ইসলাম বর্ণবাদ ও বর্ণবৈষম্য মোটেও সমর্থন করে না

সমাজ Contributor
মতামত
বর্ণবাদ
Photo by ksh2000 from Pexels

“আমি শ্বাস নিতে পারছি না”। এই একটি মাত্র বাক্য কিছুদিন পূর্বে পুরো বিশ্বকে নাড়া দিয়েছিল, স্তম্ভিত করেছিল। বর্ণবৈষম্য ঘটিত ইস্যুতে জর্জ ফ্লয়েডের হত্যাকাণ্ডকে কেন্দ্র করে আমেরিকা সহ গোটা বিশ্ব উত্তাল হয়েছিল। তবে এটি নতুন কোনো ইতিহাস ছিল না। হঠাৎ করে ঘটে যাওয়া কোনো ঘটনাও এটি ছিল না। এর পূর্বেও বহুবার বহুভাবে বর্ণবৈষম্যজনিত বিভিন্ন ঘটনা ঘটেছে। আহত এবং নিহত হয়েছে বহু মানুষ। কৃষ্ণাঙ্গ ও শ্বেতাঙ্গ-এর মাঝে বিভেদটা চলে আসছে অনেক পূর্ব থেকেই। কিন্তু এর শেষ কোথায়?

আধুনিক এই সভ্য সমাজেও কেন বর্ণবৈষম্যের মত ঘটনা ঘটছে? কি এই বর্ণবাদ?

বর্ণবাদ কি?

শারীরিক বর্ণের ভিন্নতার কারণে কোনো জনগোষ্ঠীর সঙ্গে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক বৈষম্যমূলক আচরণ করাকে বর্ণবাদ বলে। বর্ণবাদ মানেই বর্ণবৈষম্য। সাদা কালোয় ভেদাভেদ ও পার্থক্য করা।

যুগ যুগ ধরে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বর্ণবৈষম্য দূরীকরণে আন্দোলন হয়েছে। আইন হয়েছে। প্রণীত হয়েছে বিভিন্ন নীতিমালাও। কিন্তু কেন থামছে না এই বর্ণবৈষম্যপনা? কেন মানুষ মেনে নিতে পারছে না জন্মগত ভিন্নতার এই আবরণকে?

বর্ণবাদ-এর সমাধান রয়েছে একমাত্র ইসলামে

এর মূল কারণ হল ভুল পথে হাটা হচ্ছে বারবার। মানবরচিত কোনো বিধানে বা নীতিমালাতে নয়; বরং বর্ণবৈষম্য দূরীকরণে ‘ইসলাম’-ই হল একমাত্র সমাধান। কারণ বর্ণবাদ বা বর্ণবৈষম্যকে ইসলাম কোনোভাবেই সমর্থন করে না। বর্ণবাদকে নির্মূল করে আদর্শ রাষ্ট্র ও সমাজ প্রতিষ্ঠার অনন্য এক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন রাসুল সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম।

একারণেই বিখ্যাত ইতিহাসবিদ মালকম এক্স একবার প্রকাশ্যে বলেছিলেন, “আমেরিকাকে ইসলাম পূর্ণরূপে বুঝতে হবে। কারণ ইসলামই একমাত্র ধর্ম, যা আমেরিকান সমাজ থেকে বর্ণবৈষম্য দূরীকরণে কার্যকরী সমাধান দিতে পারে।”

তাহলে আসুন আমরা দেখি, ইসলাম বর্ণবৈষম্যকে নির্মূল করার কি কি উপায় অবলম্বন করতে বলেছে এবং রাসুল সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম কিভাবে বর্ণবাদহীন আদর্শ সমাজ গড়ে তুলেছিলেন।

১। শ্রেষ্ঠত্বের মাপকাঠি তাকওয়া

ভাষা, গোত্র বা বর্ণের বিবেচনায় ইসলাম কোনো মানুষকে অপর মানুষর ওপর শ্রেষ্ঠত্ব দান করেনি। ইসলামের দৃষ্টিতে মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব নির্ণয়ের একমাত্র মূলনীতি হলো— তাকওয়া বা আল্লাহভীতি। বর্ণগত সৌন্দর্য বা জাতি ও বংশগত বৈশিষ্ট্য ইসলামের দৃষ্টিতে শ্রেষ্ঠত্বের মাপকাঠি নয়। বিদায় হজের ভাষণে রাসুল সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম স্পষ্টভাষায় বলেছেন, “মনে রেখো! অনারবের উপর আরবের ও আরবের উপর অনারবের এবং শ্বেতাঙ্গের উপর কৃষ্ণাঙ্গের ও কৃষ্ণাঙ্গের উপর শ্বেতাঙ্গের কোনো বিশেষত্ব বা শ্রেষ্ঠত্ব নেই। শুধুমাত্র আল্লাহভীতি বা তাকওয়ার দিক থেকেই কারও শ্রেষ্ঠত্ব বিবেচিত হতে পারে।” (মুসনাদে আহমাদ)

২। ইসলাম সাম্প্রদায়িকতাকে সমর্থন করে না

বর্ণবাদ এক প্রকার সাম্প্রদায়িকতা। মানুষরূপি কিছু অমানুষ নিজস্ব স্বার্থ চরিতার্থ করা উদ্দেশ্যে বর্ণবাদকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে। বর্ণবাদের নামে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ছড়ায়। কিন্তু এরকম কোনো সাম্প্রদায়িকতাকে ইসলাম সমর্থন করে না। আল্লাহ তা’আলা বলেন, “হে মানবমণ্ডলী, নিশ্চয়ই আমি তোমাদেরকে একজন নারী ও একজন পুরুষ থেকে সৃষ্টি করেছি এবং বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে বিভক্ত করেছি, যাতে তোমরা পরস্পরে পরিচিত হতে পারো। নিশ্চয় আল্লাহর কাছে সে-ই সর্বাধিক সম্মানিত, যে তোমাদের মাঝে সর্বাধিক পরহেজগার বা মুত্তাকী। নিশ্চয় আল্লাহ সর্বজ্ঞ ও সবকিছুর খবর রাখেন। (৪৯:১৩)। সুতরাং সাম্প্রদায়িক চিন্তা-চেতনাকে নির্মূল করার মাধ্যমে ইসলাম বর্ণবাদ বা বর্ণবৈষম্যকে নির্মূল করেছে।

৩। বর্ণের বিচিত্রতা একমাত্র আল্লাহ দান

বর্ণের বিচিত্রতা এবং ভাষার ভিন্নতা ঐচ্ছিক কোনো বিষয় নয়; এগুলো একমাত্র আল্লাহ তা’আলার দান। এগুলো তার পক্ষ থেকে প্রদান করা নিদর্শন। কোনো মানুষ চাইলেই সাদা হয়ে জন্মাতে পারবে না অথবা শত ইচ্ছা বা চেষ্টা করলেও কারও কালো হয়ে জন্মানোকে রুখে দিতে পারবে না। আল্লাহ বলেন, “তাঁর আরও এক নিদর্শন হচ্ছে নভোমন্ডল ও ভূমন্ডলের সৃজন এবং তোমাদের ভাষা ও বর্ণের বৈচিত্র্য। নিশ্চয়ই এতে জ্ঞানীদের জন্য নিদর্শনাবলি রয়েছে।” (৩০:২২)

সুতরাং যে ভিন্নতায় মানুষের কোনো অবদান নেই, সে ভিন্নতা বা সে বৈচিত্রের কারণে মানুষকে দায়ী করা বোকামি ছাড়া আর অন্য কিছু নয়। এছাড়া হাদিসে এসেছে, “আল্লাহ তোমাদের বাহ্যিক চেহারা বা ধন-সম্পদের দিকে তাকান না। তিনি তোমাদের অন্তরের অবস্থা ও আমল দেখেন।”

৪। কৃষ্ণাঙ্গ হোক বা শ্বেতাঙ্গ সকলে একই উপাদান থেকে সৃষ্ট

কুরআন বলেছেন গোটা পৃথিবীর সব মানুষ একই উপাদান মাটি থেকে সৃষ্ট। সৃষ্টিগত উপাদানে যেহেতু ভিন্নতা নেই, সেহেতু সব মানুষই সমান। সৃষ্টিগত উপাদানের অভিন্নতায় মানুষে মানুষে সমতার কথা শিখিয়েছে ইসলাম। পাশাপাশি মাটির গুণাবলীর কারণে মানুষের বর্ণগত ভিন্নতাকে কুদরতের সৃষ্টিগত কৌশল হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। সুতরাং, কুদরতের সৃষ্টিগত কৌশলকে ভেদাভেদের কারণ হিসেবে গ্রহণ করা মানে আল্লাহর কুদরতের বিরোধীতা করা। আর এটা ইসলাম কখনই সমর্থন করে না।

৫। দৃষ্টান্ত স্থাপন

বর্ণবাদ বিরোধী ইসলাম প্রদত্ত নীতিমালা বা মূলনীতিকে রাসুল সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম শুধু মুখে বলে দিয়েই ক্ষান্ত হননি, বরং তার গোটা জীবনে বাস্তবায়ন করে দেখিয়েছেন। যে আরব সমাজে অনারবদেরকে ঘৃণারপাত্র বানিয়ে রাখা হয়েছিল, যেখানে কালো বর্ণের মানুষগুলিকে অমানুষ ভাবা হত, রাসুল সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম সেই সমাজেই ইথিওপিয়ান সাহাবী বিলাল(রাযিঃ)-কে ইসলামের সর্বপ্রথম মুয়াজ্জিন হিসেবে নিযুক্ত করেছিলেন। মক্কা বিজয়ের দিন রাসুল সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লামের নির্দেশে বায়তুল্লাহর ছাদে উঠে বিলাল(রাযিঃ) যখন আযান দিলেন, মক্কাবাসীরা তখন লজ্জায়-ক্ষোভে ফেটে পড়ছিল। তারা বলাবলি করছিল, ‘মুহাম্মদ কি এই কৃষ্ণাঙ্গ ছাড়া আর কাউকে আযান দেওয়ার মত পেল না?”

এই কথা শুনে মানবতার নবী দৃঢ়কণ্ঠে জানিয়ে দিলেন, “মানুষ হিসেবে সবাই সমান। বর্ণের ভিত্তিতে নয়, বরং শুধু তাকওয়া বা আল্লাহভীতির বিচারেই মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব সাব্যস্ত হয়।” এরকম আরও অনেক দৃষ্টান্ত স্থাপন করে সমাজ থেকে বর্ণবাদের ভিত্তি উপড়ে ফেলেছিলেন রাসুল সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম।

সুতরাং বর্ণবাদ বা বর্ণবৈষম্যর ভিত্তিমূলকে পৃথিবীর বুক থেকে চিরতরে উপড়ে ফেলতে হলে আমাদেরকে আবারও ফিরে যেতে হবে ইসলামের সুশীতল ছায়াতলে এবং আমাদেরকে গ্রহণ করতে হবে রাসুলে আরাবির বাস্তবায়িত নীতিমালা।

Enjoy Ali Huda! Exclusive for your kids.
Enjoy Ali Huda! Exclusive for your kids.
Enjoy Ali Huda! Exclusive for your kids.