ইসলাম সম্পর্কে প্রচলিত ১০টি ভুল ধারণা

dreamstime_s_79025148

(প্রথম পর্ব)

আমরা এই নিবন্ধে ইসলাম সম্পর্কে এমন ১০টি ভুল ধারণা নিয়ে আলোচনা করব যেগুলি সমাজে খুব ব্যপকভাবে ছড়িয়ে আছে এবং যেগুলি সমাজে অনেক ভুল বোঝাবোঝি ও অসহিষ্ণুতার সৃষ্টি করেছে।

১) ইসলাম সন্ত্রাসবাদকে সমর্থন করে

একবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় দশকে এটি সম্ভবত ইসলাম সম্পর্কে সবচেয়ে বড় অপবাদ। এমন এক সময় যখন বিশ্ব নিরীহদের হত্যার জন্য পাগল হয়ে গেছিল, সেই মূহুর্তে ইসলাম এসে বিশ্বে শান্তি নিশ্চিত করেছে।

নিরপরাধ মানুষকে হত্যা সম্পর্কে আল্লাহ বলেন, “…যে ব্যক্তি কাউকে হত্যা করা কিংবা যমীনে ফাসাদ সৃষ্টির কারণ ব্যতীত কাউকে হত্যা করবে, সে যেন সমগ্র মানবজাতিকেই হত্যা করল। আর যে কোনো মানুষের প্রাণ রক্ষা করবে, সে যেন সমগ্র মানবজাতিকেই রক্ষা করল…” (আল কুরআন-৫:৩২)

নির্দোষ মানুষকে হত্যা ইসলামে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। যখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোনো বাহিনীকে যুদ্ধে প্রেরণ করতেন, তখন তিনি তাদেরকে নির্দেশ দিতেন, “আল্লাহর নামে বের হও; যুদ্ধে কোনো বৃদ্ধ, শিশু এবং মহিলাকে হত্যা করবে না। সদাচরণ ছড়িয়ে দাও এবং সৎকর্ম কর, নিশ্চয় আল্লাহ সতকর্মশীলদেরকে ভালোবাসেন। মঠগুলিতে সন্ন্যাসীদেরকে হত্যা করবেন না বা যারা উপাসনালয়ে বসে আছে তাদেরকেও হত্যা করবেন না।”

রাসূল সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লামের এই নীতি পরবর্তী সকল খলিফা মেনে চলেছেন। যারা এ থেকে বিচ্যুত হয়েছেন এই দায়ভার তাদের। ইসলামী শিক্ষার সাথে সেগুলির কোনো সম্পর্ক নেই।

আল্লাহ বলেন, “তোমরা আল্লাহর পথে শুধু সেই লোকেদের বিরুদ্ধেই যুদ্ধ কর, যারা তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে, কিন্তু সীমা অতিক্রম করো না। নিশ্চয় আল্লাহ সীমা অতিক্রমকারীদেরকে ভালোবাসেন না।” (আল কুরআন-২:১৯০)

২) ইসলাম নারীদের উপর অত্যাচার করে

এই কথাটিও ইসলামের উপর আক্রশের কারণে অনেক অবুঝ মানুষ বলে থাকে। ইসলাম একজন নারীর জীবনের প্রতিটি পর্বে সর্বোচ্চ সম্মান নিশ্চিত করেছে। কন্যা হিসাবে সে তাঁর পিতার জন্য জান্নাতের দরজা খুলে দেয়; স্ত্রী হিসাবে সে তার স্বামীর অর্ধেক দ্বীন পূর্ণ করে। সে যখন মা হয়, তখন জান্নাত তাঁর পায়ের নীচে থাকে; এভাবে সকল পর্যায়ে ইসলাম তাঁর সম্মান নিশ্চিত করেছে, পুরুষদেরকে তাদের প্রতি সদাচরণের জন্য আদেশ দিয়েছে।

নেককাজের ক্ষেত্রে ঈমানদার পুরুষ ও নারী যে সমপর্যায়ের হবে সেটি ঘোষণা দিয়ে আল্লাহ বলেন, “পুরুষ ও নারীর মধ্যে যে সৎকাজ করবে আর সে ঈমানদারও বটে, তাহলে তারা জান্নাতে প্রবেশ করবে, তাদের প্রতি সামান্য পরিমাণও অন্যায়-অবিচার করা হবে না।” (আল কুরআন-৪:১২৪)

ইসলাম মহিলাদের সম্পত্তি এবং নিজস্ব আর্থিক নিয়ন্ত্রণের অধিকার দেয়। ইসলাম মহিলাদেরকে উত্তরাধিকারের আনুষ্ঠানিক অধিকার এবং শিক্ষার অধিকার দেয়। মুসলিম মহিলারা বিবাহের প্রস্তাব গ্রহণ বা প্রত্যাখ্যান করার অধিকার রাখে এবং পরিবারকে সমর্থন ও রক্ষণাবেক্ষণের বাধ্যবাধকতা থেকে তারা সম্পূর্ণ মুক্ত থাকে। প্রয়োজনে নারীদের বিবাহ বিচ্ছেদের অধিকারও ইসলাম দেয়।

তবে দুঃখজনকভাবে হলেও এটা সত্য যে, কিছু মুসলিম মহিলা আসলেই নিপীড়িত। তবে এটি শুধুমাত্র তার পরিবারের ইসলাম পালনে গাফলতির কারণে। এগুলির সাথেও ইসলামী শিক্ষার কোনো সম্পর্ক নেই। নারীদেরকে সম্মানয় করা সম্পর্কে রাসূল সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি ছাড়া কেউই মহিলাদের সাথে সম্মানজনক আচরণ করে না এবং জাহেল(অজ্ঞ) ব্যক্তি ছাড়া আর কেউ মহিলাদের সাথে অসম্মানজনক আচরণ করে না।”

৩) সকল মুসলমানই আরব

দেশ, জাতি, গোত্র নির্বিশেষে কিয়ামত পর্যন্ত আগত সকল মানুষের জন্যই ইসলাম আল্লাহর পক্ষ থেকে একমাত্র মনোনীত দ্বীন। তবে কুরআন যেহেতু আরবী ভাষায় অবতীর্ণ হয়েছে এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লামও আরব ছিলেন, তাই অনেকেই এই ভুল ধারণার স্বীকার যে, সকল মুসলমানই মনে হয় আরব, বা আরবের সকলেই মনে হয় মুসলমান। ২০১৯ সালে পিউ এর প্রকাশিত জরীপ অনুযায়ী, প্রকৃতপক্ষে বিশ্বের ১.৯ বিলিয়ন মুসলমানের মধ্যে ১.৫৭ মিলিয়ন মুসমমানই আরবী নয়।

সুতরাং, ‘সকল মুসলমানই আরব’ এটি একটি অমূলক ও অযৌক্তিক ধারণা বৈ কিছু নয়।

মূলত ইসলাম কোনো বংশগত বা জাতিগত ধর্ম নয়। বরং এটি বিশ্বের সকল মানুষের জন্যই অনুসরণীয় একটি ধর্ম। যেখানে জাতিগত বা বংশগত  কোনো বিভেদ নেই। সুতরাং, মুসলমানরা স্ক্যান্ডিনেভিয়ার আলপাইন তুন্দ্রা দ্বীপ থেকে পিজির উষ্ণ উপকূলীয় উপদ্বীপ পর্যন্ত সমগ্র পৃথিবী ব্যাপী থাকতে পারে।

আল্লাহ বলেন, “হে মানবজাতি! আমি তোমাদেরকে এক পুরুষ ও এক নারী থেকে সৃষ্টি করেছি এবং তোমাদেরকে বিভিন্ন জাতি ও গোষ্ঠীতে বিভক্ত করেছি যাতে তোমরা পরস্পরকে চিনতে পার…” (আল কুরআন-৪৯:১৩)

(চলবে)