ইসলাম গৃহকর্মীদের সর্বোচ্চ মর্যাদা, নিরাপত্তার বিধান নিশ্চিত করেছে

aliyah-jamous-lQ1hJaV0yLM-unsplash
Fotoğraf: Aliyah Jamous-Unsplash

মহান রাব্বুল আলামিনের সৃষ্টির সেরা হচ্ছে মানুষ। আর মানুষ বিভিন্ন শ্রেণি, ধর্ম, পেশা সহ বিভিন্ন বিষয়ে দিয়ে বিভক্তি হয়ে রয়েছে। তবে অর্থনৈতিক বিভাজনটিই সবচেয়ে মারাত্মক গুলোর মধ্যে অন্যতম। এবং এই বিভাজন আদিকাল থেকেই হয়ে আসছে। এবং এই অর্থনৈতিক বিভেদ দিন দিন আরও ভয়ানক অবস্থায় আমাদেরে দাঁড় করাচ্ছে।

ইসলামের কল্যাণে মানব সমাজ থেকে দাস-দাসী প্রথা বিদায় নিলেও সম্পদশালীদের আগ্রাসী অর্থনৈতিক ব্যবস্থা অর্থাৎ পুঁজিবাদের আগ্রাসী অর্থনৈতিক ব্যবস্থার কারণে গরিব মানুষের মুক্তি আজও মেলেনি। এই অর্থনৈতিক বৈষম্যের কারণে আজও আমাদের সমাজে গৃহকর্মীদের পাওয়া যায়।

নিজের পরিবারের, বন্ধু-বান্ধবদের সাথ্‌ আত্মীয় স্বজনদের সাথে আমাদের আচরণ ও মমতা যে পর্যায়ে থাকে, ধর্মের মূল শিক্ষার অভাবে আমাদের গৃহকর্মীদের প্রতি সেই আচরণ ও মমতা থাকে না। আর বর্তমান আধুনিক সময়ে এটা যেন আরো প্রকট আকার ধারণ করেছে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে আমরা তাদেরকে তাদের অধিকার থেকে বঞ্চিত করি।

ঘরের প্রায় সকল কাজই তাদের দিয়ে করানো হয়। অথচ তিন বেলা পর্যাপ্ত ও সম্মানজনকভাবে তাদের প্রাপ্য আহার তাদের কপালে জোটে না। বরং গৃহকর্মীদের প্রতি অমানবিক আচরণ করা, মানসিক শারীরিক অর্থনৈতিক নির্যাতন করা একটি নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। এমনকি যৌন হয়রানি করার মত জঘন্য ও মর্মান্তিক ঘটনাও ঘটে থাকে।

অথচ এইসব দরিদ্র মানুষের হক আদায় করে এবং তাদের প্রতি যথাযথ সম্মান প্রদর্শন করে আমরা আল্লাহর নৈকট্য এবং জান্নাত লাভের জন্য এগিয়ে থাকার চেষ্টা করতে পারি।

হযরত আনাস (রা.) বর্ণনা করেছেন, একবার হযরত মুহম্মদ (সা.) দোয়া করতে গিয়ে বলেন : হে আল্লাহ! আপনি আমাকে মিসকিন অবস্থায় জীবিত রাখুন, মিসকিন অবস্থায় মৃত্যু দান করুন এবং মিসকিনদের দলের সঙ্গে আমার হাশর করুন।

তখন হজরত আয়েশা (রা.) বললেন, হে আল্লাহর রাসুল কেন? উত্তরে রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, হে আয়েশা! মিসকিনরা ধনীদের থেকে ৪০ বছর আগে জান্নাতে প্রবেশ করবে। হে আয়েশা! তুমি কোনো মিসকিনকে আমার দরজা থেকে খালি হাতে ফিরিয়ে দিয়ো না।

অন্তত একটি খেজুরের টুকরা হলেও তাদের দিয়ো। হে আয়েশা! মিসকিনদের ভালোবেসে তাদের নিজের কাছে স্থান দিয়ো। তাহলে আল্লাহ কাল কিয়ামতের দিন তোমাকে নিজের কাছে স্থান দান করবেন। (তিরমিজি-ইবনে মাজাহ)গৃহকর্মীদের অধিকার।

হজরত আনাস বিন মালিক (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, ‘আমি ১০ বছর যাবৎ রসুল (সা.)-এর সেবা করেছি। আল্লাহর কসম! তিনি কখনো আমার বেলায় “উহ” শব্দটি উচ্চারণ করেননি (অসন্তুষ্টির ভাব প্রকাশ করেননি)। অথবা কখনো আমাকে কোনো কাজের জন্য এতটুকুও বলেননি যে, কেন এমনটা করেছ? কেন এমন করনি?’ (মুসলিম)।

সুতরাং আমরা এটা খুব দৃঢ়তার সাথে বলতে পারি যে, ইসলাম গৃহকর্মীদের সর্বোচ্চ মর্যাদা, নিরাপত্তার বিধান নিশ্চিত করেছে। তাই আমাদের উচিত হবে আমাদের গৃহকর্মীদের সাথে মানবিক আচরণ করা। তাদের ন্যায্যতা এবং তাদের অধিকার পরিপূর্ণ রূপে আদায় করা।

আমাদের সমাজে গৃহকর্মীদের প্রতি প্রথম আমরা যে অমানবিক আচরণ করে থাকি তা হচ্ছে গৃহকর্মীর নামকে বিকৃত করে ডাকা। কখনো কখনো আমরা তাদের নাম বাদ দিয়ে বিভিন্ন আজেবাজে শব্দ ব্যবহার করে থাকি, যেমন কাইল্যা, ধইল্যা, বুয়া, বেটি ইত্যাদি। তাই আমাদের প্রথম কাজ হবে তাদের যে সুন্দর নামটি রয়েছে সেই নামটি মমতা পূর্ণ কন্ঠে তাকে ডাকা।

গৃহকর্মীরা সবসময়ই সবার শেষে খাবার গ্রহণ করে, ফলে ভালো খাবার তো দূরের কথা পর্যাপ্ত খাবারও তাদের কপালে জোটে না। আমাদের সুযোগ থাকলে তাদেরকে সবচেয়ে ভালো খাবারটি দেয়া উচিত। কারণ শুধুমাত্র অর্থনৈতিক অবস্থার কারণেই আজকে তিনি গৃহকর্মী হয়েছেন।

তাকে সুন্দর, পরিপাটি এবং স্বাস্থ্যসম্মত থাকার ব্যবস্থা করে দিতে হবে। তার সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।

যদি কোন গৃহকর্মীর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা লাভের সুযোগ এবং ইচ্ছা থাকে তবে তাকে তার শিক্ষার মৌলিক অধিকার আদায়ের ব্যবস্থা করে দিতে হবে। তার প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

অবশ্যই তাকে তার উপযুক্ত পারিশ্রমিক দিতে হবে। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, এক হাদিসে হযরত মুহম্মদ (সা.) বলেছেন, আল্লাহ তাআলা বলেছেন : কিয়ামতের দিন আমি তিন শ্রেণির মানুষের বিবাদী হব।

(১) ওই ব্যক্তি, যে আমার নামে প্রতিজ্ঞা করার পর তা ভঙ্গ করে।

(২) ওই ব্যক্তি, যে কোনো স্বাধীন মানুষকে বিক্রি করে তার মূল্য ভক্ষণ করে।

(৩) ওই ব্যক্তি, যে কোনো শ্রমিক নিয়োগ করে তার কাছ থেকে কাজ পুরোপুরি আদায় করে নেয়, কিন্তু তার পারিশ্রমিক ঠিকমতো দেয় না। (সহিহ বুখারি)

তাদের যে কোন ভুলের ব্যাপারে ধৈর্য ধারণ করা এবং তাদেরকে ক্ষমা করে দেয়ার বিষয়ে রসুল (সা.) এর নির্দেশ রয়েছে। হজরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, একবার এক ব্যক্তি রসুল (সা.)-এর কাছে এসে বললেন : ‘হে আল্লাহর রসুল (সা.)! আমি আমার গৃহকর্মীকে কতবার ক্ষমা করব? নবী করিম (সা.) তার প্রশ্নে চুপ থাকলে সে আবারও একই প্রশ্ন করে। তখনো তিনি চুপ থাকেন। লোকটি তৃতীয়বার একই প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করলে তিনি বললেন, তোমরা তাদের প্রতিদিন সত্তর বার ক্ষমা করবে।’ (সুনানে আবু দাউদ)।

রাসূলুল্লাহ স. বলেন, তুমি যা খাও তা তোমার জন্য সাদাকাহ, তোমার সন্তানকে যা খাওয়াও তা তোমার জন্য সাদাকাহ, যা তোমার স্ত্রীকে খাওয়াও তাও তোমার জন্য সাদাকাহ এবং তোমার গৃহকর্মীকে যা খাওয়াও তাও তোমার জন্য সাদাকাহ।

তাই আমাদের উচিত গৃহকর্মীদের প্রতি সর্বোচ্চ পর্যায়ের মানবিক, মমতাপূর্ণ আচরণ করা। মহান আল্লাহ আমাদের কবুল করুক।