ইসলাম ও মালয়েশিয়া: শান্তিপূর্ণ ভাবে জীবন কাটান এ দেশের মুসলমানেরা

এশিয়া Contributor
ফোকাস
ইসলাম ও মালয়েশিয়া
পুতরা মসজিদ, পুতরাজায়া, মালয়েশিয়া। Photo 40864700 © - Dreamstime.com

ইসলাম ও মালয়েশিয়া, এই শব্দদুটি শুনলেই মনে হয় আধুনিকতার সঙ্গে প্রাচীন ঐতিহ্যের এক মেলবন্ধন ঘটেছে। বাস্তবিকই তাই, মালয়েশিয়া সুচারুভাবে যেমন ইসলামের পথ অনুসরণ করেছে। তেমনই, আধুনিক বিজ্ঞানসম্মতভাবে নিজেদের উন্নতিও ঘটিয়েছে।

সিঙ্গাপুর ভ্রমণে গেলে কেউ মালয়েশিয়া যাবে না, এ কষ্ট কল্পনা। যারাই সিঙ্গাপুরে পা রেখেছেন, তারাই বলেছেন ফেরার পথে অবশ্যই মালয়েশিয়া ঘুরে আসার কথা। আমিও তাই আর দ্বিরুক্তি না করে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম যে সিঙ্গাপুর থেকে ফেরার পথে এই দেশটি ঘুরে আসব।

ইসলাম ও মালয়েশিয়া: দেশটির বিবরণ

মালয়েশিয়াতে মূলত ১৪টি প্রদেশ রয়েছে। বিখ্যাত ফোর্বস অনলাইন ম্যাগাজিনের মতে, দেশটি পৃথিবীর টুরিস্ট ফ্রেন্ডলি ও বন্ধুভাবাপন্ন দেশের মধ্যে ১০ নম্বরে রয়েছে। শুধু তাই নয়, যে সমস্ত দেশে মানুষ বেশি যায় সেই সমস্ত দেশের তালিকায় মালয়েশিয়ার স্থান নয় নম্বরে। এ দেশের রাজধানী কুয়ালালামপুর সম্ভবত বিশ্বের চতুর্থ সেরা বিপণনের জায়গা। মালয়েশিয়ার মুদ্রার নাম রিংগিট। ১ সিঙ্গাপুর ডলার প্রায় ২.২ রিংগিট-এর সমান।

মালয়েশিয়া দেশটির কথা উঠলে সমস্ত পর্যটকই এক বাক্যে বলবে এটি একটি সবুজে মোড়া পরিচ্ছন্ন ও প্রবহমান দেশ। বর্তমানে জনসংখ্যা ৩০ মিলিয়ন হলেও দেশটিতে ৭০ মিলিয়ন মানুষের থাকার ব্যবস্থা রয়েছে। ফলে, সরকার থেকে একের বেশি সন্তান নেওয়ার জন্য এ দেশের মানুষদের উৎসাহ দেওয়া হয়।

এ দেশের মূল মালয় জনসংখ্যার বেশিরভাগ মুসলমান ধর্মাবলম্বি। ইসলাম ও মালয়েশিয়া সংক্রান্ত এটি আরেকটি আঙ্গিক। সাধারণত একটি মালয় মুসলমান পরিবার ৫টি সন্তান ধারণ করতে পারে। বাকি জনসংখ্যার ৩০ শতাংশ চীনদেশীয় ভারতীয়।

মালয়েশিয়ায় ইসলামের সূচনা

আমাদের প্রিয় নবী রাসুল (সাঃ)-এর মৃত্যুর প্রায় ২৪২ বছর পর ইসলামের পবিত্র ধর্ম পা রাখে মালয়েশিয়ায়। আনুমানিক ৮৭৮ অব্দে সূচনা হয় এই ধর্মাচরণের। মূলত ঈমাম ও উলেমাদের সাহায্যেই এই দেশ ও তার পার্শ্ববর্তী দেশে ছড়িয়ে পড়ে আমাদের পবিত্র ধর্ম। বর্তমানে, মালয়েশিয়াতে শফি মজহব নির্দেশিত ইসলাম পালন করা হয়।

ইসলাম ও মালয়েশিয়া: রাজধানী কুয়ালালামপুরের বিবরণ

সমগ্র মালয়েশিয়ার মধ্যে কুয়ালালামপুর শহরটি অত্যন্ত উজ্জ্বল ও জমজমাট। এটি মালয়েশিয়ার রাজধানী। তবে শুধু রাজধানী বললে ভুল বলা হবে, সমস্ত সংস্কৃতি ও সমস্ত ধর্মের মানুষ এসে মিশেছে এই শহরে। যদিও, তাঁদের মধ্যে বেশিরভাগই মুসলমান। কুয়ালালামপুরে শিল্প ও সংস্কৃতি মেলবন্ধন ঘটেছে তিন মিলিয়ন মানুষের মধ্যে। শুধু তাই নয়, এই শহর যেন স্বচ্ছন্দে ইসলাম ও মালয়েশিয়া বিষয়টি চোখের সামনে তুলে ধরে।

কুয়ালালামপুর দর্শন অসমাপ্ত থেকে যায় যদি না অপূর্ব সুন্দর টুইন পেট্রোনাস টাওয়ার দেখতে না যাওয়া হয়। আমি অবশ্য এই ভুল করিনি, শহরে পা রেখেই আমি টুইন টাওয়ার দেখার ব্যবস্থা করে ফেলেছিলাম। ৪৫২ মিটার উঁচু এই টাওয়ারদ্বয়ে রয়েছে ৮৮টি তলা। ৪১, ৪২ ও ৮৬ তলায় দুটি টাওয়ারকে সংযুক্ত করেছে একটি করে ব্রিজ। সেই ব্রিজের উপর দাঁড়ালে পুরো শহরের সৌন্দর্য দেখা যায়।

পেট্রোনাস টাওয়ারের ঠিক পাশেই রয়েছে কুয়ালালামপুর কনভেনশন সেন্টার। প্রায় ২০ একর জায়গা নিয়ে তৈরি এই বাগান অসম্ভব সুন্দর। আমি যেদিন গিয়েছিলাম, সেদিন সাপ্তাহিক ছুটির দিন। ছোট ছোট বাচ্চারা ছুটে খেলে বেড়াচ্ছে। তাদের মায়েরা হিজাব ঠিক করতে করতে গল্প করছেন নিজেদের মধ্যে। এক হিজাব পরা তরুণী পার্কের বেঞ্চে বসে একা একা বই পড়ছে।

বাগানের এক কোনে বিখ্যাত আসি সিয়াকিরিন মসজিদ। আধুনিক ও শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত এই মসজিদে প্রার্থনা করতে আসেন অনেকেই। মসজিদের দোতলাটি মহিলাদের জন্য সংরক্ষিত, সেখানে চাইলেই বিনামূল্যে হিজাব পাওয়া যায়।

সিঙ্গাপুরের মতোই, মালয়েশিয়াতেও নারীদের রয়েছে অবাধ স্বাধীনতা। তবে তা অবশ্যই শরিয়া আইন মেনে। এ দেশের নারীরা চাকরি থেকে আরম্ভ করে ব্যবসা পর্যন্ত করতে পারেন।

কুয়ালালামপুরের সিটি হলের স্থাপত্য সম্পূর্ণ ইসলামী। তবে সবচেয়ে চোখ টানে ইসলামিক আর্টস মিউজিয়াম। বাগান ও জলাশয়ের মধ্যে ছোট্ট এই সংগ্রহশালায় রয়েছে প্রায় ৭০০০ প্রাচীন নিদর্শন।

এ দেশের মানুষ খুব শান্তিপূর্ণ ভাবে জীবন যাপন করে। শতাব্দী প্রাচীন নিষ্ঠা ও আধুনিক সভ্যতার মিশেলে আজ বিশ্বের কাছে পরিচিত হয়ে উঠেছে ইসলাম ও মালয়েশিয়া।