ইসলামে জীবনের অধিকার এবং নিন্দনীয় অপরাধ

কুরআন ১৭ ডিসে. ২০২০ Tamalika Basu
মতামত
জীবনের অধিকার
ID 84804721 © Sanchai Rattakunchorn | Dreamstime.com

আল্লাহ তা’আলা মানুষকে তাঁর কুদরতী হাত দ্বারা সৃষ্টি করে সম্মানিত করেছেন। অতঃপর তিনি মানুষের আদি পিতা আদম(আঃ) কে ফেরেশতাদের মাধ্যমে সেজদা করিয়ে, আকাশে ও যমীনে যা কিছু রয়েছে সবই তাঁর অধীন করে দিয়েছেন। অতঃপর পৃথিবীতে তাঁর ও তাঁর সন্তানদের আধিপত্য সৃষ্টি করে দিয়েছেন। সমস্ত প্রাণীকূলের মধ্যে তিনি মানুষকে সর্বশ্রেষ্ঠ ঘোষণা করেছেন। এরই পরিপ্রেক্ষিতে মানুষকে আল্লাহ কিছু অধিকার প্রদান করেছেন। যার মধ্যে সর্বোৎকৃষ্ট হল জীবনের অধিকার।

মানুষের জীবনের অধিকার সম্পর্কে আল্লাহ বলেন,

“…এবং আল্লাহ যার হত্যা নিষিদ্ধ করেছেন যথার্থ কারণ ব্যতীত তাকে হত্যা করো না।” (আল কুরআন-৬:১৫১)

নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম যখন কিসাসের(শরয়ী কারণে হত্যা) অনুমতি দেন তখন এর সঠিক ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, “তিনটি ক্ষেত্র ব্যতীত কোনো মুসলমানের রক্ত ঝড়ানো জায়েয নয়। বিবাহিত কেউ ব্যভিচার করলে, কেউ কাউকে হত্যা করলে এবং কেউ ইসলাম ত্যাগ করলে এবং তার সাথিদের থেকে পৃথক হয়ে গেলে।” (মুসলিম)

হত্যা জঘন্য পাপ

কাউকে হত্যার ভয়াবহতা উল্লেখ করে আল্লাহ বলেন, “যে ব্যক্তি কোন মু’মিনকে ইচ্ছাপূর্বক হত্যা করবে, তার শাস্তি জাহান্নাম। যাতে সে স্থায়ীভাবে থাকবে এবং তার উপর আল্লাহর ক্রোধ ও অভিসম্পাত বর্ষিত হবে। আল্লাহ তার জন্য মহাশাস্তি নির্দিষ্ট করে রেখেছেন।” (আল কুরআন-৪:৯৩)

অধিকন্তু, বিভিন্ন সহীহ হাদীসে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, একজন মুমিনকে হত্যা করা জঘন্যতম পাপগুলির মধ্যে অন্যতম একটি। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “কোনো মুমিনকে হত্যা করা সমগ্র দুনিয়া ধ্বংস হয়ে যাওয়ার মত।” (ইবনে মাজাহ)

অপর একটি হাদিসে নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “যদি আসমানের সমস্ত অধিবাসী এবং যমিনের সমস্ত অধিবাসী একজন মুমিনকে হত্যায় অংশ নেয়, তবে আল্লাহ তাদেরকে সকলকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করবেন।” (তিরমিযী) এছাড়াও, রাসূল সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “যে কোনো মুসলমানকে হত্যায় সাহায্য করবে, কিয়ামতের দিন তার কপালের মাঝ বরাবর লেখা থাকবে ‘আল্লাহর রহমত থেকে বঞ্চিত’।” (বায়হাকী)

অভাবে ঈমান থেকে সরে এসো না

কুরআনেও আমাদেরকে দারিদ্র্য ও অনাহারের ভয়ে শিশুদেরকে হত্যা করা থেকে নিষেধ করা হয়েছে। কুরআনে আল্লাহ বলেন, “এবং দারিদ্র্যতার ভয়ে তোমরা তোমাদের সন্তানদেরকে হত্যা করো না। আমিই তাদেরকে রিযিক দেই আর তোমাদেরকেও, নিঃসন্দেহে তাদেরকে হত্যা করা মহাপাপ।” (আল কুরআন ১৭:৩১)

অপর এক আয়াতে ইসলাম-পূর্ব জাহিলিয়্যাতের যুগে আরবদের মধ্যে প্রচলিত একটি রীতি সম্পর্কে বলা হয়েছেঃ যখন জীবন্ত পুঁতে-ফেলা কন্যা-শিশুকে জিজ্ঞেস করা হবে, কোন্ অপরাধে তাকে হত্যা করা হয়েছে? (আল কুরআন-৮১: ৮-৯)

এরকমভাবে অমুসলিমদের ক্ষেত্রেও জীবনের এই অধিকার প্রযোজ্য। যেসকল অমুসলিম মুসলিম জাতির অধীনে বাস করে এবং মুসলিম শাসকের সাথে চুক্তি রক্ষা করে চলে, তারা ইহুদি বা খ্রিস্টান হোক তাদের জীবনের নিরাপত্তা ইসলাম দিয়েছে। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “যে ব্যক্তি কোনো মুআহিদ(মুসলিম শাসকের সাথে চুক্তিবদ্ধ)-কে হত্যা করল সে জান্নাতের সুগন্ধও পাবে না। আর জান্নাতের সুগন্ধ চল্লিশ বছরের দূরত্ব থেকে পাওয়া যায়।” (বুখারী)

অধিকন্তু, মহান আল্লাহ বলেছেন, “সুতরাং তারা যদি তোমাদের নিকট থেকে পৃথক হয়ে যায়, তোমাদের সাথে যুদ্ধ না করে এবং তোমাদের নিকট সন্ধি প্রার্থনা করে, তাহলে আল্লাহ তোমাদের জন্য তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা অবলম্বনের পথ রাখেননি।” (আল কুরআন-৪:৯০)

আত্মহনন এক অপরাধ

যে ব্যক্তি আত্মহত্যা করে তার ক্ষেত্রেও এটি প্রযোজ্য। আল্লাহ কাউকে নিজেকে নিজের প্রাণ হরণের অধিকার দেননি।

আল্লাহ আমাদেরকে আত্মহত্যার বিরুদ্ধে সতর্ক করে বলেছেন, “তোমরা নিজেদেরকে হত্যা করো না, নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের প্রতি পরম করুনাময় এবং যে কেউ সীমালঙ্ঘন করে অন্যায়ভাবে তা (আত্মহত্যা) করবে, তাকে অগ্নিতে দগ্ধ করব; এটা আল্লাহর পক্ষে সহজ।” (আল কুরআন-৪:২৯-৩০)

এছাড়া আত্মহত্যার ভয়াবহ পরিণতি সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “যে ব্যক্তি পাহাড়ের উপর থেকে লাফ দিয়ে পড়ে আত্মহত্যা করবে, সে জাহান্নামের মধ্যে সর্বদা ঐভাবেই লাফিয়ে পড়ে নিজেকে আগুনে নিক্ষেপ করতে থাকবে। যে ব্যক্তি বিষ পান করে আত্মহত্যা করবে, সেও জাহান্নামের মধ্যে সর্বদা ঐভাবেই নিজ হাতে জাহান্নামের বিষ পান করতে থাকবে। আর যে কোনো ধারালো অস্ত্র দ্বারা আত্মহত্যা করবে, তার কাছে জাহান্নামে সেই ধারালো অস্ত্র থাকবে, যা দ্বারা সে সর্বদা নিজের পেট ফুঁড়তে থাকবে।” (বুখারি, মুসলিম)

এটিই হল ইসলামে জীবনের অধিকার। এই অধিকার নিশ্চিত করে ইসলাম মানুষের জীবনের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করেছে। এভাবে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রেই রয়েছে ইসলামের স্বয়ংসম্পূর্ণ বিধান।