ইসলামে ন্যায়বিচার সকলের জন্য সমান

Statue of Scales of justice with Mosque in background
© Typhoonski | Dreamstime.com

যেকোনো দেশ বা সমাজের উন্নতি নির্ভর করে সেই স্থানের ন্যায়বিচারের উপরের। সমাজের যেকোনো ব্যবস্থা, আইন, রীতিনীতি, অধিকার, কর্তব্য সমস্তকিছুরই পিছনে থাকে ন্যায়বিচার। সমাজ কতটা সুস্থ, স্বাভাবিক এবং ইতিবাচক হবে, তা নির্ভর করে সমাজের মানুষের চেতনা, বিবেক ও দায়িত্বশীলতার উপর। উচ্ছৃঙ্খল বা বিলাসযাপনকারীরা সমাজের উন্নতিসাধন ঘটাতে পারে না। রাষ্ট্রের রীতিনীতিও নির্ভর করে শাসক বা শাসকগোষ্ঠীর ন্যায়বিচারের মনোভাবের প্রতি। ন্যায়বিচারের পথে যখনই কোনো রকম বাধা আসে, সমাজ নিম্নগামী হতে থাকে।

ইসলামে ন্যায়বিচারের গুরুত্ব অপরিসীম। বলা যেতে পারে ইসলাম ও ন্যায়বিচার এ দু’টি সমার্থক শব্দ। তবে দুঃখের কথা এটাই যে, বর্তমানে কয়েকটি ইসলামীয় দেশে ন্যায়বিচার বিলাসিত মাত্র। সেখানকার শাসকদের স্বৈরাচারিতা, ঘৃণ্য পরিবারতান্ত্রিক ক্ষমতার অপব্যবহার, স্বার্থপরতা এসমস্ত কিছুর জন্য, বর্তমানে ইসলাম রাষ্ট্রগুলিকেই পৃথিবীর সবচেয়ে অশান্ত দেশের সারিতে রাখা হয়। কিন্তু কেন? ইসলাম আলোর পথ দেখানোর ধর্ম, শান্তির ধর্ম, এখানে ন্যায়বিচারই সর্বোচ্চ প্রাধান্য পায়।

সুরা হাদিদ এর আয়াত ২৫-এ বলা হয়েছে, সমস্ত নবীগণ ও রাসূলকে আল্লাহ প্রেরণ করেছেন পৃথিবীতে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা ও তা কার্যকর করা জন্য।

সর্বশক্তিমান আল্লাহ তাআলা যখনই দেখেছেন কোথাও গাইরুল্লাহর পূজো করা হচ্ছে, ন্যায়বিচারের পরোয়া না করে সমাজবিধি কলুষিত হচ্ছে তখনই তাঁর নবী ও রাসুলদের পাঠিয়েছেন ন্যায়বিচার ও শান্তি পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করতে। সেভাবেই এসেছিলেন মানবের সর্বশেষ মহান নবী মুহাম্মদ (সা.) আরবে যখন সেখানে মূর্তিপূজোর প্রচলন হয়েছিল। তাঁর আগমনের সাথে সেখানে মূর্তিপূজোর প্রচলন লোপ পায় এবং ন্যায়বিচার ও শান্তি প্রতিষ্ঠা পায়।

আল্লাহ তাআলার নির্দেশ অনুসারে রাসূল (সা.) ন্যায়বিচারকে প্রতিষ্ঠা করেন ও তার মানদন্ড সুনির্দিষ্ট করেন। এই ন্যায়বিচার সবার জন্য সমান, কোনোরকম জাতি-ধর্ম-বর্ণ, সামাজিক পদমর্যাদা, পারিবারিক পরিচয়ের আধারে সবার ক্ষেত্রেই সমান, কারো জন্য এতটুকু বেশি শিথিল বা কঠোর নয়। একজন সত্যিকারের বিচারক সেই যে এই মানদন্ড গুলিকে মাথায় রেখে, নিজের বিশ্লেষণ ও পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে সঠিক বিচার করবে। যে বিচারে বিনা অপরাধে শাস্তি হয় বা অপরাধী বেকসুর খালাস পায় তা ন্যায়সঙ্গত নয় অর্থাৎ তা ইসলাম বিরুদ্ধ। এ প্রসঙ্গে উল্লেখ করা যেতে পারে মহান নবি করিম (সা.) এর কথা। স্বয়ং আহকামুন হাকিমিন আল্লাহ তাআলা তাঁকে বিচারক হিসেবে মনোনীত করেন। সুরা নিসা আয়াত ১০৫এ বলা আছে, “আপনি যেন আল্লাহর দেখানো পথে, ন্যায়সঙ্গত ভাবে মুক্তির আলোকে বিচার করেন, আমি তা সত্যসহকারে কিতাব নাযিল করছি।”

সুরা নিশার ১৩৫ নং আয়াতে সর্বশক্তিমান মহান আল্লাহ তাআলা বলেন, “হে ইমানদার মানুষগণ, তোমরা আল্লাহর দেখানো পথে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করো। ন্যায়বিচারের ক্ষেত্রে যদি তোমার পিতামাতা, সন্তান, স্ত্রী অথবা কোনো ঘনিষ্ঠ আত্মীয়ও যদি দোষী সাব্যস্ত হয়, তাহলে তার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য বা সিদ্ধান্তে ইতস্তত করো না। কোনোরকম কৌশলে বা ভণিতায় এই পথ থেকে সরে আসবেনা, জেনে রাখবে আল্লাহ তাআলা সমস্ত বিষয়েই অবগত।

ন্যায়বিচার সম্বন্ধে রাসূল (সা:) ও তাঁর অনুগামীদের অনমনীয় মনোভাবের উদাহরণ অনেক আছে। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ইহুদি ও মুসলমানের একটি ঘটনা।

একবার এক ইহুদি ও এক মুসলমান ব্যক্তির মধ্যে বাকবিতন্ডা হয়। তখন ইহুদি প্রস্তাব দেয় মুহাম্মদ (সা:)-এর কাছে এর ন্যায়বিচার করার। কিন্তু বিশর নামের এই মুসলমান চাইছিল না রাসূলের কাছে এই বিষয় নিয়ে যেতে। কারণ, ইহুদির দাবি ছিল ন্যায়সঙ্গত এবং বিশর নামক লোকটি অন্যায়ভাবে ঝগড়া করছিল। স্বাভাবিক ভাবেই রাসূল বিচার করেন ও ইহুদি ব্যক্তির পক্ষে রায় দেন। রাসূলের বিচার মনপসন্দ না হয়, বিশর ওমর (রা:) এর কাছে যান বিচারের জন্য। সেখানে ইহুদি ব্যক্তিটি সমস্ত ঘটনা খুলে বলেন এবং মুহাম্মদ (সা:) -এর বিচারের কথাও উল্লেখ করেন। সমস্ত শুনে ওমরা (রা:) বিশরকে জিজ্ঞাসা করেন কথা গুলো সত্য কিনা। বিশর স্বীকার করলে ওমর (রা:) ঘরের ভিতর থেকে তলোয়ার নিয়ে এসে বললেন, “যে ব্যক্তি রাসূল (সা:) বিচারকে অস্বীকার করে, তার বিচার তলোয়ার।