ইসলামে পণ্য মজুদদারির বিধান জানেন কি?

ব্যবসা Contributor
জানা-অজানা
ইসলামে পণ্য মজুদদারির
Photo: Dreamstime

অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে বরবাদ ও ধ্বংস করার জন্য যত প্রকার অর্থনৈতিক অসাধু উপায় আছে তার মধ্যে অন্যতম একটি হল পণ্য মজুদদারী। মজুদদারির প্রভাবে নিত্যপ্রয়োজনীয় সহ সকল প্রকার দ্রব্যের ক্রয়মূল্য আকাশচুম্বী হয়ে যায়। এতে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা ব্যাহত হয় এবং সাধারণ জনগণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বিশেষ করে নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য জীবিকা নির্বাহই কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। তাই ইসলামে মজুদদারী সম্পূর্ণরূপে হারাম।

এতদসত্ত্বেও বাজারের স্বাভাবিক গতিপ্রবাহে বাধা সৃষ্টিকারী এরকম দুষ্কর্ম ব্যবসা-বাণিজ্য ও অর্থনীতির অবিচ্ছেদ্য অনুষঙ্গ হয়ে দাঁড়িয়েছে। মজুদদারী আধুনিক পুঁজিবাদী ব্যবস্থার অন্যতম ভিত্তি এবং অধিকাংশ কোম্পানীতে অর্থনৈতিক লেনদেনের অন্যতম বৈশিষ্ট্যে পরিণত হয়েছে। অথচ এটি তার অভ্যন্তরে ধ্বংস ও বিনাশের বীজ বহন করে। কারণ এটি যুলুম, অন্যায়, মূল্যবৃদ্ধি ও বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তাছাড়া এতে ব্যবসা ও শিল্পের স্বাধীনতা ক্ষুণ্ণ হয় এবং মজুদদার নন এমন ব্যক্তিদের সামনে কর্মক্ষেত্র ও জীবিকার দরজা বন্ধ করে দেয়া হয়।

ইসলামে পণ্য মজুদদারির সংজ্ঞা

মজুদদারির আরবী প্রতিশব্দ ‘আল-ইহতিকার’ বা ‘আল-হুকরাহ’। এর অর্থ জমা করা। আভিধানিক অর্থে খাদ্যদ্রব্য বা খাদ্যজাত অন্যান্য জিনিস মজুদ করাকে মজুদদারী বলে।

পারিভাষিক অর্থে, মজুদদারির অর্থ দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির সময় ব্যবসায়ী কর্তৃক ক্রয়কৃত পণ্য বিক্রি করা থেকে বিরত থাকা, যাতে মানুষের তীব্র প্রয়োজনের সময় সে ক্রয়কৃত মূল্যের চেয়ে বেশী মূল্যে তা বিক্রি করতে পারে।

ইমাম আবু দাঊদ (রহঃ) বলেন “আমি ইমাম আহমাদ বিন হাম্বল (রহঃ)-কে জিজ্ঞাসা করলাম যে, কোন জিনিস গুদামজাত করা নিষেধ?” তিনি বললেন, “মানুষের দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় সকল জিনিস। অর্থাৎ যাতে মানুষের জীবন ও জীবিকা রয়েছে।”

পণ্য মজুদদারের প্রকারভেদ

পণ্য মজুদদারি মূলত দুই প্রকার। ১) যে ব্যবসায়ী বা ক্রেতা দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির প্রতীক্ষায় থাকে না। বরং বাজারে পণ্যের মূল্য সস্তা ও পণ্যদ্রব্য পর্যাপ্ত দেখে নিজের জন্য তা কিনে জমা করে রাখে। এরূপ ব্যক্তিকে ইসলামী পরিভাষায় মূলত মজুদদার বলে না। বরং তাকে সঞ্চিতকারী বলা হয়। সে নিজের জন্যই পণ্য জমা করে রেখেছে। আর যেকোনো মানুষের জন্য তার বাড়ি ও পরিবারের এক বছরের প্রয়োজনীয় জিনিস জমা করে রাখা জায়েয আছে।

২) দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির প্রতীক্ষায় যে পণ্যসামগ্রী মজুদ করে রাখে এবং মানুষের প্রয়োজন যখন তীব্র হয় তখন সে মূল্য নিয়ন্ত্রণ করে উচ্চমূল্যে পণ্য বিক্রি করে থাকে। এই দ্বিতীয় প্রকার ব্যক্তিই ইসলামী পরিভাষায় প্রকৃত মজুদদার। হাদীছে এরূপ মজুদদারকেই অপরাধী সাব্যস্ত করে তার উপর লানত করা হয়েছে।

অতিরিক্ত মুনাফা লাভের আশায় খাদ্যদ্রব্য মজুদ করে রেখে যে বাজারে কৃত্তিম সংকট সৃষ্টি করা হয় তাই হল মজুদদারী। মূলত একদল মধ্যস্ততাভোগী ব্যবসায়ী অবৈধভাবে মুনাফা লাভের আশায় এ ঘৃণিত কাজটি করে থাকে। এভাবে বাজারে পন্যের মূল্য বাড়ানো এবং অধিক মুনাফার প্রত্যাশা করাকে ইসলাম অবৈধ ঘোষণা করেছে। এটি সম্পূর্ণরূপে হারাম। এর ফলে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস পায় এবং বেশিরিভাগ মানুষ দুর্ভোগের শিকার হয়। এ ধরনের কাজ সাধারণ মানুষের জীবিকার কষ্টকে বহুগুণে বাড়িয়ে দেয়।

ইসলামে পণ্য মজুদদারির শাস্তির বিধান

তাই ইসলাম এ প্রকার কাজকে হারাম করেছে। এ প্রসঙ্গে রাসুল সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “যে ব্যক্তি মুসলমানদের খাদ্যদ্রব্য মজুদ করে রাখে, আল্লাহ তা’আলা তার ওপর দরিদ্রতা ও অভাব চাপিয়ে দেন।” (আবু দাউদ)

নিত্যপ্রয়োজনীয় ব্যবসায়িক পণ্য বিক্রি না করে, মজুদ করে, কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে বর্ধিত মুনাফা আদায়ের প্রচেষ্টা একটি সামাজিক অপরাধ। রাসুল সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম এদের সম্পর্কে বলেছেন, “যে খাদ্যশস্য গুদামজাত করে সে অভিশপ্ত।” (ইবনে মাজাহ) তিনি আরও বলেছেন, “যে ব্যক্তি ৪০ দিনের খাবার মজুদ রাখে, সে আল্লাহর দায়িত্ব থেকে বেরিয়ে যায়।”

তবে মজুদকৃত পণ্য যদি মানুষের নিত্যপ্রয়োজনীয় বস্তু না হয় কিংবা মানুষ এর মুখাপেক্ষী না হয় অথবা এসব পণ্য যদি চাহিদার অতিরিক্ত হয়, তাহলে এসব অবস্থায় পণ্য মজুদ রাখা অবৈধ নয়।

পণ্য মজুদদারি বিষয়ে মুসলিম শাসকদের ভূমিকা

খোলাফায়ে রাশেদীন সহ প্রথম যুগের মুসলিম শাসকগণও মজুদদারির বিষয়ে কঠোর ছিলেন। উমর (রাযিঃ) ব্যবসায়ীদের পণ্য মজুদকরণ সম্পর্কে ঘোষণা করেছিলেন, “আমাদের বাজারে কেউ যেন পণ্য মজুদ করে না রাখে। যাদের হাতে অতিরিক্ত অর্থ আছে তারা যেন বহিরাগত ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে সমস্ত খাদ্যশস্য কিনে তা মজুদ করে না রাখে। যে ব্যক্তি শীত ও গ্রীষ্মের কষ্ট সহ্য করে আমাদের এখানে খাদ্যদ্রব্য নিয়ে আসে সে আমাদের মেহমান। অতএব, সে তার আমদানীকৃত খাদ্যদ্রব্য যে পরিমাণে ইচ্ছা বিক্রি করতে পারবে, আর যে পরিমাণে ইচ্ছা রেখে দিতে পারবে।”

উসমান (রাযিঃ) তাঁর খিলাফত কালে পণ্য মজুদ নিষিদ্ধ করেছিলেন। আলী (রাযিঃ) মজুদদারির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেছিলেন। তিনি তাঁর খিলাফাতকালে মজুদকৃত খাদ্যদ্রব্য আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দিয়েছিলেন। যেহেতু মজুদদারি জনসাধারণের স্বার্থের পরিপন্থী তাই ইসলামে তা সম্পূর্নরূপে নিষিদ্ধ।

ইসলাম নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য সুলভ মূল্যে বিক্রয় করার জন্য কঠোর নির্দেশ দিয়েছে। আর যে কোনো ধরনের মজুদদারিকে জঘন্য ধরনের অপরাধ হিসেবে ঘোষণা করেছে। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে শুরু করে খোলাফায়ে রাশেদীনসহ পরবর্তী ইসলামী শাসকগণও মজুদদারির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করেছিলেন।

Enjoy Ali Huda! Exclusive for your kids.
Enjoy Ali Huda! Exclusive for your kids.
Enjoy Ali Huda! Exclusive for your kids.