ইসলামে ঈমানের মূল বিষয়সমূহ কী কী?

dreamstime_s_46179785
9785 © Arne9001 | Dreamstime.com

ঈমানের রুকন বা মূল ভিত্তি হলো ৬টি বিষয়। নিম্নে সেগুলি নিয়ে সংক্ষেপে আলোচনা করা হলঃ

১) আল্লাহর উপর ঈমান

আল্লাহর উপর ঈমানের মূলকথা হল তাওহিদ বা আল্লাহর একত্ববাদের উপর ঈমান আনা। তাওহিদকে বোঝার সুবিধার্থে ৩ ভাগে ভাগ করা হয়। ক) রুবুবিয়্যাহ, খ) উলুহিয়্যাহ, গ) আসমা ওয়াস সিফাত। এই তিন ক্ষেত্রেই আল্লাহর কোনো শরীক নেই।

ক) রুবুবিয়্যাহঃ সৃষ্টি, প্রতিপালন, রিযিক প্রদান, সুস্থতা, জীবন ও মৃত্যু দানসহ মহাজাগতিক যত বিষয় রয়েছে, তাতে আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও বিন্দুমাত্র ক্ষমতা নেই। অনুরুপভাবে, শরিয়াহ বা জীবনবিধান প্রদান, শাসন কর্তৃত্ব, সার্বভৌমত্ব এসবই আল্লাহর একচ্ছত্র অধিকারে।

খ) উলুহিয়্যাহঃ ইবাদাত ও আনুগত্য সংক্রান্ত যত বিষয় রয়েছে এসবেরই একচ্ছত্র অধিকারী আল্লাহ তা’আলা। যেমনঃ ইসলাম তথা আত্মসমর্পণ করা; ইহসান তথা নিষ্ঠার সাথে কাজ করা, দয়া ও সহানুভূতি প্রদর্শন, উপকার সাধন করা; দু’আ তথা প্রার্থনা, আহ্বান করা; খওফ তথা ভয় করা; তাওয়াক্কুল তথা নির্ভরশীলতা; খুশু তথা বিনয়, নম্রতা; খাশিয়াত তথা অমঙ্গলের আশংকা; ইনাবাহ তথা আল্লাহর অভিমুখী হওয়া, তাঁর দিকে ফিরে আসা; ইস্তি’আনাহ তথা সাহায্য প্রার্থনা করা; ইস্তি’আযাহ তথা আশ্রয় প্রার্থনা করা; যাবাহ তথা কুরবানি বা উৎসর্গ করা; নাযর তথা মান্নত করা ইত্যাদি সকল কিছু হতে হবে একমাত্র আল্লাহর জন্য।

গ) আসমা ওয়াস সিফাতঃ এর অর্থ নাম ও গুণাবলির ক্ষেত্রে আল্লাহ এক। এটির মূল কথা হচ্ছে, কুরআন ও সুন্নাহয় আল্লাহ তা’আলার যেসমস্ত নাম ও গুণের বর্ণনা এসেছে, সেগুলো কোনো প্রকার বিকৃতিকরণ, ধরণ বর্ণনা, আকৃতি নির্ধারণ, সাদৃশ্য প্রদান ব্যতীত ঈমান আনা। এ সমস্ত নাম ও গুণের ওসিলায় আল্লাহর নিকট দু’আ করা।

২) ফেরেশতাদের উপর ঈমান

ফেরেশতারা আল্লাহর বিশেষ সৃষ্টি। তাদের সৃষ্টি নুর দিয়ে। তারা মানবীয় সমস্ত দুর্বলতার ঊর্ধ্বে। তাদের মর্যাদার বিভিন্ন স্তর রয়েছে। তারা আল্লাহর ক্ষমতায় অংশীদার নন, বরং তাঁর হুকুমের অনুসরণকারী মাত্র। আল্লাহর হুকুমের ব্যত্যয় করার সামর্থ্য তাদের নেই।

৩) কিতাবসমূহের উপর ঈমান

আল্লাহ তা’আলা মানুষের পথপ্রদর্শনের লক্ষ্যে যুগে যুগে নবী-রাসুলদের প্রতি কিতাব অবতীর্ণ করেছেন। তাতে প্রত্যেক সম্প্রদায়ের আকিদা-ইবাদাত সংক্রান্ত যাবতীয় বিষয়দির পথনির্দেশনা ছিল। সমস্ত কিতাব ও সহিফার প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করতে হবে। বিশেষ করে চারটি প্রধান কিতাবের প্রতি। তবে সকল কিতাবের মধ্যে একমাত্র কুরআনকেই আল্লাহ তা’আলা সার্বজনীন ও সামগ্রিক হিসেবে ঘোষণা করেছেন।

৪) নবী-রাসুলগণের উপর ঈমান

নবী-রাসুলগণের উপর ঈমানের অর্থ হলো, এই বিশ্বাস পোষণ করা যে, আল্লাহ তা’আলা প্রত্যেক সম্প্রদায়ের জন্য তাদের মধ্য হতে একজনকে নবী বা রাসুল হিসেবে পাঠিয়েছেন। সকল নবীই সত্যবাদী, সত্যায়নকারী, পুণ্যবান, সঠিক পথের দিশারী, তাকওয়াবান ও বিশ্বস্ত ছিলেন। আল্লাহ তাঁদেরকে যা কিছু দিয়ে প্রেরণ করেছেন তারা তা পরিপূর্ণভাবে তাদের সম্প্রদায়ের নিকট পৌঁছিয়ে দিয়েছেন। কোন অংশই তাঁরা গোপন করেননি বা পরিবর্তন করেননি। ওহির মধ্যে নিজ থেকে তাঁরা কোনো সংযোজন বা বিয়োজনও করেননি। সমস্ত নবি-রাসুলদের দাওয়াতের মূল বিষয়ই ছিল তাওহিদ। কিন্তু তাদের শরিয়াহ তথা ইবাদাত-বন্দেগি ও আইন-কানুনে কিছুটা পার্থক্য ছিল। সকল নবী-রাসূলের মধ্যে সর্বশেষ রাসুল হচ্ছেন আমাদের নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম। তাঁর পরে আর কোনো নবী বা রাসুল নেই। আমরা পূর্ববর্তী সকল নবী-রাসুলকেই স্বীকৃতি দেবো, তবে আমল করব আমাদের নিকট প্রেরিত রাসুলের শরিয়তের আলোকে।

৫) আখিরাতের উপর ঈমান

পরকালের উপর ঈমানের অন্তর্ভুক্ত হলো, মৃত্যু ও এর পরবর্তী জীবন, কবরের শাস্তি ও শান্তি, পূনরুত্থান, হাশর, মিযান, শাফায়াত, হাওজে কাওসার, পুলসিরাত, জান্নাত-জাহান্নাম ও মহান রবের দিদারসহ কুরআন ও সুন্নাহয় বিবৃত পরকাল সংক্রান্ত বিষয়াবলির প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করা। শুধু বিশ্বাসেই এটি সীমাবদ্ধ নয়, বাস্তব জীবনেও এর প্রতিফলন জরুরি। বস্তুত আখিরাতে বিশ্বাস এমন একটি ব্যাপার যা ব্যক্তির মাঝে আমূল পরিবর্তন এনে দেয়।

৬) তাকদিরের ভালো-মন্দের উপর ঈমান

তাকদির মহান রবের এক রহস্য। আল্লাহ তা’আলার আদল ও ইনসাফের দিকে খেয়াল রেখে আমাদের উচিত তাকদিরের প্রতি অকুন্ঠ বিশ্বাস স্থাপন করা। আল্লাহ সমস্ত সৃষ্টির স্রষ্টা, সমস্ত কর্মেরও স্রষ্টা। তিনি মানুষকে সৃষ্টির পঞ্চাশ হাজার বছর পূর্বেই তার তাকদির নির্ধারণ করেছেন। দুনিয়াতে মানুষকে প্রাথমিক ইচ্ছাশক্তি দিয়েছেন, ভালো-মন্দ উভয়টি বান্দাকে জানিয়ে দিয়েছেন, এরপরও চূড়ান্তভাবে কোনো কিছুই আল্লাহর ইচ্ছার বাইরে নয়। মানুষ সসীম, মানুষের চিন্তাশক্তিও সসীম, আর আল্লাহ হলেন অসীম। আর সসীম দিয়ে অসীম কোনো কিছুকে কখনও আয়ত্ব করা যায় না।