মাতৃভাষাকে সর্বোচ্চ মর্যাদা দিয়েছে ইসলাম

কুরআন ২২ জুন ২০২০ Contributor
মাতৃভাষাকে
ID 143289734 © Alexander Mitr | Dreamstime.com

মা, মাতৃভূমি, মাতৃভাষা এই প্রতিটি বিষয়ই প্রতিটি মানুষের কাছে পরম আপন। আমরা ছোটবেলা থেকেই মায়ের মুখে যে ভাষা শুনে থাকি সেই ভাষাতেই আমরা অভ্যস্ত হয়ে উঠি। আর সেই ভাষাই হচ্ছে আমাদের জন্য মাতৃভাষা, মায়ের ভাষা। ১৯৫২ সালে মায়ের ভাষাকে রক্ষা করার জন্য সালাম, রফিক সহ অগণিত মানুষ তাদের বুকের তাজা রক্ত দিয়েছে। তাদের এই সর্বোচ্চ ত্যাগের বিনিময়ে আজ আমরা আমাদের মাতৃভাষায় কথা বলতে পারি, লিখতে পারি, মনের ভাব অবলীলায় প্রকাশ করতে পারি।

মহান রাব্বুল আলামিন যুগে-যুগে কালে-কালে মানুষকে অন্ধকার থেকে আলোতে নিয়ে আসার জন্য বহু নবী-রাসূল প্রেরণ করেছেন। নবী-রাসুলদের ধর্ম প্রচারের ক্ষেত্রে তাদের নিজ নিজ ভাষায় প্রচারের বিষয়টি মহান রাব্বুল আলামিন কোরআন শরীফে স্পষ্ট আকারে বলেছেন, “ আমি সবসময় প্রত্যেক রসুলের নিকট তার নিজ নিজ সম্প্রদায়ের ভাষায় আমার কালাম নাজিল করেছি, যেন সে সত্যকে স্পষ্ট করে তাদের কাছে তুলে ধরতে পারে। ” (সুরা ইব্রাহিম, আয়াত- ০৪)।

ইসলামে গুরুত্ব দেয় মাতৃভাষাকেঃ

আরবি পরকালের ভাষা হওয়া সত্ত্বেও সব নবী-রাসূল আরবি ভাষাভাষী ছিলেন না। এমনকি সব আসামানি কিতাবও আরবি ভাষায় লেখা হয়নি। হজরত মুসা (আ.)-এর সম্প্রদায়ের ভাষা ছিল ইবরানি। তাই তাওরাত নাজিল হয়েছে ইবরানি ভাষায়। হজরত দাউদ (আ.)-এর কওমের ভাষা ছিল ইউনানি। তাই জাবুর কিতাব নাজিল হয়েছে ইউনানি ভাষায়। হজরত ঈসা (আ.)-এর গোত্রের ভাষা ছিল সুরিয়ানি। তাই এ ভাষায় ইনজিল কিতাব নাজিল হয়। প্রিয় নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর উম্মতের ভাষা ছিল আরবি। তাই আরবি ভাষায় কোরআন নাজিল হয়েছে।

মাতৃভাষা আমাদের গর্বঃ

প্রতিটি মানুষের জন্য তার মাতৃভাষা একটি গর্ব করার বিষয়। মাতৃভাষা সম্পর্কে গর্ব করে মহানবী (সা.) বলতেন, ‘আরবদের মধ্যে আমার ভাষা সর্বাধিক সুললিত। তোমাদের চেয়েও আমার ভাষা অধিকতর মার্জিত ও সুললিত।’ (আল-মুজাম : হা. ২৩৪৫)। এর কারণ তিনি নিজেই ব্যাখ্যা করেছেন এভাবে, ‘আরবের সবচেয়ে মার্জিত ভাষার অধিকারী সাদিয়া গোত্রে আমি মানুষ হয়েছি। তাঁদেরই কোলে আমার মুখ ফুটেছে। তাই আমি সর্বাধিক সুললিত ভাষা আত্মস্থ করেছি।’ (আল-বদরুল মুনির ফি তাখরিজিল আহাদিস : খ. ৮, পৃ. ২৮১)

আল্লাহ তাআলার অন্যতম শ্রেষ্ঠ দান হচ্ছে ভাষা। মহান আল্লাহতালা এই বিষয়ে পবিত্র কোরআন শরীফে বলেনঃ “ পরম দয়াময় আল্লাহ। ২. তিনি কোরআন শিক্ষা দিয়েছেন। ৩. তিনি মানুষ সৃষ্টি করেছেন। ৪. তিনি তাকে (গুছিয়ে চিন্তা করতে ও) স্পষ্টভাবে কথা বলতে শিখিয়েছেন। ” (সুরা আর-রাহমান, আয়াত ১-৪)।

আসুন দু’হাতে গ্রহণ করি আমাদের মাতৃভাষাকেঃ

আমরা যারা সাধারন মানুষ আমাদেরকেও মহান রাব্বুল আলামিন অন্যের সাহায্যে, পরোক্ষভাবে ভাষা শিখিয়েছেন। আমাদের আদি পিতা হজরত আদম (আ.)-কে তিনি ভাষা শিখিয়েছেন প্রত্যক্ষভাবে। “ আর তিনি আদমকে সবকিছুর নাম শিক্ষা দিলেন (অর্থাৎ সকল বিষয়ের জ্ঞান দান করলেন)। ” (সুরা বাকারা, আয়াত- ৩১)। মনের ভাব প্রকাশ করার জন্য মৌখিক পদ্ধতি ছাড়াও আরেকটি পদ্ধতি রয়েছে যা হচ্ছে লিখিত পদ্ধতি। এই পদ্ধতিও মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের শেখানো।

আল্লাহ বলেনঃ “ পড়ো! তোমার প্রতিপালক মহান দয়ালু। তিনি মানুষকে জ্ঞান দিয়েছেন কলমের। ” (সুরা আলাক, আয়াতঃ ৩-৪)। একটি বিষয় এখানে লক্ষণীয় যে, এ আয়াতগুলোতে কোথাও কোনো বিশেষ ভাষার কথা উল্লেখ করা হয়নি। অপরদিকে বিদায় হজের ভাষণে আমরা দেখতে পাই হজরত মুহাম্মদ (সা.) বলেছেন, ‘কালোর ওপর সাদার প্রাধান্য নেই, অনারবের ওপর আরবের শ্রেষ্ঠত্ব নেই, (বুখারী)। তার এই সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা থেকে একটি কথা স্পষ্ট হয় যে কোন ভাষাকে হেয় করা, তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করা অথবা কোন প্রকার অবহেলা করা যাবে না। কেননা সকল ভাষায় মহান রাব্বুল আলামিনের সৃষ্টি। তার সৃষ্টির অবমূল্যায়ন করা তার প্রতি অসম্মান প্রদর্শনেরই নামান্তর।

আমারা এটা দেখতে পাই যে সকল নবী রাসূলদের ইসলাম প্রচার এর জন্য রাব্বুল আলামীন তাদের স্থানীয় মাতৃভাষাকে গুরুত্ব দিয়েছেন। কারণ ধর্ম প্রচারে, পারস্পরিক সম্পর্ক বৃদ্ধিতে শুদ্ধ ভাষা ও সুন্দর শব্দের প্রয়োগ এর প্রভাব অনস্বীকার্য। ইসলাম সবসময় মাতৃভাষাকে গুরুত্ব দিয়ে এসেছে। আমাদের উচিত আমাদের নিজের দেশের মাতৃভাষাকে সঠিক ও শুদ্ধ চর্চার মাধ্যমে মহান রাব্বুল আলামিনের এই নেয়ামতকে পরিপূর্ণ রূপে গ্রহণ করা।