ইসলামে মসজিদ পরিচালনার মূলনীতি কী?

ID 118635460 © Alexei Uzinskii | Dreamstime.com

মুসলিম ধর্মালম্বীদের জীবনে মসজিদের প্রভাব অপরিসীম। ধর্মীয় অনুশীলন থেকে শুরু করে জ্ঞান চর্চা,  সামাজিক ঐক্য এবং সম্মিলিতভাবে কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ ও পরিচালনা করার ক্ষেত্রেও আনেকটা মসজিদের উপর নির্ভরশীল।  ইসলাম ধর্মের কর্মকাণ্ডের উচ্চভূমি হচ্ছে মসজিদ। মুসলমানদের আশ্রয়স্থল। মসজিদে আল্লাহর কাছে ক্ষমা,  দয়া ,  জাহান্নাম থেকে মুক্তি এবং মহান রাব্বুল আলামিনের নৈকট্য লাভের জন্য প্রার্থনা করা হয়।  মুসলমানদের জন্য মসজিদ হচ্ছে বাতিঘর।

সুতরাং মসজিদ নির্মাণ, সংস্কার, সুযোগ সুবিধা বৃদ্ধিকরণ এবং যে কোনো চাহিদা পূরণ করে আল্লাহর ঘরের তত্ত্বাবধান করা প্রত্যেক  মুসলিম সমাজের নৈতিক দায়িত্ব। প্রথম করণীয় হচ্ছে মসজিদকে যথাসম্ভব আবাদ রাখা।  অর্থাৎ রাব্বুল আলামিনের এবাদত এবং ধর্ম মোতাবেক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে মসজিদকে প্রাণবন্ত রাখতে হবে।  ইসলামের সোনালী যুগ মসজিদে ধর্মীয় শিক্ষা থেকে শুরু করে সামাজিক বিচার,  যুদ্ধের পরামর্শ পর্যন্ত মসজিদে হত। মসজিদে নববী ছিল মহানবী (সা.)-এর সচিবালয়ের মতো। এ জন্য কোরআনে মসজিদের ব্যাপারে ‘আবাদ’ শব্দের ব্যবহার করা হয়েছে। ইরশাদ হয়েছে, ‘নিশ্চয়ই মসজিদ আবাদ করবে, যারা আল্লাহ ও পরকালের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করে।’ (সুরা : তাওবা, আয়াত : ১৮)। মসজিদে এমন কোন কাজ করা যাবে না যা ইসলাম শরীয়ত বিরোধী এবং মসজিদের ইবাদতের পরিবেশ নষ্ট হয়।  কারণ মসজিদ হচ্ছে আল্লাহর ঘর।  এখানে আল্লাহর ইবাদত এবং দ্বীনি কাজই শুধু অনুমোদিত। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘নিশ্চয়ই মসজিদগুলো আল্লাহর জন্য। সুতরাং আল্লাহর সঙ্গে কাউকে ডেকো না।’ (সুরা : জিন, আয়াত : ১৮)

মসজিদকে সবসময় পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন পাক-পবিত্র রাখা মুসলিম সমাজের দায়িত্ব। মসজিদে ময়লা আবর্জনা ফেলবে না এবং কোনো ময়লা চোখে পড়লে তা নিজ থেকে পরিষ্কার করা উচত। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘মসজিদে থুথু ফেলা পাপ। এ পাপের মার্জনা হলো তা পরিষ্কার করা।’ (সহিহ ইবনে হিব্বান, হাদিস : ১৬৩৭)

ইসলামী শরিয়তের দৃষ্টিতে মসজিদের ব্যাপারে ছয় শ্রেণির মানুষ দায়িত্বশীল। তাঁরা হলেন ইমাম, মুয়াজ্জিন, খাদেম, মক্তব-পরিচালক, কমিটি ও দায়িত্বশীল সরকারি কর্মকর্তা। প্রত্যেকের জন্য নির্ধারিত কিছু দায়িত্ব রয়েছে। যেমন—ইমাম যথাযথভাবে নামাজ করবেন এবং মুসল্লিদের দ্বিনি জ্ঞান, ঈমান ও আমলের উন্নয়নের চিন্তা করবেন। মুয়াজ্জিন যথাসময়ে আজান দেবেন। ইমামকে সহযোগিতা করবেন। খাদিমরা নিজ নিজ কাজ সম্পন্ন করবেন। মক্তব-পরিচালক মুসলিম শিশুদের ফরজ শিক্ষা নিশ্চিত করার জন্য কাজ করবেন। কমিটি ও দায়িত্বশীল কর্মকর্তা মসজিদ ও মুসল্লিদের প্রয়োজনগুলো পূরণের চেষ্টা করবেন। মসজিদের সার্বিক পরিচালনার ক্ষেত্রে ইমামকে পরামর্শ দেবেন এবং তাঁর থেকে পরামর্শ নেবেন। (আহকামুল মাসাজিদ ফিশ-শারিয়াতিল ইসলামিয়া, পৃষ্ঠা : ৪০৫-৮)।

একজন মানুষের ভিতরে কি বৈশিষ্ট্য থাকলে মসজিদ পরিচালনাকারী হিসাবে নিজেকে অন্তর্ভুক্ত করা যাবে সেই বিষয়ে পবিত্র কোরআনের একটি আয়াতে ইঙ্গিত পাওয়া যায়।আল্লাহ বলেনঃ  ‘আল্লাহ যেসব গৃহকে মর্যাদায় উন্নীত করার এবং সেগুলোতে তাঁর নাম উচ্চারণ করার আদেশ দিয়েছেন, সেখানে সকাল-সন্ধ্যায় তাঁর পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করে সেই সব লোক, যাদের ব্যবসা-বাণিজ্য ও ক্রয়-বিক্রয় আল্লাহর স্মরণ থেকে, নামাজ কায়েম করা থেকে এবং জাকাত প্রদান করা থেকে বিরত রাখে না।’ (সুরা নুর, আয়াত : ৩৬-৩৭)। যারা নিয়মিত ইবাদত ও আমল মসজিদে করে,  যাদের সাথে মসজিদের অবিচ্ছেদ্য বন্ধন রচিত হয়েছে,  যারা সুখে-দুখে যেকোনো পরিস্থিতিতে সব সময় মসজিদের সাথেই থাকে এমন মানুষের মসজিদ তত্ত্বাবধানে দায়িত্বশীল হওয়া জরুরী।  উপরোক্ত আয়াত থেকে আমরা এটাই বুঝতে পারি।

মহান রাব্বুল আলামিনের ঘোষণা পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা  রাখা, পবিত্রতা রক্ষা করা, মসজিদের দেখাশোনা করা  অর্থাৎ মসজিদ সম্পর্কিত যে কোন কাজই  আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে আন্তরিকভাবে  করা সোয়াবের কাজ। আবার উল্টো দিকে কেউ যদি কোন মন্দ কাজ করে ফেলে মসজিদকে কেন্দ্র করে তবে তার পরিণাম ভালো হবে না। মসজিদে বিভিন্ন মতের শ্রেণী-পেশার মানুষ আসে। সবার চিন্তা চেতনা ব্যবহার এক হবে না।  তাই সমস্যা সমাধানে প্রজ্ঞার ব্যবহার করতে হবে। কারো সাথে কোন দূর ব্যবহার করা যাবে না যাতে সে মসজিদ বিমুখ হয়ে পড়ে। মসজিদ পরিচালনাকারীদের নিম্নোক্ত হাদিস জানা থাকা জরুরি। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, একবার এক বেদুঈন মসজিদে প্রস্রাব করে দিল। তখন লোকজন তাকে শাসন করার জন্য উত্তেজিত হয়ে পড়ল। রাসুলুল্লাহ (সা.) তাদের বলেন, তোমরা তাকে ছেড়ে দাও এবং তার প্রস্রাবের ওপর এক বালতি পানি অথবা এক পাত্র পানি ঢেলে দাও। কেননা তোমাদের নম্র ব্যবহারকারী বানিয়ে পাঠানো হয়েছে, কঠোর ব্যবহারকারী হিসেবে পাঠানো হয়নি। (বুখারি, হাদিস : ৬১২৮)

আলামিন আমাদের সবাইকে কবুল করুন ।