর্ম প্রচার করার জন্য। ধৈর্য, প্রেম-ভালোবাসা, মমতা দিয়ে তারা রাব্বুল আলামীনের এই বাণী মানুষের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন। কিন্তু বর্তমানে একটি অংশ প্রচার করে থাকে যে, পৃথিবীতে ইসলামের প্রসার তলোয়ারের মাধ্যমে হয়েছে। মুসলমানরা বরাবরই উগ্র ও সহিংস বিশ্বাসের অধিকারী ছিল। কিন্তু এই অভিযোগ কি আসলেই সঠিক?

আমরা যখন ইতিহাসের দিকে তাকাই তখন এই দাবির পুরোপুরি বিপরীত চিত্রটি আমরা দেখতে পাই। তলোয়ার দিয়ে ইসলাম প্রচার প্রসারে অভিযোগ ইতিহাসের দিকে যখন তাকাই তখন এর সত্যতা পাওয়া যায় না। বরং আমরা দেখতে পাই ইসলাম প্রসার লাভ করেছে মূলত তার মূল্যবোধের দ্বারা।

মূলত পাঁচটি উপায়ে সারা পৃথিবীতে ইসলামের প্রসার ঘটে। এবং সারা পৃথিবীর বিভিন্নস্থানে অমুসলিমরা মূলত ইসলামের তিনটি মূল শিক্ষা মুগ্ধ হয়ে ইসলাম গ্রহণ করে থাকে।

যে পাঁচটি বিষয়ে ইসলামের প্রসার ঘটে।

১. দাওয়াত।

মুসলমানরা পৃথিবীর যেখানেই গিয়েছে, সেখানই তারা ইসলামের বাণী এবং শিক্ষার দাওয়াত বা প্রচার চালিয়েছেন। মানুষের কাছে দাওয়াত পৌঁছানো সম্পর্কিত একটি হাদিস হচ্ছেঃ “সহজ করো, কঠিন করোনা। সুসংবাদ দাও, হতাশ করোনা।” (বুখারী ও মুসলিম)

২. বাণিজ্য

ইতিহাসের দিকে তাকালে আমরা দেখতে পাই পৃথিবীর প্রায় সকল গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক কেন্দ্রগুলোতে মুসলমানরা বাণিজ্য করতো। ফলে মুসলমানদের বিশ্বাস, মূল্যবোধ এবং জীবন পরিচালনার পদ্ধতি সাথে বিশ্বের নানা মানুষের পরিচয় হওয়ার সুযোগ ঘটে। এই পরিচিত হওয়ার পরে এই শান্তির ধর্মের প্রতি তাদের আগ্রহ প্রকাশ করে। অর্থাৎ মুসলমানদের দেখে মানুষ ইসলাম সম্পর্কে জানতে আগ্রহী হয়।

৩. অভিবাসন

শান্তির ধর্ম-ইসলাম শুধু আরবের মরুভূমির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। রাসূল (সা.)-এর ইন্তেকালের পর দাওয়াত, জীবিকা, বাণিজ্যসহ বিভিন্ন কারণে সারা পৃথিবীতে মুসলমানরা ছড়িয়ে পড়ে। এই সকল মুসলমান পৃথিবীর যেখানেই যাক না কেন ইসলামের শিক্ষা তাদের নতুন পরিচিতদের মধ্যে প্রচার করে। ফলে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে দেশে মুসলমানদের অভিবাসনের সাথে সাথে ইসলামের প্রচার ও ছড়িয়ে পড়ে।

৪. প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব

সামাজিক রাজনৈতিক বা অন্য কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তি যখন ইসলাম গ্রহণ করেছেন তখনই তার প্রভাবাধীন সকল লোকজন নিয়ে একত্রে ইসলাম গ্রহণ করেছেন। ফলে বিভিন্ন জায়গার প্রভাবশালী ব্যক্তিরা ইসলাম প্রচারে ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

৫. আন্তঃবিবাহ

এই অন্তঃবিবাহের মাধ্যমে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে মুসলমানরা তাদের বসতি স্থাপন এবং সম্প্রসারণ করেছিল। মুসলমানদের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে অসংখ্য অমুসলিম নারী পুরুষ ইসলাম গ্রহণ করে।

ইসলামের তিনটি মূল শিক্ষা মুগ্ধ হয়ে ইসলাম গ্রহণ করা।

১. ইসলামের ন্যায়বিচার ও সমতার নীতি

আল্লাহ মানুষকে সৃষ্টির সেরা জীব হিসেবে তৈরি করেছেন। অর্থাৎ আশরাফুল মাখলুকাত। তাই ইসলামে সকল গোত্র, জাতি, বর্ণ, ভাষার পুরুষ ও নারীরা উভয়কে সমান মর্যাদার অধিকার প্রতিষ্ঠা করেছে। পাশাপাশি মানুষের জন্য ন্যায়বিচার এবং সমতা নিশ্চিত করা হয়েছে। এই ন্যায়বিচার ও সমতাকে প্রতিষ্ঠার পথে অর্থ ও প্রভাবকে অগ্রাহ্য করা হয়েছে। ইসলামের সমতা এবং ন্যায়বিচারের এই নীতিতে মুগ্ধ হয়ে পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে নিপীড়িত মজলুম মানুষ বিপুল ভাবে ইসলাম গ্রহণ করেন।

২. ইসলামের একতার শিক্ষা

ইসলাম ধর্মের শিক্ষার অন্যতম মৌলিক বিষয় হচ্ছে মুসলমানদের মাঝে একতা। একজন মুসলমানের থেকে আরেকজন মুসলমানের বিভিন্ন স্তরের যতই ব্যবধান থাকুক না কেন ইসলামের ভিত্তিতে সকল মুসলমানদের মাঝে সম্পর্ক তৈরীর জন্য ইসলাম শিক্ষা প্রদান করে। জামাতে নামাজ আদায়ের সময় কোন মানুষের কোন পরিচয়ে কিছু আসে যায় না। তাদের পরিচয় তখন শুধু একটি থাকে আর তা হচ্ছে তারা মুসলমান। হজের ক্ষেত্রেও তাই। ইসলামে এই ঐক্যতা দেখে বিশ্বের বিভিন্ন মানুষজন ইসলাম গ্রহণের প্রতি আকৃষ্ট হয়।

৩. ইসলামের বিশ্বজনীনতা

পৃথিবীর যেকোনো জায়গার যেকোনো মানুষের জীবন পরিচালনার জন্য ইসলাম একটি যথার্থ আদর্শ। নির্দিষ্ট কোন দেশের সংস্কৃতি উপর নির্ভর করে ইসলাম পরিচালিত হয় না। এমনকি যদি ইসলামের সংস্কৃতি ও আচার-আচরণের সাথে এর কোন সাংঘর্ষিক না হয় তবে স্থানীয় সংস্কৃতি ও আচার-আচরণকে ইসলাম পরিবর্তনের কোনরূপ চেষ্টা করে না।

আমরা উপরোক্ত আলোচনা এবং কারণসমূহ দিকে তাকিয়ে অবলীলায় বলতে পারি যে ইসলাম প্রচার এর মূল কারণ তলোয়ার নয়। বরং অমুসলিমরা মুসলমানদের সংস্পর্শে আসার পর তাদের জীবনধারা, মূল্যবোধ এবং ইসলামের ন্যায়-নীতি দেখে তারা নিজেরাই ইসলাম গ্রহণের প্রতি আগ্রহ প্রকাশ করে। আর এভাবেই প্রচার হতে থাকে ইসলামের।