ইসলামে বন্ধক-এর বিধান: বৈধ বা অবৈধ কোনটা?

অর্থনীতি Contributor
জানা-অজানা
ইসলামে বন্ধক
© Kittipong Jirasukhanont | Dreamstime.com

বর্তমান সমাজে জমি বন্ধকের খুব বেশি প্রচলন রয়েছে। কিন্তু এই বন্ধকের ইসলামী নিয়মনীতি কি সে সম্পর্কে বেশিরভাগ মানুষেরই কোনো ধারণা নেই। তাই আসুন এই নিবন্ধে আমরা ইসলামে বন্ধক সম্পর্কে কিছু শরয়ী বিধি-বিধান জেনে নেই।

ইসলামে বন্ধক-এর অর্থ

আরবিতে ব্যবহৃত শব্দটি হল – রেহেন। আভিধানিক অর্থে এর শাব্দিক অর্থ কোনো কিছুকে বন্ধী করে রাখা। ইসলামী পরিভাষায় রেহেন বলা হয়, কোনো জিনিসকে কোনো প্রাপ্তধনের বিনিময়ে বন্ধী করে রাখা, যাতে পরিবর্তীতে তা দিয়ে নিজ প্রাপ্যকে উসূল করা যায়।

বন্ধক পদ্ধতি ইসলামে বৈধ; তবে এক্ষেত্রে শরয়ী নীতিমালাসমূহকে মানতে হবে। বুঝতে হবে ইসলামে বন্ধক পদ্ধতি বলতে মুলত কি বোঝানো হয়েছে? সুতরাং শরীয়তের গন্ডির ভিতর থেকে বন্ধক দিতে হবে বা নিতে হবে।

ইসলামে বন্ধক বৈধ হওয়ার দলিল

বন্ধক পদ্ধতির বৈধতা কুরআন-সুন্নাহ দ্বারা প্রমাণিত। নিম্নে সংক্ষেপে কিছু দলিল উল্লেখ করা হল-

বন্ধক পদ্ধতির বৈধতা সম্পর্কে আল্লাহ তা’আলা বলেন, “আর তোমরা যদি প্রবাসে থাকো এবং কোনো লেখক না পাও, তবে (ঋণের মুকাবেলায়) বন্ধকি বন্তু হস্তগত করে রাখা উচিত। যদি একে অন্যকে বিশ্বাস করতে পারো। তবে যাকে বিশ্বাস করা হয়, তার উচিত অন্যের প্রাপ্য পরিশোধ করা এবং স্বীয় পালনকর্তাকে ভয় করা। তোমরা সাক্ষ্য গোপন করো না। যে কেউ তা গোপন করবে, তার অন্তর গুনাহপূর্ণ হবে। তোমরা যা করো, আল্লাহ সে সম্পর্কে সম্যক অবগত।” (২:২৮৩)

বন্ধকের বৈধতা সম্পর্কে এক হাদীসে এসেছে, নবীজী সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম নিজেও বন্ধক সুবিধা গ্রহণ করেছেন। হযরত আয়েশা রাযি থেকে বর্ণিত, নবীজী সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম এক ইহুদির কাছ থেকে বাকিতে (নির্দিষ্ট সময়ে মূল্য পরিশোধের শর্তে) খাদ্য ক্রয় করেছেন, অতঃপর মূল্যর জামিন হিসাবে নিজ বর্মকে বন্ধক রেখেছেন।” (মুসলিম)

ইমাম নববী(রহঃ) এই হাদীসের ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে বলেন, “উক্ত হাদীস দ্বারা বন্ধকের বৈধতা প্রমাণিত হয়। এমনকি কাফেরের কাছে যুদ্ধাস্ত্র বন্ধক রাখার বৈধতাও প্রমাণিত হয়। শুধু তাই নয় বরং মুকিম অবস্থায়ও বন্ধক রাখার বৈধতা প্রমাণিত হয়। এবং এটাই চার মাযহাবের স্বীকৃত অভিমত।”

আমাদের দেশে বন্ধকের প্রচলিত পদ্ধতি

ঋণ আদায়ের নিশ্চয়তাস্বরূপ কোনো বস্তু বন্ধক রাখা হয়। এতে ঋণদাতাও নিশ্চিত থাকেন যে, ঋণ আদায় না করলেও বন্ধককৃত বস্তু থেকে পরে আদায় করে নেওয়া যাবে। পবিত্র কুরআনেও এর উল্লেখ এসেছে। যেমন পূর্বে (২:২৮৩) নং আয়াতে উল্লেখ করা হয়েছে।

আয়াত থেকে বুঝে আসে, বন্ধককৃত বস্তু-সামগ্রী বা জমি বন্ধকগ্রহীতার কাছে আমানতস্বরূপ। সুতরাং, বন্ধক নেওয়া জমি থেকে বন্ধকগ্রহীতার কোনো ফায়দা হাসিল করা যেমন ফসল উৎপাদন করা ইত্যাদি নাজায়েজ ও হারাম। এমনকি বন্ধকদাতা অনুমতি দিলেও এমনটি করা যাবে না। কারণ, বন্ধকি জমি থেকে বন্ধকগ্রহীতা কোনো ধরনের ফায়দা হাসিল করা সুদের অন্তর্ভুক্ত, যা সুস্পষ্ট হারাম।

ইবনে সীরিন(রহঃ) বলেন, জনৈক ব্যক্তি আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ(রাযিঃ)-এর নিকট জিজ্ঞাসা করল, “এক ব্যক্তি আমার কাছে একটি ঘোড়া বন্ধক রেখেছে, আমি তা আরোহণের কাজে ব্যবহার করেছি।” ইবনে মাসউদ (রাযিঃ) এ কথা শুনে বললেন, “তুমি আরোহণের মাধ্যমে এর থেকে যে উপকার লাভ করেছ তা সুদ হিসেবে গণ্য হবে।”

বিখ্যাত তাবেঈ কাজি শুরাইহ(রহঃ)-কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, “সুদ পান করা হয় কিভাবে?” তিনি উত্তরে বললেন, “বন্ধকগ্রহীতা বন্ধকি গাভির দুধ পান করলে তা সুদ পান করার অন্তর্ভুক্ত হবে।”

প্রচলিত জমি বন্ধক পদ্ধতির বৈধ বিকল্প

প্রথম পদ্ধতিঃ বন্ধকি জমি থেকে বন্ধকগ্রহীতা উপকৃত বা লাভবান হতে চাইলে এ পদ্ধতি গ্রহণ করতে পারে যে, বন্ধকি চুক্তি বাতিল করে দীর্ঘমেয়াদি ইজারা তথা ভাড়া নেওয়ার পদ্ধতি অবলম্বন করবে। অর্থাৎ যত দিন পর্যন্ত ঋণের টাকা পরিশোধ না হয় ঋণদাতা জমিটি ইজারা পদ্ধতিতে ভোগ করবে এবং তার ন্যায্য ভাড়াও জমির মালিককে দিয়ে দেবে। তবে এ ক্ষেত্রে ঋণ ও ইজারাচুক্তি দুটি ভিন্ন ভিন্ন হতে হবে। দুটি চুক্তিকে মিলিয়ে একটিকে অপরটির সাথে শর্তযুক্ত করা যাবে না।

ইজারা কী?

ইজারা অর্থ ভাড়া দেওয়া। যেকোনো মেয়াদে জমি ইজারা তথা ভাড়া দেওয়া বৈধ। জমি ভাড়া নিয়ে এমন বৈধ কাজে লাগানো জায়েজ হবে যার কারণে জমির উল্লেখযোগ্য তেমন কোনো ক্ষতি হয় না। যদি ইজারাদারকে জমির মালিক সাধারণভাবে যেকোনো ফসল চাষ করার অনুমতি দেন, তবে সে যেকোনো ফসল চাষ করতে পারবে। তবে গাছসহ বাগান ইজারা দেওয়া জায়েজ নয়।

দ্বিতীয় পদ্ধতিঃ বন্দকগ্রহীতা বন্ধকদাতার সঙ্গে ‘বাই-বিল-ওয়াফা’ চুক্তি করবে। অর্থাৎ বন্ধকগ্রহীতার কাছে ঋণী ব্যক্তি তার জমিটি বিক্রি করে দেবে এই ওয়াদার ওপর যে ঋণ পরিশোধ হওয়ার পর বন্ধকগ্রহীতা তার জমিটি আবার তার কাছে বিক্রি করে দেবে। এ ক্ষেত্রে বন্ধকগ্রহীতার মালিকানায় জমিটি যত দিন থাকবে, সে তা মালিক হিসেবে ভোগ করতে পারবে।

Enjoy Ali Huda! Exclusive for your kids.
Enjoy Ali Huda! Exclusive for your kids.
Enjoy Ali Huda! Exclusive for your kids.