ইসলামে গোসল-এর বিধিবিধান কী তা জেনে নিন

আকীদাহ ১২ মার্চ ২০২১ Contributor
জানা-অজানা
ইসলামে গোসল
© Milkovasa | Dreamstime.com

গোসল আমাদের প্রাত্যাহিক জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ। ইসলামে গোসল শুধুমাত্র দৈনন্দিন জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজই নয়, বরং পবিত্রতার অংশ। গোসল ইসলামের পবিত্রতা সংক্রান্ত বিধানের গুরুত্বপূর্ণ একটি আলোচিত বিষয়। কেননা পবিত্রতা অর্জন ছাড়া কোনো প্রকার ইবাদত আল্লাহর নিকট কবুল হয় না। তাই প্রত্যেক মুসলিমের জন্য গোসল সংক্রান্ত ইসলামী বিধিবিধান জানা একান্ত জরুরী।

গোসলের আভিধানিক ও পারিভাষিক অর্থ

কোনো কিছুর ওপর পানি পূর্ণাঙ্গরূপে বইয়ে দেওয়াকে গোসল বলে। শরয়ী পরিভাষায় গোসলের অর্থ ইবাদতের উদ্দেশ্যে সুনির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী পূর্ণাঙ্গরূপে সমস্ত শরীর ধৌত করাকে ইসলামে গোসল বলে।

ইসলামে গোসল ফরজ হওয়ার কারণসমূহ

১) বীর্যপাত

বীর্য হল গাঢ়, সাদা পানি যা যৌন-উত্তেজনাসহ লজ্জাস্থান থেকে বের হয় এবং এরপর শরীর অবসাদগ্রস্ত হয়ে পড়ে। পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে, “আর যদি তোমরা অপবিত্র থাকো, তবে ভালোভাবে পবিত্র হয়ে নাও।” (৫:৬)

আলী (রাযি:) এ প্রসঙ্গে বলেন, “কেউ যদি সজোরে পানি নির্গত করে (অর্থাৎ, বীর্যপাত করে), তবে সে যেন গোসল করে নেয়।” (আবু দাউদ)

২) সঙ্গম ঘটলে

পুরুষের ও স্ত্রীর লজ্জাস্থানের সম্মিলনকে সঙ্গম বলে। আর এটা ঘটে পুরষাঙ্গের পুরো অগ্রভাগ যদি যোনির অভ্যন্তরে প্রবেশ করে তবে। এতটুকু হলেই সঙ্গম বলে ধরা হবে এবং বীর্যপাত না ঘটলেও পুরুষ ও নারী উভয়ের উপর গোসল ফরজ হয়ে যাবে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “নারী ও পুরুষের লজ্জাস্থানের সম্মিলন ঘটলেই (তাদের উভয়ের উপর) গোসল ফরজ হয়ে যাবে।” (তিরমিযী)

৩) কাফির ব্যক্তি মুসলমান হলে

কোনো কাফের যখন ইসলাম গ্রহণ করত, তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে গোসল করার নির্দেশ দিতেন।

৪) মহিলাদের হায়েয ও নিফাস বন্ধ হলে

আয়েশা (রাযিঃ) বলেন, নবী কারিম সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “হায়েয আসলে সালাত ছেড়ে দাও, আর হায়েয চলে গেলে গোসল করো ও পুনরায় সালাত শুরু করো।” আর নিফাসের হুকুমও হায়েয এর মতই, এ ব্যাপারে কারো দ্বিমত নেই।

৫) মৃত্যু ঘটলে

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও সাহাবায়ে কেরামের নিয়ম ছিল কেউ মৃত্যুবরণ করলে জানাজার সালাত আদায়ের পূর্বে মৃতের গোসল দিতেন।

ইসলামে গোসলে-এর পূর্ণাঙ্গ বিবরণ

ইসলামে গোসল-এর ক্ষেত্রে ফরজ হলো গোসলের নিয়তে সমস্ত শরীর পানি দিয়ে ধৌত করা, তা যেভাবেই হোক না কেন। তবে মুস্তাহাব হলো রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম যেভাবে গোসল করতেন তা অনুসরণ করা। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জানাবত (অপবিত্রতা) থেকে গোসলের জন্য পানি রাখতেন। অতঃপর ডান হাত দিয়ে বাম হাতে দুই অথবা তিনবার পানি ঢালতেন। এরপর তিনি তাঁর লজ্জাস্থান ধৌত করতেন। এরপর তিনি জমিনে অথবা দেয়ালে দুই অথবা তিনবার হাত মারতেন। অতঃপর তিনি কুলি করতেন এবং নাকে পানি দিতেন।

এরপর তাঁর চেহারা ও দুই হাত কনুইসহ ধৌত করতেন। এরপর মাথায় পানি ঢালতেন। অতঃপর সমস্ত শরীর ধৌত করতেন। গোসল শেষ হয়ে গেলে তিনি সেই জায়গা থেকে সরে দাঁড়াতেন এবং দুই পা ধৌত করে নিতেন। এরপর গা মোছার জন্য কেউ কাপড়ের টুকরা নিয়ে আসলেও তিনি সাধারণত তা নিয়ে নিজ হাত দিয়েই শরীরের পানি ঝেড়ে ফেলতেন।

এরকমই ছিল রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পূর্ণাঙ্গ ফরজ গোসল।

মুস্তাহাব গোসল

গোসল ফরজ না হলেও যেকোনো সময় গোসল করা যায়। তবে কিছু সময় গোসলের কথা হাদিস শরীফে বর্ণিত হয়েছে। এ সময়গুলিতে গোসলকে মুস্তাহাব গোছল বলা হয়।

১) জুম’আর সালাত আদায়ের জন্য গোসল করা মুস্তাহাব। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “যে ব্যক্তি জুম’আর জন্য অযু করল সে এর দ্বারাই নেয়ামত পেয়ে গেল, আর যে ব্যক্তি গোসল করল, সেই উত্তম কাজ করল।”

২) হজ্ব ও উমরাহ পালনের জন্য গোসল করা মুস্তাহাব। যায়েদ ইবনে ছাবিত (রাযি:) বলেন, তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে হজ্জ্ব পালনের জন্য ইহরামের উদ্দেশ্যে কাপড় পরিত্যাগ করে গোসল করতে দেখেছেন।

৩) মৃত ব্যক্তিকে গোসল দেওয়ার পর নিজে গোসল করা মুস্তাহাব। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “যে ব্যক্তি কোনো মৃত ব্যক্তিকে গোসল করায়, সে যেন নিজেও গোসল করে নেয়।”

যা উচিত নয়

১) গোসল ফরজ হলে এই পরিমাণ দেরি করা উচিত নয় যে, সালাতের ওয়াক্ত চলে যায়।

২) কোনো নারী মাসিক থেকে পবিত্র হওয়ার পরও পরবর্তী ফরজ সালাত ছেড়ে দেওয়া উচিত নয়। যেমন- যদি কোনো নারী যোহরের সালাতের শেষ ওয়াক্তে পবিত্র হয় এবং এক রাকাত পড়া যাবে এমন সময়ও বাকী থাকে তবে তার ওপর যোহরের সালাত ফরজ বলে গণ্য হবে এবং গোসল করে তাকে যোহরের সালাত আদায় করতে হবে।