ইসলামে সুদ হারাম কেন?

ID 143719317 © Andrii Yalanskyi | Dreamstime.com

আল্লাহ কুরআনে সুদকে নিষিদ্ধ ঘোষণা দিয়েছেন। যে কোনো মুসলমানের জন্য জরুরী হল সে শরীয়তের যেকোনো আহকামকে মনে-প্রাণে গ্রহণ করবে এবং আল্লাহর যে কোনো বিধানের ওপর সন্তুষ্ট থাকবে। সে বিধানের হিকমত জানা থাক বা না থাক, তাকে অবশ্যই আনুগত্য প্রদর্শন করতে হবে। তবে আল্লাহর আহকামের মধ্যে কোনো কোনো আহকাম এমন আছে যেগুলির হিকমত বা কারণ আমাদের সামনে সুস্পষ্ট। সুদ হারাম হওয়ার বিষয়টি এরূপ। আল্লাহর পক্ষ থেকে আমাদের জন্য যেসব বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে তা মূলত আমাদের কল্যাণের জন্যই করা হয়েছে।

রিবা কী?

আরবিতে সুদকে ‘রিবা’ বলা হয়। রিবা অর্থ বাড়তি, অতিরিক্ত বা উদ্বৃত। মূলধনের অতিরিক্ত কিছু গ্রহণ করাকে রিবা বা সুদ বলে। সুদ সমাজের জন্য এক চরম ব্যাধি। আর এ কারণেই আল্লাহ সুদকে হারাম করেছেন এবং ব্যবসাকে হালাল করেছেন।

সুদের ভয়াল থাবায় সমাজের দরিদ্ররা দারিদ্র্যের চরম সীমায় নেমে যায়। যার ফলে সমাজে বিশৃঙ্খলা ও সামাজিক, অর্থনৈতিক অসমতা সৃষ্টি হয়। সুদের ভয়াবহতার বিবরণ দিয়ে আল্লাহ বলেন, “যারা সুদ খায়, তারা ঐ ব্যক্তির ন্যায় (কবর থেকে) উঠবে, যাকে শয়তান স্পর্শ করে পাগল বানিয়ে দিয়েছে। এটা এ জন্য যে, তারা বলত, বেচা-কেনা তো সুদের মতই। অথচ আল্লাহ বেচা-কেনাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে হারাম করেছেন। অতএব, যার কাছে তার প্রতিপালকের পক্ষ থেকে আদেশ আসার পর সে বিরত হল, যা গত হয়েছে তা তার জন্যই ইচ্ছাধীন। আর তার ব্যাপারটি আল্লাহর জিম্মায়। আর যারা ফিরে গেল, তারা জাহান্নামের অধিবাসী। তারা সেখানে চিরস্থায়ী হবে।” (আল কুরআন-২:২৭৫)

সুদের কার্যক্রম পরিহার না করাই হলো আল্লাহর সাথে যুদ্ধ ঘোষণার শামিল। আল্লাহ বলেন,
“হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং সুদের যা বাকি আছে, তা ছেড়ে দাও, যদি তোমরা ঈমানদার হয়ে থাক। অতঃপর তোমরা যদি তা পরিত্যাগ না করো, তবে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের সাথে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হয়ে যাও।” (আল কুরআন-২:২৭৮)

আল্লাহ আরও বলেন, “হে ঈমানদারগণ! তোমরা চক্রবৃদ্ধি হারে সুদ খেয়ো না। এবং আল্লাহকে ভয় করো, যাতে তোমরা কল্যাণ অর্জন করতে পারো।” (আল কুরআন-৩:১৩০)

সুদ সম্পর্কে সতর্কবাণী

সুদের জঘন্যতা তুলে ধরে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “সুদের গোনাহের সত্তরটি স্তর রয়েছে, তন্মধ্যে সর্বনিম্ন স্তর হচ্ছে আপন মায়ের সঙ্গে জিনা করার শামিল।”

সুদের মাধ্যমে অর্জিত সম্পদ বাহ্যত অধিক অনুভূত হয়। কিন্তু যেহেতু কল্যাণের কোনো অংশই তাতে বিদ্যমান থাকে না, তাই এর পরিণতিতে সেই সম্পদ এমনভাবে ধ্বংস ও বিনাশ হয়ে যায় যে, তার নামমাত্রও অবশিষ্ট থাকে না। এ কথাটি শুধু একটি সতর্কবাণীই নয়, বরং এর বাস্তবতা দিবালোকের ন্যায় সত্যে পরিণত হয়ে পড়েছে।

এই বাস্তবতাকে আল্লাহ কুরআনে স্পষ্ট করে দিয়েছেন। ইরশাদ হয়েছে, “যে সম্পদ সুদের দ্বারা অর্জন করা হয় আল্লাহ তায়ালা সেটাকে ধ্বংস করে দেন। পক্ষান্তরে যে সম্পদ নিজের পরিশ্রমের দ্বারা উপার্জিত হয়। তা হতে আল্লাহর রাস্তায় ব্যয় করে, আল্লাহ তায়ালা সেই সম্পদ বৃদ্ধি করে দেন।” এ আয়াতে সুদ ও সদকাকে একত্রে উল্লেখ করে, আল্লাহ তা’আলা এ কথাটিই স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, উভয়টির তাৎপর্য ও ফলাফল বিপরীতধর্মী।

সুদের শাস্তি

শুধু সুদ খাওয়াই মারাত্মক অপরাধ নয়। বরং যারা এর সাথে জড়িত তারাও ভয়বাহ শাস্তির সম্মুখীন হবে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সুদ গ্রহীতা, দাতা ও সুদি কারবারের লেখক এবং সুদি লেনদেনের সাক্ষী সবার ওপর লা’নত করেছেন।

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরও বলেছেন, “মেরাজের রাত্রিতে আমি এমন একটি দল অতিক্রম করেছি যাদের পেট ছিল ঘরের মত। তার ভিতরে ছিল অসংখ্য সাপ। যা পেটের বাহির থেকে দেখা যাচ্ছিল। আমি বললাম, “হে জিবরাঈল! এরা কারা?” তিনি উত্তর দিলেন, “এরা আপনার উম্মতের মধ্যকার সুদখোর লোক।”

একটু ভেবে দেখুন, সুদ যেখানে আল্লাহর সঙ্গে যুদ্ধ করার শামিল। সেক্ষেত্রে কারও কি এমন সাহস আছে যে আল্লাহর সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হবে?

তবে এটা খুবই দুঃখজনক যে, বর্তমান সময়ে সুদ মহামারি আকার ধারণ করেছে। সুদের এই ব্যাধি থেকে আমাদেরকে মুক্ত হতে হবে। আমরা যদি পবিত্র রিযিক গ্রহণ করি, তবে আল্লাহ আমাদের রিযিকে বরকত দেবেন। তাই আসুন, সুদ থেকে নিজেকে সুরক্ষিত করি।

আল্লাহ তা’আলা আমাদের সমাজকে সুদের এই অর্থনৈতিক মহামারি থেকে মুক্ত থাকার তৌফিক দান করুন। আমিন।