ইসলামে তায়াম্মুম-এর বিধান কী জেনে নিন

আকীদাহ ১১ মার্চ ২০২১ Contributor
জানা-অজানা
ইসলামে তায়াম্মুম

ইসলামে তায়াম্মুম শব্দের আভিধানিক অর্থ কোনো বিষয়ের প্রতি ধাবিত হওয়া বা কোনো কিছু সম্পাদনের ইচ্ছা করা। শরয়ী পরিভাষায় তায়াম্মুম বলা হয়, পবিত্রতা অর্জনের উদ্দেশ্যে চেহারা ও দুই হাত পবিত্র মাটি দিয়ে মাসেহ করা।

কুরআন-সুন্নাহয় রয়েছে মানুষের জীবনের যাবতীয় সমস্যার সমাধান। পবিত্রতা অর্জনের মাধ্যম হিসেবে ইসলাম সাধারণ অবস্থায় অযু ও গোসলের বিধান দিয়েছে। কিন্তু যখন পানি পাওয়া যাবে না অথবা কোনো ব্যক্তি অসুস্থ হয়ে পানি ব্যবহারে অপারগ হবে তখন পবিত্রতা অর্জনের জন্য করণীয় কি? এরই পরিপ্রেক্ষিতেই আল্লাহ তা’আলা দিয়েছেন তায়াম্মুমের বিধান।

ইসলামে তায়াম্মুম-এর হুকুম

পানির সন্ধান পাওয়া না গেলে বা পানি ব্যবহারে অপারগ হলে ইসলামের যেসকল বিধান মানার জন্য পবিত্রতা অর্জন করা ফরজ, সেসবের জন্য তায়াম্মুম করা ফরজ। যেমন- সালাত আদায় করা বা কুরআন তিলাওয়াত করা। আর যেসকল বিধানের জন্য পবিত্রতা অর্জন করা মুস্তাহাব বা নফল সেসবের জন্য তায়াম্মুম করাও মুস্তাহাব। যেমন- ঘুমের পূর্বে

আল্লাহ তা’আলা বলেন, “তোমরা যদি পানি না পাও, তবে পবিত্র মাটি দ্বারা তায়াম্মুম করো। অতঃপর তোমাদের মুখ ও হাত তা দ্বারা মাসেহ করো।” (৫:৬)

তায়াম্মুম শরীয়তের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার হিকমত

১) উম্মতে মুহাম্মদীর জন্য শরীয়তকে সহজ করা।

২) যেসকল অবস্থায় পানি ব্যবহারের ফলে কোনো ব্যক্তির ক্ষতির আশঙ্কা থাকে সেগুলি দূর করা। যেমন- অসুস্থ হয়ে পড়লে, প্রচণ্ড শীতের মধ্যে ইত্যাদি।

৩) ইবাদতের সাথে বান্দার সম্পর্ক অব্যাহত রাখা। অর্থাৎ, পানি না থাকার দরুণ বান্দা যেন কখনও ইবাদত থেকে বিচ্ছিন্ন না হয়ে যায়।

যেসকল অবস্থায় তায়াম্মুম করা বৈধ

১) পানির অনুপস্থিতিতে। আল্লাহ বলেন, “অতঃপর তোমরা যদি পানি না পাও, তবে তায়াম্মুম করে নাও।”

২) পানি উপস্থিত থাকা সত্ত্বেও তা ব্যবহার করতে অপারগ হলে। যেমন- এমন অসুস্থ অথবা বৃদ্ধ ব্যক্তি যে নিজ থেকে নড়াচড়া করতে পারে না এবং তার কাছে এমন ব্যক্তিও নেই যে তাকে অযু বা গোছল করার ব্যাপারে সাহায্য করবে।

৩) পানি ব্যবহার করার ফলে শারীরিক কোনো ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা থাকলে। যেমন- এমন অসুস্থ ব্যক্তি, পানি ব্যবহার করলে যার অসুস্থতা বেড়ে যাবে। অথবা প্রচন্ড ঠান্ডায় যদি পানি গরম করার মত কোনো ব্যবস্থা না থাকে এবং পানি ব্যবহার করলে অসুস্থতা বেড়ে যাবে এরকম প্রবল ধারণা থাকলে। এ অবস্থায় তায়াম্মুম করার অনুমতি রয়েছে। অথবা কোনো ব্যক্তি যদি পানির উৎস থেকে দূরে কোথাও অবস্থান করে এবং তার সাথে পান করার মতো সামান্য পানি অবশিষ্ট থাকে এবং নতুন করে পানি প্রাপ্তির সম্ভাবনা না থাকে।

ইসলামে তায়াম্মুম বিশুদ্ধ হওয়ার শর্তাবলি

আটটি শর্ত একসঙ্গে পাওয়া না গেলে কোনো অবস্থাতেই তায়াম্মুম শুদ্ধ হবে না।

১। নিয়ত করা।

২। এমন কোনো ওজর বা অপারগতার উপস্থিতি থাকতে হবে, যার কারণে তায়াম্মুম করা বৈধ হয়।

ইসলামে তায়াম্মুম বৈধ হওয়ার অপারগ পরিস্থিতিগুলো হল—

  • কোনো ব্যক্তি ও পানির মধ্যকার দূরত্ব যদি নূন্যতম এক মাইল বা তার চেয়েও বেশি হয়।
  • পানি ব্যবহারের কারণে রোগ সৃষ্টি বা রোগ বৃদ্ধির প্রবল সম্ভাবনা বা প্রাণহানির আশঙ্কা থাকলে।
  • পানির পরিমাণ এত কম যে, এই পানি ব্যবহার করে ফেললে নিজে অথবা অন্যরা পিপাসাকাতর হয়ে কষ্টের সম্মুখীন হবে।
  • পাশেই কোনো কূপ আছে। কিন্তু তার মধ্যে পানি এত নিচে যে, তা থেকে পানি উঠানোর কোনো ব্যবস্থা নেই।
  • পানি নিকটেই আছে, কিন্তু শত্রু অথবা ভয়ংকর কোনো পশুর কারণে পানি সংগ্রহ করতে অপারগ।

এরকম প্রবল ধারণা আছে যে, অযু করতে গেলে ঈদ বা জানাজার সালাত ছুটে যাবে। তখন তায়াম্মুম করা যাবে। কারণ ঈদ বা জানাজার সালাতের কোনো কাযা বা বিকল্প নেই।

৩। পবিত্র মাটি মৃত্তিকাজাত বস্তু দ্বারা তায়াম্মুম করতে হবে। যেমন—পাথর, বালু, ধুলা ইত্যাদি। সুতরাং গাছপালা, সোনা, রুপা ইত্যাদি দ্বারা তায়াম্মুম করলে তায়াম্মুম আদায় হবে না।

৪। সম্পূর্ণ মুখমণ্ডল এবং দুই হাতের কনুই পর্যন্ত মাসেহ করতে হবে।

৫। হাতের সম্পূর্ণ তালু অথবা বেশিরভাগ অংশ দ্বারা মাসেহ করতে হবে। সুতরাং, কেউ যদি দুই আঙুল দ্বারা মাসেহ করে তবে তার তায়াম্মুম শুদ্ধ হবে না।

৬। উভয় হাতের তালু মাটির ওপর দুইবার মারতে হবে। একবার মুখমণ্ডল মাসেহের জন্য এবং আরেকবার উভয় হাত মাসেহের জন্য। একই স্থানে দুইবার মারলেও তায়াম্মুম আদায় হয়ে যাবে। তেমনি যদি শরীরে মাটি লেগে থাকে তাহলে তায়াম্মুমের নিয়তে মাসেহ করলেও তায়াম্মুম আদায় হয়ে যাবে।

৭। হাত দ্বারা মাসেহ করার সময় শরীরের চামড়ার ওপর কোনো প্রতিবন্ধক যেমন—মোম বা চর্বিজাত দ্রব্য ইত্যাদি থাকতে পারবে না। যদি থাকে তাহলে এসব বস্তু অপসারণ করা আবশ্যক। অন্যথায় তায়াম্মুম শুদ্ধ হবে না।

৮। তায়াম্মুম করার সময় তায়াম্মুম ভঙ্গ হয়ে যায় এমন কোনো বিষয় না থাকা বা কাজ না করা। যেমন—নারীদের হায়েজ, নেফাস বা প্রস্রাব-পায়খানা চলাকালে তায়াম্মুম করলে তা আদায় হবে না।

যেসব কারণে তায়াম্মুম ভঙ্গ হয়ে যায়

১) পানি বর্তমান থাকা বা পানির সন্ধান পাওয়া।

২) অযু ভঙ্গকারী কোনো বিষয় সংঘটিত হওয়া।

৪) গোসল ফরজ হয় এমন কোনো বিষয় সংঘটিত হওয়া।

৫) যেসব ওজর বা অপারগতার কারণে তায়াম্মুম করা শরীয়তসিদ্ধ সেসব কারণ দূর হয়ে যাওয়া।