ঈদুল আযহার নেপথ্যে ইব্রাহিম(আঃ)-এর বিশেষ পরীক্ষা

Sunlight in background young muslim praying in the forefront
© Allies Interactive Services Private Limited | Dreamstime.com

ইসলামিক ক্যালেন্ডারের দ্বাদশ মাসকে যিলহজ্জ্ব বলা হয়। এই মাসে ইসলামের অন্যতম সেরা স্তম্ভ – হজ্জ্ব পালন করা হয়। এই মাসে ইসলামের ২টি ঈদের ১টি, ঈদুল আযহাও রয়েছে।

এই দুটি বিশেষ অনুষ্ঠান, হজ্জ্ব এবং ঈদুল আযহা আমাদের মিল্লাতের পিতা হযরত ইবরাহিম(আঃ) এর সাথে সম্পর্কযুক্ত।

ইবরাহিম(আঃ) এর পদাঙ্ক অনুসরণ

হজ্জ্বের অনেক আহকামই ইবরাহিম(আঃ) এর পদাঙ্ক অনুসরণ করে করা হয়।

ঈদুল আযহাও ইবরাহিম(আঃ) এর জীবনের একটি নির্দিষ্ট ঘটনাকে স্মরণ করে। তাঁর পুত্র ইসমাইল(আঃ)কে কুরবানি করার জন্য আল্লাহ তাঁকে আদেশ করেছিলেন।

ঈদুল আযহা যিলহজ্জের ১০ম দিনে হয় এবং এদিন হজরত ইবরাহিম(আঃ) এর আল্লাহর আনুগত্যের সম্মান জানাতে হজ্জ্বযাত্রীরা ও সামর্থ্যবান মুসলিমরা পশু জবাই করেন।

“নিশ্চয় ইবরাহিম ছিলেন এক সম্প্রদায়ের প্রতীক, সবকিছু থেকে মুখ ফিরিয়ে এক আল্লাহরই অনুগত এবং তিনি মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন না। তিনি তাঁর অনুগ্রহের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশকারী ছিলেন। আল্লাহ তাঁকে মনোনীত করেছিলেন এবং সরল পথে পরিচালিত করেছিলেন।” (আল কুরআন-১৬:১২০-১২১)

কুরবানির গল্প

ইবরাহিম(আঃ) লাগাতার কয়েকদিন স্বপ্নে তাঁর পুত্র ইসমাইলকে কুরবানি করতে দেখলেন, যা তাঁর উপর আল্লাহরই আদেশ ছিল। ইবরাহিম(আঃ) এর পরিবারের সকল সদস্য আল্লাহর উপর পূর্ণ আস্থা প্রদর্শনকারী ছিলেন, তাই তিনি পুত্র ইসমাইলের কাছে নিজের স্বপ্ন প্রকাশ করলেন। ইসমাইল(আঃ)ও খুব সহজেই আল্লাহর হুকুম পালনে রাজি হয়ে যান।

তারা একসাথে কুরবানির স্থানে পৌঁছে ইবরাহিম(আঃ) তার প্রিয় পুত্রকে কুরবানি দেওয়ার জন্য প্রস্তুত হচ্ছিলেন। এই সময়ে শয়তান ইবরাহিম(আঃ) কে আল্লাহর অবাধ্য করার প্রলোভনে প্ররোচিত করেছিল, কিন্তু ইবরাহিম(আঃ) শয়তানকে তাড়িয়ে দিয়েছিলেন।

ইবরাহিম(আঃ) তার পুত্রের গলাই যখন ছুরি চালাতে যাবেন তখনই ফেরেশতা জিবরাইল(আঃ) জান্নাত থেকে একটি দুম্বা এনে ছুরির নিচে দিয়ে দেন এবং দুম্বা কুরবানি হয়ে যায়। আর গায়েব থেকে আওয়াজ আসে যে, ইবরাহিম(আঃ) এর কুরবানি কবুল করা হয়েছে।

এটি ইবরাহিম(আঃ) এর জীবনের অনেক কঠিন একটি পরীক্ষা ছিল এবং তিনি তাঁর স্বপ্নকে বাস্তবে পরিণত করে দেখিয়েছিলেন যে, তিনি প্রকৃতপক্ষেই আল্লাহর আনুগত্যশীল।

“…আর যে আল্লাহকে ভয় করে, আল্লাহ তার জন্যে নিষ্কৃতির পথ করে দিবেন। আর তাকে রিযক দিবেন (এমন উৎস) থেকে যা সে ধারণাও করতে পারে না। যে কেউ আল্লাহর উপর ভরসা করে, তবে তার জন্য তিনিই যথেষ্ট…।” (আল কুরআন-৬৫:২-৩)

আল্লাহ ইসমাইল(আঃ) কে একটি ভেড়া দ্বারা প্রতিস্থাপন করেছিলেন এবং এ কারণেই মুসলমানরা কুরবানির ঈদ উদযাপনে একটি পশু কুরবানি দেয়।

বর্তমানে

যারা হজ্জ্ব করতে পারছেন না তারাও হযরত ইবরাহিম(আঃ) এর পরীক্ষার স্মরণে একটি পশু কুরবানি দিয়ে থাকেন।

“আল্লাহর কাছে ওগুলোর না গোশত পৌঁছে, আর না রক্ত পৌঁছে বরং তাঁর কাছে পৌঁছে তোমাদের তাকওয়া…।” (আল কুরআন-২২:৩৭)

এ আয়াত থেকে বোঝা যায়, আল্লাহর রক্ত ​​বা মাংসের কোনো প্রয়োজন নেই; প্রকৃতপক্ষে আমাদের ইবাদতেরও কোনো প্রয়োজন আল্লাহ তা’আলার নেই।

তবে আমাদের নিজস্ব সুবিধার জন্যই আল্লাহ আমাদেরকে তাঁর দিকে ফিরে যেতে এবং তাঁর আনুগত্য করার আদেশ দিয়েছেন। আল্লাহ আমাদের অন্তরের তাকওয়া কে দেখেন। আমাদের দেশে কুরবানি দেওয়া পশুটি সাধারণত ভেড়া, ছাগল বা গরু হয়ে থাকে। এছাড়া আরও অনেক পশু দিয়েও কুরবানি দেওয়া যায়।

কুরবানির মাংস বিতরণ

কুরবানির মাংস বিতরণ করা আল্লাহকে অনেক খুশি করে। সাধারণত, একটি অংশ নিজের পরিবারের জন্য রাখা হয়, একটি অংশ আত্মীয়স্বজন এবং প্রতিবেশীদের দেওয়া হয় এবং একটি অংশ দরিদ্রদের মাঝে বিলিয়ে দেওয়া হয়।

এই নিয়মটি আত্মীয়তা এবং বন্ধুত্বের সম্পর্ককে শক্তিশালী করে এবং এটি আমাদের প্রয়োজনে যাদের প্রয়োজন তাদের সহায়তা করার মাধ্যমে আমাদের উপকারের জিনিসগুলি ছেড়ে দেওয়ার জন্য আমাদের উত্সাহের প্রতীক। কুরবানির মাধ্যমে আমরা স্বীকার করি যে, সমস্ত নিয়ামত একমাত্র আল্লাহর নিকট থেকেই আসে।

ঈদুল আযহা যিলহজ্জ্বের দশম দিনে শুরু হয়। যারা হজ্জ্বে যেতে পারেন নি, তাদের জন্য ঈদের নামাজের মাধ্যমে এই দিনটি শুরু হয়।

এটি উদযাপনের সময়, পরিবার এবং বন্ধুবান্ধবদের সাথে দেখা করার এবং আল্লাহ আমাদেরকে যে সমস্ত নেয়ামত দান করেছেন তার জন্য ধন্যবাদ দেওয়ার সময়। এটি আত্মীয়দের সাথে যোগাযোগ, পরিবার ও প্রতিবেশীদের প্রতি দয়া এবং দরিদ্রদের প্রতি সহানুভূতি ও সহমর্মিতার দাবি করে।

সর্বোপরি, ঈদুল আযহা আমাদেরকে স্মরণ করিয়ে দেয় যে, আল্লাহ মহান এবং তিনি সমস্ত অনুগ্রহের উত্স। এই চেতনাকে অন্তরে লালন করে আল্লাহ আমাদের ঈদুল আযহা ও কুরবানিকে কবুল করে নিন সেই দু’আই করি। আমীন