ইসলাম ও সিঙ্গাপুর: কীভাবে রয়েছেন সিঙ্গাপুরের মুসলমানরা? 

এশিয়া ০৭ মার্চ ২০২১ Contributor
জানা-অজানা
ইসলাম ও সিঙ্গাপুর
Masjid Sultan, Singapore Mosque in historic Kampong Glam with golden dome and huge prayer hall. © Panuwat Dangsungnoen | Dreamstime.com

অন্য দেশের সঙ্গে সিঙ্গাপুরের পার্থক্য এটাই যে এই দেশের মানুষ ভীষণভাবে জাতীয়তাবাদী। ব্যক্তিগত সুখ স্বাচ্ছন্দ্যর থেকেও দেশ ও সামাজিক উন্নয়নকে এই দেশের মানুষ গুরুত্ব দেয় বেশি। তাই সিঙ্গাপুরের সমস্ত আইন ও সামাজিক নীতিতে এই বিষয়টি স্পষ্ট।  এ দেশে উশৃঙ্খলতার জায়গা নেই। এ দেশে রাস্তা থেকে পার্ক, সমস্ত কিছুই নিখুঁত পরিষ্কার ও ঝকঝকে। সিঙ্গাপুরে পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতাকে এতটাই গুরুত্ব দেওয়া হয় যে রাস্তায় সামান্য আবর্জনা পড়ে থাকলেও তার জন্য হয় কঠিন শাস্তি।

জানা গিয়েছে, মদ্যপ অবস্থায় গাড়ি চালানো সিঙ্গাপুরে ভয়ানক অপরাধের মধ্যে পড়ে। কেউ যদি মদ্যপ অবস্থায় গাড়ি চালায় তাহলে তাকে তিন মাসের জেল, ছয়টি চাবুকের আঘাত ও ৩০০০ সিঙ্গাপুর ডলার অর্থদণ্ড দিতে হবে। এই যে চাবুকের আঘাতের মাধ্যমে শাস্তি ব্যবস্থা, সিঙ্গাপুরে এর প্রচলন কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যর দেশগুলি থেকে। আর এভাবেই এই দেশের নানা বিচার ব্যবস্থায় ও সামাজিক অভ্যাসে খুঁজে পাওয়া যায় ইসলামের প্রভাব।

ইসলাম ও সিঙ্গাপুর 

যদিও এ দেশে ধর্মকে সে অর্থে গুরুত্ব দেওয়া হয় না। তাও সিঙ্গাপুরে চোরাস্রোতের মত বয়ে চলেছে ইসলামী সংস্কৃতি। ২০১৫-এর এক সমীক্ষা অনুসারে জানা গিয়েছে, দেশের জনসংখ্যার ১৪ শতাংশ ইসলাম ধর্মাবলম্বি মানুষ। এদের মধ্যে বেশিরভাগ মালয় ও সুন্নি মুসলমান। আর বাকি অংশের মুসলমানরা মূলত আরব, চীনদেশ, ইউরোপ ও ভারতবর্ষ থেকে সেদেশে পা রেখেছে। ভারতীয় মুসলমানদের পরিসংখ্যান ১৭ শতাংশ।

সিঙ্গাপুরের মুসলমানরা মূলত শফি ভাবধারা ও হানাফি ভাবধারায় বিশ্বাসী। তাই বলে অন্য ভাবধারার প্রতি যে বৈরিতা আছে তা কিন্তু নয়। বরং, এ দেশের মুসলমানদের মধ্যে নিজের থেকে অন্য ভাবনায় বিশ্বাসী কোনো মানুষের কাছ থেকে বিষ্যটি জানার আগ্রহ সুস্পষ্ট।

সিঙ্গাপুরে মোট ৭২টি মসজিদ রয়েছে। আর রয়েছে ৬টি মাদ্রাসা। তবে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য মসজিদ হল আল রৌদাহ। মূলত মালয় মুসলমানদের চেষ্টায় গড়ে ওঠা এই মসজিদ দেখলে কিন্তু মনেই হবে না শুরুতে যে এটি একটি মসজিদ। আধুনিক স্থাপত্যের এই মসজিদের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে একটি শিশু মাদ্রাসা বা কিন্ডারগার্টেন। সেখানকার শিক্ষিকা আমাকে জানালেন যে আল রৌদাহ মসজিদের মূল উদ্দেশ্য প্রাকৃতিক ও ধর্মীয় পরিবেশের মধ্যে সঠিক এক সমন্বয় সাধন করা। আল রৌদাহ মসজিদের একটি তলা শুধুমাত্র নারীদের প্রার্থনার জন্য তৈরি। কোনও পুরুষ সেখানে প্রবেশ করতে পারে না। এই মসজিদের যুবসমাজ, আল ফতেহ সিঙ্গাপুরের মুসলমান সম্প্রদায়ের মধ্যে খেলাধুলো ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা করে থাকে।

তবে, সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয়টি হল কিন্ডারগার্টেন মাদ্রাসা। এই মাদ্রাসাটি পুরোপুরি শিক্ষিকা দ্বারা পরিচালিত। ছোট ছোট শিশুদের ইসলামের প্রথম পাঠ পড়ানোর জন্য কোমল স্বভাবা এই নারীদের ভূমিকা অনস্বীকার্য। এমনকি, মসজিদের পরিচালনা সমিতিতেও মেয়েদের উপস্থিতি রয়েছে। সিঙ্গাপুরের মুসলমান নারীরা শরিয়া সম্মত ভাবে নিজের দায়িত্ব নিজে নিতে সক্ষম। তাদের জন্য এমনকি ‘হোম {Help,Outreach, Motivate and Educate}’ নামক একটি বিশেষ ব্যবস্থা করেছে সিঙ্গাপুর সরকার। এই ‘হোম’ কার্যক্রমে মুসলমান মেয়েদের নানাবিধ সাহায্য ও শিক্ষা দেওয়া হয়। এখানে মেয়েরা সংসার ও কর্মজীবন খুব সহজেই সামলাতে পারেন।

এছাড়া সুলতান মসজিদ সিঙ্গাপুরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রার্থনাকেন্দ্র। ১৮২৪ সালে নির্মিত এই মসজিদ ১৯৭৩ সালে সিঙ্গাপুরের জাতীয় মসজিদের খেতাব পায়।

সিঙ্গাপুরে ইসলামের আইনি ইতিহাস 

সিঙ্গাপুরে ইসলামের প্রবেশ মূলত মালয় সুলতানি সাম্রাজ্য থেকে। ১৫০০ শতকে মালাক্কা সুলতানি সাম্রাজ্য সমগ্র দক্ষিণ এশিয়াতে শরিয়া আইনের প্রচলন শুরু করেন। প্রায় ১৮২৪ পর্যন্ত সিঙ্গাপুর সহ সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলিতে শরিয়া আইন প্রচলিত ছিল। এরপর ব্রিটিশ আক্রমণের সঙ্গে সঙ্গে শরিয়া আইনের প্রয়োগ স্থগিত হয়।

১৯১৫ সালে ব্রিটিশরা ‘মহমেডান উপদেষ্টা সমিতি’ স্থাপন করে। এর মাধ্যমে ব্রিটিশ আইন ব্যবস্থার সঙ্গে ইসলামের মেলবন্ধনের কাজ সূচিত হয়। ১৯৬৩ সালে সিঙ্গাপুর মালয়েশিয়ার সঙ্গে যুক্ত হয়েও ১৯৬৫ নাগাদ স্বাধীন দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়।

অতঃপর, ১৯৬৬ সালে সিঙ্গাপুরের পার্লামেন্ট পুনরায় শরিয়া আইনকে ফিরিয়ে নিইয়ে আসে। তার সঙ্গে তিনটি কার্যালয় তৈরি করা হয়। প্রথমটি , মজলিশ উগামা ইসলাম সিঙ্গাপুরা বা ইসলামিক রিলিজিয়াস কাউন্সিল অফ সিঙ্গাপুর। এটি মূলত সিঙ্গাপুরে বসবাসকারী মুসলমানদের আইনি, সামাজিক ও ধর্মীয় বিষয়ে খেয়াল রাখে।

দ্বিতীয়টি হল শরিয়া কোর্ট, এতে মূলত শুনানি ও বিচার করা হয়। মূলত ইসলামী কোয়াদিদের মাধ্যমে বিচার হয়ে থাকে।

আর সর্বশেষ হল রেজিস্ট্রি অফ মুসলিম ম্যারেজ, এটি মূলত বিয়ে ও তালাকের বিষয়টি দেখা শোনা করে। সিঙ্গাপুর সব দিক থেকে আধুনিক ইসলামকে সমর্থন করে। এখানে আমাদের প্রিয় নবী রাসুল (সাঃ)-এর বাণীর সঙ্গে মিশে গিয়েছে মানুষের বৈজ্ঞানিক মানসিকতা।